ঢাকা ০১:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নির্বাচন: কেন্দ্রে যাচ্ছে ব্যালট পেপার ৪ টি আসনে কেন্দ্র ৫৯৮,কক্ষ ৩,৬৮৯, পোলিং প্রিসাইডিং ১২,২৫১,আইনশৃঙ্খলা সদস্য ১৩,৪৯৯ চকরিয়া-পেকুয়া : অভিজ্ঞের সাথে নতুনের লড়াই কক্সবাজারের ডিককুলে যৌথবাহিনীর অভিযান: অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী আটক ১ বছরে প্রধান উপদেষ্টার সম্পদ বেড়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪ হাজার টাকার বেশি নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন মেনে নেওয়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার দুই প্রার্থীর পক্ষ নেওয়া চার ‘আলোচিত’ নামে তোলপাড় ভোটের সমীকরণ! ​নির্বাচনী নিরাপত্তায় ঈদগাঁওতে যৌথ টহল নির্বাচন ঘিরে কক্সবাজারে সেনাবাহিনীর শক্ত অবস্থান-নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহবান নির্বাচন ঘিরে কক্সবাজারে ‘জেলা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার’ পোস্টাল ভোট সম্পন্ন: কক্সবাজার–৩ এ সবচেয়ে বেশি ভোটগ্রহণ ঝিলংজায় অগ্নিকাণ্ডে তিন বসতঘর ভস্মীভূত নির্বাচনে যেকোনও অস্ত্রই থ্রেট: আইজিপি ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দুই ঘণ্টা পরপর ভোটের হার জানাবে ইসি ভোট দেবেন যেভাবে, যেসব তথ্য জানতে হবে

৪ টি আসনে কেন্দ্র ৫৯৮,কক্ষ ৩,৬৮৯, পোলিং প্রিসাইডিং ১২,২৫১,আইনশৃঙ্খলা সদস্য ১৩,৪৯৯

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজারজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। সীমান্তবর্তী অবস্থান, উপকূলীয় ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদ থাকার কারণে কক্সবাজার জেলা বরাবরই নির্বাচনী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে এবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী মাঠে নেমেছে ব্যাপক প্রস্তুতি, কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে। ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন এবং ভোট পরবর্তী সময়সহ পুরো নির্বাচনকালীন মেয়াদে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বাইরে যাতায়ত কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা, সীমান্ত, উপকূল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বাড়ানো হয়েছে টহল, তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি।

রোহিঙ্গাদের ব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান :

মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে কোনো অশুভ শক্তি যেন রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে নাশকতা বা সহিংসতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ভোটগ্রহণের আগে ও পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে গতিবিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, ক্যাম্প এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া মেরামত, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন, নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদগুলোতে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স :

লে. কর্নেল তানভীর আহমেদ বলেন, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত থাকবে। কোনো ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে সেনাবাহিনী পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সরাসরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেবে।

তিনি বলেন, ‘ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে এসে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’

যৌথ অভিযানে অস্ত্র-মাদক উদ্ধার, আটক ১১৪৯ রোহিঙ্গা :

মতবিনিময় সভার আগে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুতফা জামান সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত ৩ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী ৪৬টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য। একই সঙ্গে ক্যাম্পের বাইরে অবৈধভাবে বসবাসকারী ১ হাজার ১৪৯ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আলোচিত কয়েকটি হত্যা মামলার আসামিকেও। এর আগে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে পরিচালিত ৬১টি যৌথ অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাং সদস্যসহ ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব অভিযানে উদ্ধার করা হয় ১৯টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১০০ রাউন্ড গুলি, ৯৩টি দেশীয় অস্ত্র, একটি ড্রোন, একটি ওয়াকিটকি, ১৩ লাখ টাকার জাল নোট এবং বিপুল পরিমাণ মাদক। উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে ছিল ৬ হাজার ২০১টি ইয়াবা, ৫৪১ লিটার দেশীয় মদ, ২৩ লিটার বিয়ার ও ৬ কেজি গাঁজা।

৫৯৮ কেন্দ্রের মধ্যে ৩২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ :

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ৫৯৮টি। এর মধ্যে ৩২৯টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ২৬৯টি কেন্দ্র সাধারণ হিসেবে বিবেচিত।

আসনভিত্তিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা হলো- কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া): ১৮০টির মধ্যে ৯৩টি, কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া): ১২৪টির মধ্যে ৫৯টি, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও): ১৮২টির মধ্যে ১০৯টি এবং কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ): ১১৭টির মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্র।

