কক্সবাজারের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন চিকিৎসাসেবী ছিলেন না; ছিলেন অসহায় মানুষের আশ্রয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ এবং অসংখ্য মানুষের প্রিয় ‘চন্দন ডাক্তার’। ডাক্তার চন্দন কান্তি দাশের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
এক বছর আগে এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন কক্সবাজারের সর্বজনপরিচিত এই মানবিক মানুষটি। তাঁর মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছিল শহরের চিকিৎসা, সংস্কৃতি, সামাজিক ও নাগরিক অঙ্গনে। এক বছর পরও স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে তিনি সমানভাবে জীবন্ত।
কক্সবাজার হাসপাতাল সড়কের পুরোনো একটি ছোট্ট চেম্বার ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল। এলএমএএফ হিসেবে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি একটি ফার্মেসিও পরিচালনা করতেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা, দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের প্রতি মমত্ববোধ এবং চিকিৎসাসেবায় নিষ্ঠাই তাঁকে মানুষের কাছে ‘চন্দন ডাক্তার’ হিসেবে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছিল।
রোগীর সামর্থ্য কিংবা সামাজিক পরিচয় তাঁর কাছে বড় বিষয় ছিল না। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাবের অংশ। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি তাঁর ছিল আলাদা মমতা। চেম্বারে অপেক্ষমাণ রোগীদের ভিড়ের মধ্যে কোনো শিশুর কান্না শুনলেই ছুটে যেতেন তিনি। প্রয়োজন হলে নিজের কাছে চিকিৎসা না রেখে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের কাছে রোগী পাঠিয়ে দিতেন।
চন্দন কান্তি দাশের চেম্বারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কক্সবাজারের বহু মানুষের স্মৃতি। সন্ধ্যার ধূপের সুবাস ছড়িয়ে পড়ত ছোট্ট সেই চেম্বার ছাড়িয়ে আশপাশের প্যাসেজ, বারান্দা ও উঠান পর্যন্ত। রোগী দেখার ফাঁকে পরিচিতজনদের সঙ্গে গল্প, সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা কিংবা মানুষের প্রয়োজনের কথা শোনা—সব মিলিয়ে জায়গাটি ছিল তাঁর মানবিক উপস্থিতির এক অনন্য ঠিকানা।
চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন চন্দন দাশ। খেলাঘর, অনুকূল ঠাকুর সৎসঙ্গ, ব্রাহ্মমন্দির, সমাজসেবা, পূজা কমিটিসহ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মানুষের জন্য কাজ করাকেই তিনি জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন।
অর্থ-সম্পদ কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার চেয়ে মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানই ছিল তাঁর বড় অর্জন। ধর্ম, বর্ণ, মত কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে মানুষকে আলাদা না করে সবাইকে আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। এ কারণেই কক্সবাজারের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আপনজন।
মৃত্যুর এক বছর পরও বাবাকে ঘিরে স্মৃতির ভারে আবেগাপ্লুত তাঁর সন্তান। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, ৩৬৫ দিন ধরে বাবাকে ছাড়া থাকার প্রতিটি মুহূর্তই কঠিন। বাবার কোলে ঘুমানো, কাঁধে চড়ে মেলা দেখা, স্কুলজীবনে হাত ধরে পথচলা, ঝিনুকমালায় যাওয়া কিংবা বাবার সঙ্গে ঢাকায় যাওয়ার স্মৃতিগুলো এখন তাঁর কাছে অমূল্য।
ছেলের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে বাবার সঙ্গে কাটানো শৈশব ও কৈশোরের নানা মুহূর্ত। বাবার সামাজিক কর্মকাণ্ডের ব্যস্ততার কারণে কখনো কখনো অভিমানও হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অভিমান বদলে গেছে গভীর উপলব্ধিতে—মানুষের জন্য নিজের জীবনের বড় একটি অংশ উৎসর্গ করেছিলেন চন্দন কান্তি দাশ।
বাবার সঙ্গে আরও অনেক কথা বলার, অনেক স্বপ্ন ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর সন্তানের। কিন্তু সেই সুযোগ আর আসেনি। তাই প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রশ্ন একটাই—একটি বছর সবাইকে ছেড়ে তিনি কেমন আছেন?
চন্দন কান্তি দাশ আজ নেই। নেই হাসপাতাল সড়কের সেই ছোট্ট চেম্বারে তাঁর পরিচিত উপস্থিতি, নেই রোগীর প্রতি সেই আন্তরিক কণ্ঠ, নেই সন্ধ্যার ধূপের সুবাসে মিশে থাকা তাঁর ব্যস্ততার দৃশ্য। কিন্তু কক্সবাজারের মানুষের স্মৃতিতে তিনি এখনো আছেন—‘চন্দন ডাক্তার’ হয়ে, একজন মানবিক চিকিৎসাসেবী হয়ে, একজন সমাজমনস্ক মানুষ হয়ে।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই তাঁকে স্মরণ করছে সমুদ্র শহর। তাঁর রেখে যাওয়া ভালোবাসা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে গড়ে তোলা সম্পর্কই হয়ে আছে তাঁর সবচেয়ে বড় স্মৃতিচিহ্ন।
সায়ন্তন ভট্টাচার্য: 



















