ঢাকা ০৩:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলব করল বিএফআইইউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্ববাজারে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ছাড়াল ১০৩ ডলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যেকোন অভিযানের জন্য প্রস্তুত পুলিশ উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা, দুই সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত উখিয়ার পালংখালী থেকে ১ লাখ ইয়াবা উদ্ধার উখিয়ায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান: ৫ প্রতিষ্ঠানকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা সেন্টমার্টিনে পর্যটক ভ্রমনে বিধিনিষেধ শিথিল হচ্ছে! কলাতলীতে বাতিল প্লটে মার্কেট নির্মাণ, কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য কুতুবদিয়ায় বজ্রপাতে বৃদ্ধের মৃত্যু রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ টেকনাফে বজ্রপাতে কৃষক আহত সদর থানার অভিযান অব্যাহত: ২৪ ঘন্টায় গ্রেফতার ১৫ ফিশিং বোটের ইঞ্জিন বিকল, ভাসমান ১৩ জেলে উদ্ধার কক্সবাজারে ৪৬ মামলার প্রায় ৯৯ কোটি টাকার মাদক ধ্বংস

দালালের খপ্পরে মালয়েশিয়ায় ‘স্বপ্নভঙ্গ’, রামুর কাজল ফিরলেন লাশ হয়ে

  • তানভীর শিপু:
  • আপডেট সময় : ১০:০৭:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 432

কফিনবন্দী নিথর দেহটি যখন আসল, কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। এক মাস আগে মালয়েশিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাওয়া আব্দুল্লাহ কাজল অবশেষে ফিরলেন নিজের বাড়ি—কক্সবাজারের রামু উপজেলার পেঁচার দ্বীপে। কিন্তু ফিরে এলেন লাশ হয়ে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দুই মাস আগে জীবিকার আশায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন কাজল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন একই এলাকার আরও দুই তরুণ—ফারুক ও জাহাঙ্গীর। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক দালাল শফির প্রলোভনে তাঁরা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্রুত কাজ ও ভালো আয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তাঁদের।

মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। কাজলের পরিবারের দাবি, সেখানে একটি চক্র তাঁদের আটক করে এবং প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। ফোনে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন স্বজনেরা।

কাজলের বড় ভাই বলেন, ‘ও ফোনে কাঁদতেছিল। বলত, টাকা না দিলে মারতেছে। আমরা যা পারছি করছি।পরিবার ও এলাকাবাসী চাঁদা তুলে, গবাদিপশু বিক্রি করে এবং জমি বন্ধক রেখে চার লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করেছি।’

অভিযোগ উঠেছে, সেই টাকা দালাল শফির হাতে তুলে দেওয়া হলেও তিনি তা নির্যাতনকারীদের কাছে পাঠাননি। বরং আত্মসাৎ করেন। টাকা না পৌঁছানোয় নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। একপর্যায়ে মারধরের আঘাতে মারা যান আব্দুল্লাহ কাজল।

প্রায় এক মাস আগে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে গ্রামে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহ পৌঁছায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ। আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শুক্রবার ভোররাতে লাশ নেওয়া হয় কক্সবাজারে। দুপুরের পর পেঁচার দ্বীপে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।

এ ঘটনায় তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কক্সবাজার জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মানবপাচার ও মৃত্যুর অভিযোগ গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

এদিকে কাজলের দুই সহযাত্রীর একজন এখনো মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অপরজন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় সক্রিয় মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরেই তরুণদের টার্গেট করছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে স্বল্প সময়ে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই পড়ছেন জিম্মি ও নির্যাতনের ফাঁদে।

পেঁচার দ্বীপের এক বাসিন্দা বলেন, ‘কাজলের মতো আর কোনো মা যেন সন্তান হারায় না। দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শুধু দালাল গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক রুটে সক্রিয় পাচার চক্র ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার না করলে এমন মৃত্যু থামবে না।

কাজলের মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব পরিবারটি। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে তাঁর ব্যবহৃত জামা আর পুরোনো একটি মোবাইল ফোন—যেখান থেকে শেষবার শোনা গিয়েছিল সাহায্যের আকুতি।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলব করল বিএফআইইউ

দালালের খপ্পরে মালয়েশিয়ায় ‘স্বপ্নভঙ্গ’, রামুর কাজল ফিরলেন লাশ হয়ে

আপডেট সময় : ১০:০৭:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কফিনবন্দী নিথর দেহটি যখন আসল, কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। এক মাস আগে মালয়েশিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাওয়া আব্দুল্লাহ কাজল অবশেষে ফিরলেন নিজের বাড়ি—কক্সবাজারের রামু উপজেলার পেঁচার দ্বীপে। কিন্তু ফিরে এলেন লাশ হয়ে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দুই মাস আগে জীবিকার আশায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন কাজল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন একই এলাকার আরও দুই তরুণ—ফারুক ও জাহাঙ্গীর। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক দালাল শফির প্রলোভনে তাঁরা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্রুত কাজ ও ভালো আয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তাঁদের।

মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। কাজলের পরিবারের দাবি, সেখানে একটি চক্র তাঁদের আটক করে এবং প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। ফোনে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন স্বজনেরা।

কাজলের বড় ভাই বলেন, ‘ও ফোনে কাঁদতেছিল। বলত, টাকা না দিলে মারতেছে। আমরা যা পারছি করছি।পরিবার ও এলাকাবাসী চাঁদা তুলে, গবাদিপশু বিক্রি করে এবং জমি বন্ধক রেখে চার লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করেছি।’

অভিযোগ উঠেছে, সেই টাকা দালাল শফির হাতে তুলে দেওয়া হলেও তিনি তা নির্যাতনকারীদের কাছে পাঠাননি। বরং আত্মসাৎ করেন। টাকা না পৌঁছানোয় নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। একপর্যায়ে মারধরের আঘাতে মারা যান আব্দুল্লাহ কাজল।

প্রায় এক মাস আগে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে গ্রামে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহ পৌঁছায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ। আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শুক্রবার ভোররাতে লাশ নেওয়া হয় কক্সবাজারে। দুপুরের পর পেঁচার দ্বীপে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।

এ ঘটনায় তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কক্সবাজার জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মানবপাচার ও মৃত্যুর অভিযোগ গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

এদিকে কাজলের দুই সহযাত্রীর একজন এখনো মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অপরজন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় সক্রিয় মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরেই তরুণদের টার্গেট করছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে স্বল্প সময়ে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই পড়ছেন জিম্মি ও নির্যাতনের ফাঁদে।

পেঁচার দ্বীপের এক বাসিন্দা বলেন, ‘কাজলের মতো আর কোনো মা যেন সন্তান হারায় না। দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শুধু দালাল গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক রুটে সক্রিয় পাচার চক্র ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার না করলে এমন মৃত্যু থামবে না।

কাজলের মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব পরিবারটি। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে তাঁর ব্যবহৃত জামা আর পুরোনো একটি মোবাইল ফোন—যেখান থেকে শেষবার শোনা গিয়েছিল সাহায্যের আকুতি।