প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অতীত সহিংসতার ইতিহাস, সীমান্তবর্তী অবস্থান, জনবহুল ভোটকেন্দ্র এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা হওয়ায় এসব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জেলা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার, সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দু :

নির্বাচনকালীন সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে কক্সবাজারে গঠন করা হয়েছে ‘জেলা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার’। বিভাগীয় পর্যায়ের কোর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত এই কমান্ড সেন্টার ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই কমান্ড সেন্টারে সেনাবাহিনী, বিজিবি, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, র‌্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআই, আনসার ও ভিডিপির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন ও ভোট পরবর্তী সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত এখান থেকেই নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে কেবল বাহিনীর উপস্থিতি নয়, বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর সমন্বয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে নৌবাহিনী-কোস্টগার্ডের প্রস্তুতি :

নির্বাচন উপলক্ষে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা ও সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। আইএসপিআর জানায়, ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের ১৭টি সংসদীয় আসনের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজার পরিদর্শন করেন।

কক্সবাজারে সেনাপ্রধানের সফর :

এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কক্সবাজার এলাকা পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গত ২৯ জানুয়ারি তিনি কক্সবাজারের বিয়াম ফাউন্ডেশন আঞ্চলিক কেন্দ্রে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

আইএসপিআর জানায়, সভায় নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দায়িত্ব পালনের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেনাবাহিনী প্রধান দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। পরিদর্শনকালে তিনি ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ারের আওতায় মোতায়েনকৃত সেনাসদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

আইনশৃঙ্খলায় সাড়ে ১৩ হাজার সদস্য মোতায়েন :

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় নির্বাচনী নিরাপত্তায় মোট ১৩ হাজার ৪৯৯ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ২ হাজার ১৬৬ জন সেনা, ৮৮০ জন বিজিবি, ৩৯৯ জন নৌবাহিনী, ৫০ জন বিমান বাহিনী, ১৪৫ জন কোস্টগার্ড, ৮০ জন র‌্যাব, ১৯০ জন আনসার ব্যাটেলিয়ন ও ১ হাজার ৮১৫ জন পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া আনসার ও ভিডিপির ৭ হাজার ৭৭৪ জন সদস্য ভোটকেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতি কেন্দ্রে তাঁদের ১৩ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ৩৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থাকবেন।

১৮ লাখের বেশি ভোটার, ৩৬৮৯ ভোটকক্ষ :

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. আজিজ জানান, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৭ জন। জেলার ৫৯৮টি ভোটকেন্দ্রের ৩ হাজার ৬৮৯টি কক্ষে ভোটগ্রহণ পরিচালনা করবেন ১২ হাজার ২৫১ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা।

জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আ. মান্নান জানান, প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার রয়েছেন ৪ হাজার ৫০৩ জন এবং পোলিং অফিসার ৭ হাজার ৭৪৮ জন।

সব মিলিয়ে সীমান্ত, উপকূল, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র সবখানেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আগামীকাল কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যাশা, ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

নির্বাচন: কেন্দ্রে যাচ্ছে ব্যালট পেপার

This will close in 6 seconds

৪ টি আসনে কেন্দ্র ৫৯৮,কক্ষ ৩,৬৮৯, পোলিং প্রিসাইডিং ১২,২৫১,আইনশৃঙ্খলা সদস্য ১৩,৪৯৯

আপডেট সময় : ১১:৪২:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজারজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। সীমান্তবর্তী অবস্থান, উপকূলীয় ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদ থাকার কারণে কক্সবাজার জেলা বরাবরই নির্বাচনী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে এবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী মাঠে নেমেছে ব্যাপক প্রস্তুতি, কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে। ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন এবং ভোট পরবর্তী সময়সহ পুরো নির্বাচনকালীন মেয়াদে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বাইরে যাতায়ত কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা, সীমান্ত, উপকূল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বাড়ানো হয়েছে টহল, তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি।

রোহিঙ্গাদের ব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান :

মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে কোনো অশুভ শক্তি যেন রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে নাশকতা বা সহিংসতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ভোটগ্রহণের আগে ও পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে গতিবিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, ক্যাম্প এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া মেরামত, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন, নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদগুলোতে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স :

লে. কর্নেল তানভীর আহমেদ বলেন, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত থাকবে। কোনো ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে সেনাবাহিনী পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সরাসরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেবে।

তিনি বলেন, ‘ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে এসে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’

