ঢাকা ১০:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সমুদ্রে ভেঁসে যাওয়া ছেলে জীবিত উদ্ধার হলেও খোঁজ মিলছে না বাবার এক সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ : মিশকাতুল মমতজা মুমুর একক পরিবেশনা লন্ডনের হোটেলে সৌদি যুবরাজের মৃত্যু: তদন্তে মিলল মাদক গ্রহণের প্রমাণ চুনতিতে গভীর রাতে বন্য হাতির তাণ্ডব ​টেকনাফ-উখিয়ার নিরাপত্তা ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন, ৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রস্তুতি সম্পন্ন: বঙ্গভবন জামায়াত ফেরেশতার দল নয়, আমাদেরও ভুলত্রুটি হয়: শফিকুর রহমান গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কাজ করছে সরকার : ফখরুল পুলিশের কাজ মানুষের সেবা করা-ইলিয়াছ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পুলিশ সুপার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যৌথ অভিযান: সন্ত্রাসী জিয়াউর রহমানসহ আটক ১৭, অস্ত্র ও ইয়াবা উদ্ধার গর্জনিয়া-কচ্ছপিয়ার মানুষ পুলিশ বান্ধব- রামুর ওসি মুনিরুল জেলা শিল্পকলা একাডেমির “বর্ষায় নজরুল” স্মরণ অনুষ্ঠান ‘প্রশ্নটা বিব্রতকর’, পদত্যাগের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি ​রাজু ভাস্কর্যে এমপি শাহজাহান চৌধুরীর আশ্বাসে অনশন ভাঙলেন সাইফুল ইসলাম জিহাদী খুনিয়া পালংয়ে কলেজ ছাত্রকে জড়িয়ে প্রকাশিত সংবাদের ব্যাখ্যা ও প্রতিবাদ

ব্যাংক একত্রীকরণ : নাম বদল নাকি বাস্তব পরিবর্তন?

সকালে এক ব্যক্তি প্রতিদিনের মতো ব্যাংকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হাতে চেক বই আর জমার খাতা। কিন্তু ব্যাংকে পৌঁছে দেখলেন, তার পরিচিত সেই শাখার নামই বদলে গেছে! কেউ জানায়নি, কেউ ব্যাখ্যা দেয়নি, তার ব্যাংকটি এখন আর একক কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের একটি নতুন নামের নিচে “একত্রীকৃত” হয়ে গেছে।

এই চিত্রটিই বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান বাস্তবতা। সরকার ঘোষণা দিয়েছে, পাঁচটি দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত বাণিজ্যিক ব্যাংককে একত্র করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করা হবে। অর্থাৎ “Consolidation” বা “একত্রীকরণ”। একত্রীকরণ মূলত দুর্বল ব্যাংক গুলোকে এক ছাতার নিচে এনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নতুন নাম দিয়ে পুনর্গঠন করার প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশে এর ইতিহাস এটি নতুন নয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর সরকার দেশের ১২টি বেসরকারি ব্যাংককে একত্র করে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠন করেন। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যায়, রাজনৈতিক নিয়োগ, অদক্ষতা ও ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি এই একত্রীকরণকে দুর্বল করে দেয়।

১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে শুরু হয় বেসরকারিকরণ, কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনাদায়ী ঋণের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি মেলেনি। আজও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১০ শতাংশ, কিছু ব্যাংকে তা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছুঁয়েছে (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২৪)।

এই প্রেক্ষাপটে একত্রীকরণ বা consolidation নিয়ে আসা হয়েছে স্থিতিশীলতার আশায়। মূল উদ্দেশ্য, দুর্বল ব্যাংক গুলোকে একত্র করে একটি তুলনামূলক ভাবে শক্ত ভিত্তি তৈরি করা, খরচ কমানো এবং আস্থা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু ইতিহাস বলছে, একত্রীকরণ সফল হতে হলে শুধু নাম বদল নয়, প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার।

বিশ্বে এর সফলতা-ব্যর্থতা দুই-ই আছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো দুর্বল ব্যাংক অধিগ্রহণ করে (merger) বাজার স্থিতিশীল রাখে, যেমন JP Morgan Chase অধিগ্রহণ করে Bear Stearns। এতে বাজারে আস্থা ফেরে এবং আমানতকারীরা সুরক্ষা পায় (সূত্র: U.S. Federal Reserve Report on Financial Stability, 2009).

