রাষ্ট্রপতি পদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্রও গতকাল জমা দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট হবে। সে ক্ষেত্রে ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে দেশ।
সর্বশেষ ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। ওই নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর ক্ষমতাসীন দলগুলোর মনোনীত সাতজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। এবার বিরোধী দল প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘ সময় পর ভোটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে সংসদের সংখ্যার সমীকরণে ফলাফল নিয়ে কার্যত কোনো অনিশ্চয়তা নেই।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী রোববার ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট বিকেল চারটা। বৈধ প্রার্থী একজন থাকলে তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। দুজন প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট বেলা দুইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোট গ্রহণ হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গোপন নয়। সংসদ সদস্যরা ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশাপাশি নিজের নাম ও আসন নম্বরও লিখবেন। বিএনপির চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে। যদিও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে ভিন্ন আইনি মতও রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রায় ১৬ বছর বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার সময় বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক মামলায় ছয়বার কারাগারে যান।
এরপর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ সময় তিনি এ–ও জানান, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
বেলা আড়াইটার দিকে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দীনের কাছে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেয়। তাঁর মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক ও সমর্থক হয়েছেন যথাক্রমে দলের দুই জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংসদ সদস্য আবদুল মঈন খান এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
তবে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সচিবালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি; মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। কার্যত সেখানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব এবং সংসদের চিফ হুইপ ও হুইপদের ডেকেছেন। ওই বৈঠকে মূলত রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থীর প্রস্তাবক ও সমর্থক ঠিক করে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দলের চেয়ারম্যান প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকালের বৈঠকে একমাত্র রাষ্ট্রপতির বিষয় ছাড়া আর কোনো আলোচনাই হয়নি। মন্ত্রিসভার রদবদল এবং আমাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ কিছু গণমাধ্যমে যে খবর ছড়ানো হয়েছে, তাতে আমি বিব্রত।’
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিএনপির ‘দলীয় বৈঠক’ নিয়ে বিরোধী দলের এক নেতার সমালোচনার জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের ডেকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। সেখানে তাঁদের দলের কোনো বৈঠক হয়নি।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে অলি আহমদের মনোনয়নপত্র সিইসির কাছে জমা দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ সময় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, নাজিবুর রহমান মোমেন, কামাল হোসেন, আবদুল বাতেন, এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমীনসহ ১১–দলীয় ঐক্যের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। অলি আহমদের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। সমর্থক হয়েছেন এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমীন।
পরে ইসি সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রপতি পদে দুজন প্রার্থীর তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। একটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের, অন্য দুটি অলি আহমদের। এক প্রার্থীর দুটি মনোনয়নপত্রের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আইন অনুযায়ী প্রথমটাই যদি বৈধ হয়ে যায়, দ্বিতীয়টার বাচাই করার দরকার হবে না।
রাজনৈতিকভাবে অলি আহমদ একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি বীর বিক্রম খেতাব পান। জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বিএনপির সরকারে একাধিকবার মন্ত্রীও ছিলেন। ২০০৬ সালে বিএনপি ছেড়ে তিনি এলডিপি গঠন করেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দেয় তাঁর দল।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নের ফলে বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসছেন, সেই আলোচনাও শুরু হয়েছে। আর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর মন্ত্রিত্ব এবং সংসদীয় আসন—এই দুই জায়গায় শূন্যতা তৈরি হবে।
বিএনপির নেতারা জানান, নতুন মহাসচিব বা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে দলের আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহারের সময়সীমা এবং ভোট—এই কয়েকটি আনুষ্ঠানিক ধাপ এখনো বাকি। তবে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বলছে, সব প্রক্রিয়া শেষে বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
টিটিএন ডেস্ক: 























