ঢাকা ০৬:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রামুর রাজারকুলে এপেক্সিয়ান আবুল কায়সারের সৌজন্যে ফ্রি চক্ষু ক্যাম্প টেকনাফে অপহরণ ও চাঁদাবাজি মামলার পলাতক আসামি গ্রেফতার কক্সবাজার সিটি কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে ছাত্রদলের স্মারকলিপি পাহাড় কেটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ ! পাচারকারীর ফেলে যাওয়া বস্তায় মিললো বিপুল ইয়াবা প্রতিহিংসাবশত কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা এই মাটিতে হবে না: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী টুয়াকের নতুন নেতৃত্ব: সভাপতি আনোয়ার কামাল ও সাধারণ সম্পাদক আকতার নূর মহেশখালীর ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ডাকাত ‘ফজল’ র‍্যাবের কব্জায় টেকনাফে অপহরণ ও চাঁদাবাজি মামলার পলাতক আসামি ‘ল্যাংড়া রাসেল’ গ্রেফতার টেকনাফে মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার কক্সবাজারে ২১ মামলার আসামি ‘কলিম ডাকাত’ গ্রেপ্তার ঘুষ মামলার আসামি অনিক দে’র ‘ভালো পোস্টিং’: স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন টেকনাফে নতুন ৫টি ইউনিয়ন করার উদ্যোগ: এমপি শাহজাহান চৌধুরীর সুপারিশে জেলা প্রশাসনের নির্দেশ ইয়াবাসহ তিন নারী আটক নয়ন সাধুকে হত্যার প্রতিবাদে কক্সবাজারে পূজা উদযাপন পরিষদের বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল

পাহাড় কেটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ !

কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগরে নির্মাণাধীন একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র প্রকল্প ঘিরে পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন কাজে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বালু ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে আশপাশের পাহাড়ি টিলা কেটে এবং কৃষিজমির উর্বর মাটি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন দ্রুত বিলীন হচ্ছে ছোট ছোট পাহাড়, অন্যদিকে কৃষিজমিও হারাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রশিদনগরের প্রায় ১০ একরজুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা লালচে-বাদামী মাটি দিয়ে ভরাট করে সমতল করা হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক ফুট উঁচু করে মাটি ফেলা হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্রাক ও ডাম্পারযোগে মাটি এনে ফেলার কাজ চলছে। ফলে প্রকল্প এলাকা এখন যেন একটি বিশাল মাটির ডিপোতে পরিণত হয়েছে।

এই এলাকায় ১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস (গ্যাস ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার) সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে। এমন উচ্চ ক্ষমতার বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য সাধারণত নির্ধারিত প্রকৌশল মান অনুযায়ী বালু দিয়ে ভরাট করার নিয়ম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রকল্পে ব্যবহৃত অধিকাংশ মাটি আশপাশের পাহাড়ি টিলা ও কৃষিজমি থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে রশিদনগর, জোয়ারিয়ানালা ও কাউয়ারখোপ এলাকায় গত কয়েক মাসে একাধিক টিলা কেটে সমতল করা হয়েছে।

প্রবীণ বাসিন্দা আবু ছৈয়দ বলেন, “যেসব জায়গায় আগে ছোট ছোট পাহাড় ছিল, এখন সেগুলো আর নেই। ট্রাকে করে সেই মাটিই এখানে আনা হচ্ছে।”

কৃষক আবদুল হক বলেন, “আমাদের জমির ওপরের উর্বর মাটি তুলে নেওয়া হচ্ছে। এই মাটি গেলে জমি আর আগের মতো ফসল দেবে না। বর্গা চাষের জমি বলে মালিককে কিছু বলতে পারছি না। কিন্তু ক্ষতিটা আমাদের হচ্ছে। ”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ’র মতে, পাহাড় কাটা মানে শুধু মাটি সরানো নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করা। এতে বনজ গাছপালা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও প্রাকৃতিক জলধারণ ক্ষমতা একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে।

তার দাবি, অন্যদিকে কৃষিজমির ওপরের উর্বর স্তর বা টপসয়েল সরিয়ে নেওয়া হলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুর তুলনায় মাটির দাম অনেক কম হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য স্থানীয় পাহাড় ও কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করছে।

তাঁদের ভাষ্য, “দূর থেকে বালু আনতে খরচ বেশি। তাই কাছের পাহাড় কেটে মাটি এনে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

এ ধরনের ভরাট কাজে নির্ধারিত উপকরণ ব্যবহার না করলে ভবিষ্যতে অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভারী বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের ক্ষেত্রে মাটির গুণগত মান, ঘনত্ব ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় শিক্ষক নুরুল কবির বলেন, “এই মাটির ওপর যদি সাবস্টেশন দাঁড়ায়, তাহলে ভিত্তি কতটা শক্ত হবে? ভবিষ্যতে কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না ? এই প্রশ্ন আমাদের মনে আছে।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) রামু উপজেলার সাধারণ সম্পাদক সায়েদ জুয়েল বলেন,
“চলতি বছরেই রামুতে সবচেয়ে বেশি পাহাড় ও কৃষিজমির মাটি বিলীন হয়েছে। এটি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

তিনি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করে দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্পের ঠিকাদার আতাউর রহমানের দাবি, “সরকারি আইনকানুন মেনেই কাজ করা হচ্ছে।”

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিষয়টি প্রশাসনের নজরের বাইরে থাকার কথা নয়। তবুও এভাবে প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা ও মাটি পরিবহনের ঘটনা চলতে থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তাঁদের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলামের ভাষ্য, “রামুর রশিদনগরের এই প্রকল্প আবারও সামনে এনেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন- উন্নয়ন কি পরিবেশের ক্ষতির বিনিময়ে হবে? বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি পাহাড় বিলীন করে, কৃষিজমি নষ্ট করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তবে তার মূল্য কতটা গ্রহণযোগ্য ?