২০১৯ সালে ভারত ১০টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে একত্র করে ৪টি বড় ব্যাংকে রূপান্তর করে (consolidation)। এর আগে তারা খারাপ ঋণ ছেঁটে ফেলে, দক্ষ পরিচালনা বোর্ড নিয়োগ দেয় এবং রিজার্ভ ব্যাংক কঠোর তদারকি শুরু করে। ফলাফল, ব্যাংক খাত পুনরুজ্জীবিত হয়, কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় (সূত্র: Reserve Bank of India, Consolidation Report 2021).

কিন্তু সব দেশই সফল হয়নি। ইউরোপে Royal Bank of Scotland (RBS) একীভূতকরণের পর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে; ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্য সরকারকে ৪৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা দিতে হয়। পরে সরকার নিজেই ১০ বিলিয়ন পাউন্ডের ও বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে (সূত্র: Financial Conduct Authority, UK). ভারতের IDBI Bank ২০০৫ সালে একীভূত হওয়ার পরও বিপুল খারাপ ঋণে জর্জরিত। ২০১৯ সালে সরকারকে ৯,০০০ কোটি রুপি সহায়তা দিতে হয়, তবু ব্যাংকটি এখনো পূর্ণ পুনরুদ্ধার করতে পারেনি (সূত্র: The Times of India)।

ইতিহাস তাই বলছে, ব্যাংক একত্রীকরণ সফল হয় তখনই, যখন সেটির সঙ্গে প্রকৃত অর্থনৈতিক পুনঃমূল্যায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতিনির্ধারণ যুক্ত থাকে। অন্যথায় এটি শুধু “সমস্যার পুনঃপ্যাকেজিং” মাত্র।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই একত্রীকরণ কি সত্যিই আর্থিক সংস্কারের অংশ, নাকি কাগজে-কলমে একটি নাম পরিবর্তন? যদি এটি হয় দুর্বল ব্যাংক গুলোর দায় লুকানোর উপায়, তাহলে এতে আর্থিক খাতের আস্থা আরও কমে যাবে। কিন্তু যদি এটি হয় সুশাসন, পেশাদারিত্ব, এবং সম্পদের বাস্তব পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপ, তাহলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।

ইতিহাস আমাদের সামনে দুই পথ দেখিয়ে রেখেছে, একদিকে আছে নাম বদলের ভেতর লুকানো সমস্যার পাহাড়, অন্যদিকে আছে সঠিক নীতি ও ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা। এখন নির্ভর করছে আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব, নাকি ইতিহাসকে আবারও পুনরাবৃত্তি হতে দেব।

শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক, লেখক ও চিন্তক

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

সমুদ্রে ভেঁসে যাওয়া ছেলে জীবিত উদ্ধার হলেও খোঁজ মিলছে না বাবার

ব্যাংক একত্রীকরণ : নাম বদল নাকি বাস্তব পরিবর্তন?

আপডেট সময় : ০৯:৩২:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ অক্টোবর ২০২৫

সকালে এক ব্যক্তি প্রতিদিনের মতো ব্যাংকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হাতে চেক বই আর জমার খাতা। কিন্তু ব্যাংকে পৌঁছে দেখলেন, তার পরিচিত সেই শাখার নামই বদলে গেছে! কেউ জানায়নি, কেউ ব্যাখ্যা দেয়নি, তার ব্যাংকটি এখন আর একক কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, বরং পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের একটি নতুন নামের নিচে “একত্রীকৃত” হয়ে গেছে।

এই চিত্রটিই বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান বাস্তবতা। সরকার ঘোষণা দিয়েছে, পাঁচটি দুর্বল বা সমস্যাগ্রস্ত বাণিজ্যিক ব্যাংককে একত্র করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন করা হবে। অর্থাৎ “Consolidation” বা “একত্রীকরণ”। একত্রীকরণ মূলত দুর্বল ব্যাংক গুলোকে এক ছাতার নিচে এনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নতুন নাম দিয়ে পুনর্গঠন করার প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশে এর ইতিহাস এটি নতুন নয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর সরকার দেশের ১২টি বেসরকারি ব্যাংককে একত্র করে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠন করেন। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যায়, রাজনৈতিক নিয়োগ, অদক্ষতা ও ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি এই একত্রীকরণকে দুর্বল করে দেয়।

