ঢাকা ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কক্সবাজারে বাস্তুচ্যুত পরিস্থিতিতে সংঘাত-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা বিষয়ক কর্মশালা সম্পন্ন ৬ বছর পর নিষিদ্ধ অবস্থায় কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের ৮৩৭ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি লোহাগাড়ায় পুকুরে গোসলে নেমে নিখোঁজ বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার সদর থানার বিশেষ অভিযান : গ্রেফতার ১৫ রামুতে মাদক মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অভিযান: সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও ডাকাত আটক, ৩ জনের কারাদণ্ড মা ইলিশ সংরক্ষণে সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনী পেকুয়ায় নিজ বিদ্যালয়ে সংবর্ধিত কউক চেয়ারম্যান ও কমেক অধ্যক্ষ উখিয়ায় বন বিভাগের অভিযান : বালিভর্তি দুই অবৈধ ডাম্পার জব্দ কক্সবাজারে ২ প্রতিষ্ঠানকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা জাতীয় পর্যায়ে “সেরা গুণী শিক্ষক” সম্মাননা পেলেন রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুলের অধ্যক্ষ লে. কর্নেল আব্দুর রহিম টেকনাফে এসআরবি ও বিজিবির যৌথ অভিযান : ৩ লাখ ইয়াবা উদ্ধার বাস টার্মিনালের স্ট্যান্ড পার্ক হোটেলে আলোচিত কুলসুমা হত্যার প্রধান আসামী ইরফান গ্রেফতার সাগরে মাছ শিকারে বন্ধ : দুঃশ্চিন্তায় জেলেরা পেকুয়ায় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে প্রশাসনের প্রস্তুতি সভা

মানবতার আয়োজনে মানববর্জ্যে পরিবেশের বাজছে বারোটা!

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস এখন শুধু মানবিক সংকট নয়, বড় পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সংকটেও রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপন্ন হলেও তা ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় পরিবেশ, কৃষিজমি, খাল-নালা ও জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না হলে কক্সবাজারের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য

উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিদিন কয়েকশ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার বড় অংশই মানববর্জ্য ও প্লাস্টিকজাত আবর্জনা।

ক্যাম্পগুলো পাহাড় কেটে গড়ে ওঠায় মাটির স্থায়িত্ব কমে গেছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির সঙ্গে টয়লেটের বর্জ্য নিচু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় খাল, পুকুর ও জলাধার দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক এলাকায় দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও উদ্বেগ

রাজাপালংয়ের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাপ স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক এলাকায় পানি দূষণ, দুর্গন্ধ ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেড়েছে। স্থানীয় জনগণও এখন নানা সংকটের মধ্যে আছে।’

স্থানীয় অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হোসাইন বলেন, ‘ক্যাম্পের মানববর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে পরিবেশ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। পাহাড়, বন ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শুধু ক্যাম্পের ভেতরে নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষতি কমাতেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয়দের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্প জরুরি হয়ে পড়েছে।’

ভূগর্ভস্থ পানির ঝুঁকি

পরিবেশবিদদের মতে, ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক অস্থায়ী ল্যাট্রিন ও সেপটিক পিট তৈরি করা হলেও সেগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছু এলাকায় মানববর্জ্য মাটির নিচে জমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে দূষণের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে যেসব নলকূপের পানি নিরাপদ ছিল, এখন কিছু এলাকায় পানির গন্ধ ও স্বাদ পরিবর্তন হয়েছে। যদিও সব এলাকায় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হয়নি, তবুও জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা বজায় রাখতে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং পর্যবেক্ষণ জরুরি।

স্থানীয় কৃষি ও জীবিকায় প্রভাব

রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের পর উখিয়া ও টেকনাফের বহু বনভূমি, পাহাড়ি এলাকা ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কিছু এলাকায় বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্য নেমে এসে জমির উর্বরতা কমাচ্ছে।

উখিয়ার কুতুপালং এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, ‘ আগে শত শত একর জমিতে চাষাবাদ হত, এখন তা আর নেই। ক্যাম্পের বর্জ্যের কারণে আমাদের জমি নষ্ট হয়ে গেছে।’

এ ছাড়া অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের কারণে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, পাহাড় কাটাসহ পরিবেশ ধ্বংসের নানা ঘটনা ঘটেছে। এতে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহীনুল ইসলাম বলেন, ‘ রোহিঙ্গা সংকটের কারণে প্রায় ৮ হাজার একরের সংরক্ষিত বনভুমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ সীমিত জনবল স্বত্তেও আমরা বন ও পরিবেশের স্বার্থে সাধ্য মত তৎপরতা অব্যাহত রেখেছি।’

অনেক স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, ক্যাম্পকেন্দ্রিক যানজট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতাও তাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।

রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মানবিক সংস্থাগুলো নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম, টয়লেট নির্মাণ ও বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালালেও বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় তা অনেক সময় পর্যাপ্ত হচ্ছে না।

সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি

পরিবেশবিদরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় এখন জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে আধুনিক ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বৃদ্ধি, নিরাপদ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, ভূগর্ভস্থ পানির নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কর্মসূচি।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান জানান,’ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। ফিকাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট, বর্জ্য অপসারণ ও নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে যেন মানববর্জ্য ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব কমাতে পরিবেশ পুনর্বাসন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘ হবে, পরিবেশ ও স্থানীয় জনপদের ওপর চাপ তত বাড়বে। তাই মানবিক সহায়তার পাশাপাশি পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

কক্সবাজারে বাস্তুচ্যুত পরিস্থিতিতে সংঘাত-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা বিষয়ক কর্মশালা সম্পন্ন

মানবতার আয়োজনে মানববর্জ্যে পরিবেশের বাজছে বারোটা!

আপডেট সময় : ১২:১৮:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বসবাস এখন শুধু মানবিক সংকট নয়, বড় পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সংকটেও রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপন্ন হলেও তা ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় পরিবেশ, কৃষিজমি, খাল-নালা ও জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না হলে কক্সবাজারের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য

উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিদিন কয়েকশ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার বড় অংশই মানববর্জ্য ও প্লাস্টিকজাত আবর্জনা।

ক্যাম্পগুলো পাহাড় কেটে গড়ে ওঠায় মাটির স্থায়িত্ব কমে গেছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির সঙ্গে টয়লেটের বর্জ্য নিচু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় খাল, পুকুর ও জলাধার দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক এলাকায় দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

স্থানীয়দের ক্ষোভ ও উদ্বেগ

রাজাপালংয়ের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাপ স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক এলাকায় পানি দূষণ, দুর্গন্ধ ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেড়েছে। স্থানীয় জনগণও এখন নানা সংকটের মধ্যে আছে।’

স্থানীয় অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হোসাইন বলেন, ‘ক্যাম্পের মানববর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে পরিবেশ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। পাহাড়, বন ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শুধু ক্যাম্পের ভেতরে নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষতি কমাতেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয়দের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্প জরুরি হয়ে পড়েছে।’

ভূগর্ভস্থ পানির ঝুঁকি

পরিবেশবিদদের মতে, ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক অস্থায়ী ল্যাট্রিন ও সেপটিক পিট তৈরি করা হলেও সেগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছু এলাকায় মানববর্জ্য মাটির নিচে জমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে দূষণের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে যেসব নলকূপের পানি নিরাপদ ছিল, এখন কিছু এলাকায় পানির গন্ধ ও স্বাদ পরিবর্তন হয়েছে। যদিও সব এলাকায় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা হয়নি, তবুও জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা বজায় রাখতে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং পর্যবেক্ষণ জরুরি।

স্থানীয় কৃষি ও জীবিকায় প্রভাব

রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের পর উখিয়া ও টেকনাফের বহু বনভূমি, পাহাড়ি এলাকা ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কিছু এলাকায় বৃষ্টির পানির সঙ্গে বর্জ্য নেমে এসে জমির উর্বরতা কমাচ্ছে।

উখিয়ার কুতুপালং এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, ‘ আগে শত শত একর জমিতে চাষাবাদ হত, এখন তা আর নেই। ক্যাম্পের বর্জ্যের কারণে আমাদের জমি নষ্ট হয়ে গেছে।’

এ ছাড়া অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের কারণে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, পাহাড় কাটাসহ পরিবেশ ধ্বংসের নানা ঘটনা ঘটেছে। এতে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহীনুল ইসলাম বলেন, ‘ রোহিঙ্গা সংকটের কারণে প্রায় ৮ হাজার একরের সংরক্ষিত বনভুমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ সীমিত জনবল স্বত্তেও আমরা বন ও পরিবেশের স্বার্থে সাধ্য মত তৎপরতা অব্যাহত রেখেছি।’

অনেক স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, ক্যাম্পকেন্দ্রিক যানজট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতাও তাদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।

রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মানবিক সংস্থাগুলো নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম, টয়লেট নির্মাণ ও বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালালেও বিপুল জনগোষ্ঠীর তুলনায় তা অনেক সময় পর্যাপ্ত হচ্ছে না।

সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগের দাবি

পরিবেশবিদরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় এখন জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে আধুনিক ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বৃদ্ধি, নিরাপদ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, ভূগর্ভস্থ পানির নিয়মিত পরীক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কর্মসূচি।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান জানান,’ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। ফিকাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট, বর্জ্য অপসারণ ও নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে যেন মানববর্জ্য ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব কমাতে পরিবেশ পুনর্বাসন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘ হবে, পরিবেশ ও স্থানীয় জনপদের ওপর চাপ তত বাড়বে। তাই মানবিক সহায়তার পাশাপাশি পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।