ঢাকা ১২:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মিয়ানমারের বিকট শব্দে কেঁপে উঠল টেকনাফের হ্নীলা-হোয়াইক্যং সীমান্ত সমুদ্রভ্রমণ থেকে অ’গ্নি’দ’গ্ধ দুঃস্বপ্ন, ১১ দিন পর দাদার কবরের পাশে মুক্তা মহেশখালীতে অস্ত্রসহ মালেককে আটকের দাবি পুলিশের “আহমদ গিয়াস থেকে যাবে, তাঁর না থাকা জুড়ে” রামুতে ৩ লাখ পিস ইয়াবাসহ নারী গ্রেফতার দেশে ৪ কোটি ১৬ লাখ মানুষ সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে না সাতকানিয়ায় বাস-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ১, বাসে আগুন, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বান্দরবানে তাবলিগি মারকাজ মসজিদের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করলেন পার্বত্য মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী, এমপি কক্সবাজার সদর থানার বিশেষ অভিযান: গ্রেফতার ১৮ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্র-বিস্ফোরক মজুদের অভিযোগ, অভিযানের আবেদন কুতুবদিয়ায় অগ্নিকাণ্ড : ক্ষতিগ্রস্ত ৩৬ বসতবাড়ি সী-প্রিন্সেস হোটেলে আ গু ন, অল্পের জন্য ৩’শ পর্যটক পেলেন রক্ষা তিন দিন পর মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত বাহারছড়ার কৃষক রফিক টেকনাফে আগুনে পুড়ল আট কক্ষের ভাড়া বাসা নজরুল বর্ষ জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কৃতিত্ব ও বাংলাদেশ বেতারে তালিকাভুক্ত হওয়া শিল্পীদের সংবর্ধনা

দালালের খপ্পরে মালয়েশিয়ায় ‘স্বপ্নভঙ্গ’, রামুর কাজল ফিরলেন লাশ হয়ে

  • তানভীর শিপু:
  • আপডেট সময় : ১০:০৭:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 449

কফিনবন্দী নিথর দেহটি যখন আসল, কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। এক মাস আগে মালয়েশিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাওয়া আব্দুল্লাহ কাজল অবশেষে ফিরলেন নিজের বাড়ি—কক্সবাজারের রামু উপজেলার পেঁচার দ্বীপে। কিন্তু ফিরে এলেন লাশ হয়ে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দুই মাস আগে জীবিকার আশায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন কাজল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন একই এলাকার আরও দুই তরুণ—ফারুক ও জাহাঙ্গীর। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক দালাল শফির প্রলোভনে তাঁরা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্রুত কাজ ও ভালো আয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তাঁদের।

মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। কাজলের পরিবারের দাবি, সেখানে একটি চক্র তাঁদের আটক করে এবং প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। ফোনে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন স্বজনেরা।

কাজলের বড় ভাই বলেন, ‘ও ফোনে কাঁদতেছিল। বলত, টাকা না দিলে মারতেছে। আমরা যা পারছি করছি।পরিবার ও এলাকাবাসী চাঁদা তুলে, গবাদিপশু বিক্রি করে এবং জমি বন্ধক রেখে চার লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করেছি।’

অভিযোগ উঠেছে, সেই টাকা দালাল শফির হাতে তুলে দেওয়া হলেও তিনি তা নির্যাতনকারীদের কাছে পাঠাননি। বরং আত্মসাৎ করেন। টাকা না পৌঁছানোয় নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। একপর্যায়ে মারধরের আঘাতে মারা যান আব্দুল্লাহ কাজল।

প্রায় এক মাস আগে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে গ্রামে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহ পৌঁছায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ। আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শুক্রবার ভোররাতে লাশ নেওয়া হয় কক্সবাজারে। দুপুরের পর পেঁচার দ্বীপে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।

এ ঘটনায় তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কক্সবাজার জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মানবপাচার ও মৃত্যুর অভিযোগ গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