১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে শুরু হয় বেসরকারিকরণ, কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অনাদায়ী ঋণের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি মেলেনি। আজও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ১০ শতাংশ, কিছু ব্যাংকে তা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছুঁয়েছে (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, ২০২৪)।

এই প্রেক্ষাপটে একত্রীকরণ বা consolidation নিয়ে আসা হয়েছে স্থিতিশীলতার আশায়। মূল উদ্দেশ্য, দুর্বল ব্যাংক গুলোকে একত্র করে একটি তুলনামূলক ভাবে শক্ত ভিত্তি তৈরি করা, খরচ কমানো এবং আস্থা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু ইতিহাস বলছে, একত্রীকরণ সফল হতে হলে শুধু নাম বদল নয়, প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার।

বিশ্বে এর সফলতা-ব্যর্থতা দুই-ই আছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী ব্যাংকগুলো দুর্বল ব্যাংক অধিগ্রহণ করে (merger) বাজার স্থিতিশীল রাখে, যেমন JP Morgan Chase অধিগ্রহণ করে Bear Stearns। এতে বাজারে আস্থা ফেরে এবং আমানতকারীরা সুরক্ষা পায় (সূত্র: U.S. Federal Reserve Report on Financial Stability, 2009).

২০১৯ সালে ভারত ১০টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে একত্র করে ৪টি বড় ব্যাংকে রূপান্তর করে (consolidation)। এর আগে তারা খারাপ ঋণ ছেঁটে ফেলে, দক্ষ পরিচালনা বোর্ড নিয়োগ দেয় এবং রিজার্ভ ব্যাংক কঠোর তদারকি শুরু করে। ফলাফল, ব্যাংক খাত পুনরুজ্জীবিত হয়, কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় (সূত্র: Reserve Bank of India, Consolidation Report 2021).

কিন্তু সব দেশই সফল হয়নি। ইউরোপে Royal Bank of Scotland (RBS) একীভূতকরণের পর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে; ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্য সরকারকে ৪৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড সহায়তা দিতে হয়। পরে সরকার নিজেই ১০ বিলিয়ন পাউন্ডের ও বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে (সূত্র: Financial Conduct Authority, UK). ভারতের IDBI Bank ২০০৫ সালে একীভূত হওয়ার পরও বিপুল খারাপ ঋণে জর্জরিত। ২০১৯ সালে সরকারকে ৯,০০০ কোটি রুপি সহায়তা দিতে হয়, তবু ব্যাংকটি এখনো পূর্ণ পুনরুদ্ধার করতে পারেনি (সূত্র: The Times of India)।

ইতিহাস তাই বলছে, ব্যাংক একত্রীকরণ সফল হয় তখনই, যখন সেটির সঙ্গে প্রকৃত অর্থনৈতিক পুনঃমূল্যায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতিনির্ধারণ যুক্ত থাকে। অন্যথায় এটি শুধু “সমস্যার পুনঃপ্যাকেজিং” মাত্র।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই একত্রীকরণ কি সত্যিই আর্থিক সংস্কারের অংশ, নাকি কাগজে-কলমে একটি নাম পরিবর্তন? যদি এটি হয় দুর্বল ব্যাংক গুলোর দায় লুকানোর উপায়, তাহলে এতে আর্থিক খাতের আস্থা আরও কমে যাবে। কিন্তু যদি এটি হয় সুশাসন, পেশাদারিত্ব, এবং সম্পদের বাস্তব পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপ, তাহলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।

ইতিহাস আমাদের সামনে দুই পথ দেখিয়ে রেখেছে, একদিকে আছে নাম বদলের ভেতর লুকানো সমস্যার পাহাড়, অন্যদিকে আছে সঠিক নীতি ও ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা। এখন নির্ভর করছে আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব, নাকি ইতিহাসকে আবারও পুনরাবৃত্তি হতে দেব।

শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক, লেখক ও চিন্তক