সফরটি পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এটি হবে প্রথম ভারত সফর। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দুই দিনের এ সফরকে মূলত দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে সফরের দিনক্ষণ ও বিস্তারিত কর্মসূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তারেক রহমানকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।
নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের সম্ভাব্য বৈঠকের দিকে দুই দেশই বিশেষ নজর রাখছে। তারেক রহমানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতকেও নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তবে নতুন বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও কিছুটা বেড়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত এপ্রিল মাসে নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এ ছাড়া ১০ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ উন্নত করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে সেখানে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর তাকে ফেরত চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লির কাছে আবেদন করেছে ঢাকা।
ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি কথা বলার পর শেখ হাসিনার বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে ওই আয়োজনের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমান ও ভারতের হাইকমিশনারের সাম্প্রতিক বৈঠকেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি উঠে এসেছে। দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর স্বার্থে এ বিরোধ যাতে অন্য বিষয়গুলোকে প্রভাবিত না করে, সে বিষয়ে উভয় পক্ষকেই একটি সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
দুই দেশের মধ্যে সমাধানের অপেক্ষায় থাকা আরও বেশ কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। সম্ভাব্য বৈঠকে বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও পরিবহন যোগাযোগও শক্তিশালী। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলে এসব ক্ষেত্রেও দ্রুত তার প্রভাব পড়তে পারে।
পানি বণ্টনও আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে চুক্তিটি নবায়ন নিয়ে আলোচনা সময় যত ঘনিয়ে আসবে, ততই গুরুত্ব পেতে পারে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন বিষয়েও ভারতের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দুই দেশের অভিন্ন সীমান্তের কারণেই নয়, বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে দেশটির যোগাযোগের কারণেও ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় নয়াদিল্লি।
দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার আগ্রহের মধ্যেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর হতে যাচ্ছে।
তবে এ সফরেই দুই দেশের সব বিরোধের সমাধান হবে এমনটা প্রত্যাশা করা হচ্ছে না। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও সীমান্তসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যতেও আলোচনা প্রয়োজন হবে।
তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের সরাসরি বৈঠক এসব মতপার্থক্য নিরসনে একটি রাজনৈতিক যোগাযোগের পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের নেতৃত্বের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাবেন তারেক রহমান।
অন্যদিকে নতুন বাংলাদেশ সরকারের কাছে ভারতের প্রত্যাশাগুলো সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ পাবেন নরেন্দ্র মোদি।
সফরের তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী সফরটি হলে আগামী সপ্তাহে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর ভারত-বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রথম বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
এই মুহূর্তে দুই দেশের লক্ষ্য হলো আবারও সরাসরি আলোচনা শুরু করা এবং কঠিন ইস্যুগুলো যেন সামগ্রিক সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত না করে, সে পথ খুঁজে বের করা।
টিটিএন ডেস্ক: 





