যৌথ অভিযানে অস্ত্র-মাদক উদ্ধার, আটক ১১৪৯ রোহিঙ্গা :

মতবিনিময় সভার আগে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুতফা জামান সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত ৩ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী ৪৬টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য। একই সঙ্গে ক্যাম্পের বাইরে অবৈধভাবে বসবাসকারী ১ হাজার ১৪৯ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আলোচিত কয়েকটি হত্যা মামলার আসামিকেও। এর আগে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে পরিচালিত ৬১টি যৌথ অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাং সদস্যসহ ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব অভিযানে উদ্ধার করা হয় ১৯টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১০০ রাউন্ড গুলি, ৯৩টি দেশীয় অস্ত্র, একটি ড্রোন, একটি ওয়াকিটকি, ১৩ লাখ টাকার জাল নোট এবং বিপুল পরিমাণ মাদক। উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে ছিল ৬ হাজার ২০১টি ইয়াবা, ৫৪১ লিটার দেশীয় মদ, ২৩ লিটার বিয়ার ও ৬ কেজি গাঁজা।

৫৯৮ কেন্দ্রের মধ্যে ৩২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ :

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ৫৯৮টি। এর মধ্যে ৩২৯টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ২৬৯টি কেন্দ্র সাধারণ হিসেবে বিবেচিত।

আসনভিত্তিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা হলো- কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া): ১৮০টির মধ্যে ৯৩টি, কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া): ১২৪টির মধ্যে ৫৯টি, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও): ১৮২টির মধ্যে ১০৯টি এবং কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ): ১১৭টির মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্র।

প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অতীত সহিংসতার ইতিহাস, সীমান্তবর্তী অবস্থান, জনবহুল ভোটকেন্দ্র এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা হওয়ায় এসব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জেলা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার, সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দু :

নির্বাচনকালীন সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে কক্সবাজারে গঠন করা হয়েছে ‘জেলা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার’। বিভাগীয় পর্যায়ের কোর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত এই কমান্ড সেন্টার ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই কমান্ড সেন্টারে সেনাবাহিনী, বিজিবি, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, র‌্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআই, আনসার ও ভিডিপির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন ও ভোট পরবর্তী সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত এখান থেকেই নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে কেবল বাহিনীর উপস্থিতি নয়, বরং দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর সমন্বয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে নৌবাহিনী-কোস্টগার্ডের প্রস্তুতি :

নির্বাচন উপলক্ষে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা ও সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। আইএসপিআর জানায়, ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের ১৭টি সংসদীয় আসনের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজার পরিদর্শন করেন।

কক্সবাজারে সেনাপ্রধানের সফর :

এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কক্সবাজার এলাকা পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গত ২৯ জানুয়ারি তিনি কক্সবাজারের বিয়াম ফাউন্ডেশন আঞ্চলিক কেন্দ্রে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

আইএসপিআর জানায়, সভায় নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দায়িত্ব পালনের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেনাবাহিনী প্রধান দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। পরিদর্শনকালে তিনি ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ারের আওতায় মোতায়েনকৃত সেনাসদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

আইনশৃঙ্খলায় সাড়ে ১৩ হাজার সদস্য মোতায়েন :

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় নির্বাচনী নিরাপত্তায় মোট ১৩ হাজার ৪৯৯ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ২ হাজার ১৬৬ জন সেনা, ৮৮০ জন বিজিবি, ৩৯৯ জন নৌবাহিনী, ৫০ জন বিমান বাহিনী, ১৪৫ জন কোস্টগার্ড, ৮০ জন র‌্যাব, ১৯০ জন আনসার ব্যাটেলিয়ন ও ১ হাজার ৮১৫ জন পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া আনসার ও ভিডিপির ৭ হাজার ৭৭৪ জন সদস্য ভোটকেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতি কেন্দ্রে তাঁদের ১৩ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ৩৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থাকবেন।

১৮ লাখের বেশি ভোটার, ৩৬৮৯ ভোটকক্ষ :

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. আজিজ জানান, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৭ জন। জেলার ৫৯৮টি ভোটকেন্দ্রের ৩ হাজার ৬৮৯টি কক্ষে ভোটগ্রহণ পরিচালনা করবেন ১২ হাজার ২৫১ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা।

জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আ. মান্নান জানান, প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার রয়েছেন ৪ হাজার ৫০৩ জন এবং পোলিং অফিসার ৭ হাজার ৭৪৮ জন।

সব মিলিয়ে সীমান্ত, উপকূল, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র সবখানেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আগামীকাল কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যাশা, ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হবে।