এদিকে কাজলের দুই সহযাত্রীর একজন এখনো মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অপরজন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় সক্রিয় মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরেই তরুণদের টার্গেট করছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে স্বল্প সময়ে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই পড়ছেন জিম্মি ও নির্যাতনের ফাঁদে।

পেঁচার দ্বীপের এক বাসিন্দা বলেন, ‘কাজলের মতো আর কোনো মা যেন সন্তান হারায় না। দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শুধু দালাল গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক রুটে সক্রিয় পাচার চক্র ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার না করলে এমন মৃত্যু থামবে না।

কাজলের মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব পরিবারটি। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে তাঁর ব্যবহৃত জামা আর পুরোনো একটি মোবাইল ফোন—যেখান থেকে শেষবার শোনা গিয়েছিল সাহায্যের আকুতি।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

মিয়ানমারের বিকট শব্দে কেঁপে উঠল টেকনাফের হ্নীলা-হোয়াইক্যং সীমান্ত

দালালের খপ্পরে মালয়েশিয়ায় ‘স্বপ্নভঙ্গ’, রামুর কাজল ফিরলেন লাশ হয়ে

আপডেট সময় : ১০:০৭:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

কফিনবন্দী নিথর দেহটি যখন আসল, কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। এক মাস আগে মালয়েশিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাওয়া আব্দুল্লাহ কাজল অবশেষে ফিরলেন নিজের বাড়ি—কক্সবাজারের রামু উপজেলার পেঁচার দ্বীপে। কিন্তু ফিরে এলেন লাশ হয়ে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দুই মাস আগে জীবিকার আশায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন কাজল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন একই এলাকার আরও দুই তরুণ—ফারুক ও জাহাঙ্গীর। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক দালাল শফির প্রলোভনে তাঁরা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্রুত কাজ ও ভালো আয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তাঁদের।

মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। কাজলের পরিবারের দাবি, সেখানে একটি চক্র তাঁদের আটক করে এবং প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। ফোনে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন স্বজনেরা।

কাজলের বড় ভাই বলেন, ‘ও ফোনে কাঁদতেছিল। বলত, টাকা না দিলে মারতেছে। আমরা যা পারছি করছি।পরিবার ও এলাকাবাসী চাঁদা তুলে, গবাদিপশু বিক্রি করে এবং জমি বন্ধক রেখে চার লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করেছি।’

অভিযোগ উঠেছে, সেই টাকা দালাল শফির হাতে তুলে দেওয়া হলেও তিনি তা নির্যাতনকারীদের কাছে পাঠাননি। বরং আত্মসাৎ করেন। টাকা না পৌঁছানোয় নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। একপর্যায়ে মারধরের আঘাতে মারা যান আব্দুল্লাহ কাজল।

প্রায় এক মাস আগে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে গ্রামে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহ পৌঁছায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ। আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শুক্রবার ভোররাতে লাশ নেওয়া হয় কক্সবাজারে। দুপুরের পর পেঁচার দ্বীপে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।

এ ঘটনায় তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কক্সবাজার জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মানবপাচার ও মৃত্যুর অভিযোগ গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

এদিকে কাজলের দুই সহযাত্রীর একজন এখনো মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অপরজন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় সক্রিয় মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরেই তরুণদের টার্গেট করছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে স্বল্প সময়ে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই পড়ছেন জিম্মি ও নির্যাতনের ফাঁদে।

পেঁচার দ্বীপের এক বাসিন্দা বলেন, ‘কাজলের মতো আর কোনো মা যেন সন্তান হারায় না। দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শুধু দালাল গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক রুটে সক্রিয় পাচার চক্র ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নজরদারি জোরদার না করলে এমন মৃত্যু থামবে না।

কাজলের মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব পরিবারটি। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে তাঁর ব্যবহৃত জামা আর পুরোনো একটি মোবাইল ফোন—যেখান থেকে শেষবার শোনা গিয়েছিল সাহায্যের আকুতি।