##

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

রামুর রাজারকুলে এপেক্সিয়ান আবুল কায়সারের সৌজন্যে ফ্রি চক্ষু ক্যাম্প

পাহাড় কেটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ !

আপডেট সময় : ০৪:০৩:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগরে নির্মাণাধীন একটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র প্রকল্প ঘিরে পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন কাজে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বালু ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে আশপাশের পাহাড়ি টিলা কেটে এবং কৃষিজমির উর্বর মাটি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন দ্রুত বিলীন হচ্ছে ছোট ছোট পাহাড়, অন্যদিকে কৃষিজমিও হারাচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রশিদনগরের প্রায় ১০ একরজুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা লালচে-বাদামী মাটি দিয়ে ভরাট করে সমতল করা হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক ফুট উঁচু করে মাটি ফেলা হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্রাক ও ডাম্পারযোগে মাটি এনে ফেলার কাজ চলছে। ফলে প্রকল্প এলাকা এখন যেন একটি বিশাল মাটির ডিপোতে পরিণত হয়েছে।

এই এলাকায় ১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস (গ্যাস ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার) সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে। এমন উচ্চ ক্ষমতার বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য সাধারণত নির্ধারিত প্রকৌশল মান অনুযায়ী বালু দিয়ে ভরাট করার নিয়ম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রকল্পে ব্যবহৃত অধিকাংশ মাটি আশপাশের পাহাড়ি টিলা ও কৃষিজমি থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে রশিদনগর, জোয়ারিয়ানালা ও কাউয়ারখোপ এলাকায় গত কয়েক মাসে একাধিক টিলা কেটে সমতল করা হয়েছে।

প্রবীণ বাসিন্দা আবু ছৈয়দ বলেন, “যেসব জায়গায় আগে ছোট ছোট পাহাড় ছিল, এখন সেগুলো আর নেই। ট্রাকে করে সেই মাটিই এখানে আনা হচ্ছে।”

কৃষক আবদুল হক বলেন, “আমাদের জমির ওপরের উর্বর মাটি তুলে নেওয়া হচ্ছে। এই মাটি গেলে জমি আর আগের মতো ফসল দেবে না। বর্গা চাষের জমি বলে মালিককে কিছু বলতে পারছি না। কিন্তু ক্ষতিটা আমাদের হচ্ছে। ”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ’র মতে, পাহাড় কাটা মানে শুধু মাটি সরানো নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করা। এতে বনজ গাছপালা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও প্রাকৃতিক জলধারণ ক্ষমতা একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে।

তার দাবি, অন্যদিকে কৃষিজমির ওপরের উর্বর স্তর বা টপসয়েল সরিয়ে নেওয়া হলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুর তুলনায় মাটির দাম অনেক কম হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য স্থানীয় পাহাড় ও কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করছে।

তাঁদের ভাষ্য, “দূর থেকে বালু আনতে খরচ বেশি। তাই কাছের পাহাড় কেটে মাটি এনে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

এ ধরনের ভরাট কাজে নির্ধারিত উপকরণ ব্যবহার না করলে ভবিষ্যতে অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভারী বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের ক্ষেত্রে মাটির গুণগত মান, ঘনত্ব ও স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় শিক্ষক নুরুল কবির বলেন, “এই মাটির ওপর যদি সাবস্টেশন দাঁড়ায়, তাহলে ভিত্তি কতটা শক্ত হবে? ভবিষ্যতে কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না ? এই প্রশ্ন আমাদের মনে আছে।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) রামু উপজেলার সাধারণ সম্পাদক সায়েদ জুয়েল বলেন,
“চলতি বছরেই রামুতে সবচেয়ে বেশি পাহাড় ও কৃষিজমির মাটি বিলীন হয়েছে। এটি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

তিনি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করে দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্পের ঠিকাদার আতাউর রহমানের দাবি, “সরকারি আইনকানুন মেনেই কাজ করা হচ্ছে।”

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিষয়টি প্রশাসনের নজরের বাইরে থাকার কথা নয়। তবুও এভাবে প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা ও মাটি পরিবহনের ঘটনা চলতে থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তাঁদের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলামের ভাষ্য, “রামুর রশিদনগরের এই প্রকল্প আবারও সামনে এনেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন- উন্নয়ন কি পরিবেশের ক্ষতির বিনিময়ে হবে? বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি পাহাড় বিলীন করে, কৃষিজমি নষ্ট করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তবে তার মূল্য কতটা গ্রহণযোগ্য ?

##