ঢাকা ০৮:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সিটি কর্পোরেশন হলে কক্সবাজার সদর উপজেলা থাকবে না উখিয়ায় নিখোঁজের ২ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার ৭ বছর বয়সী পূর্ণ বড়ুয়া, পরিবারের কাছে হস্তান্তর উখিয়ায় মানসিক রোগী তিন সন্তানের জননী নিখোঁজ, সন্ধান চায় পরিবার রামুতে ​মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় শেফা ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধের নির্দেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা ১৫টি জেলে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হলো নতুন নৌকা কক্সবাজার সিটি কলেজ এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় মুবিন আটক রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিকতার সঙ্গে নিরাপত্তার ভারসাম্য জরুরি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে পানিতে পড়ে নিখোঁজ, ১৮ ঘণ্টা পর শামীমের মরদেহ উদ্ধার সাভারে পুলিশের এসআইকে পিটিয়ে হত্যা চৌফলদন্ডীকে প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে নাগরিক ঐক্য পরিষদ গঠন সদর থানা পুলিশের বিশেষ অভিযান :ছিনতাইয়ের অভিযোগে সম্রাট নামের যুবক আটক শহরে ডিবির অভিযান : ৪ ছিনতাইকারী আটক লামায় অবৈধ বালু উত্তোলন, শ্যালো মেশিন ও পাইপ জব্দ দুঃশাসনের ক্ষত মুছে বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গড়ছে বিএনপি: লোহাগাড়ায় লায়ন হেলাল
চৌফলদণ্ডী-ভারুয়াখালীকে যুক্ত করার দাবিও জোরালো

সিটি কর্পোরেশন হলে কক্সবাজার সদর উপজেলা থাকবে না

আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রশ্ন। নতুন সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত সীমানা বাস্তবায়ন হলে কক্সবাজার সদর উপজেলার ভবিষ্যৎ কী হবে?

একদিকে সদর উপজেলার দুই ইউনিয়ন পুরোপুরি এবং একটি ইউনিয়নের আংশিক এলাকা সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত সীমানার বাইরে থাকা চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নকেও নতুন নগর প্রশাসনের আওতায় আনার দাবি উঠতে শুরু করেছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার সদর উপজেলার বর্তমান প্রশাসনিক অস্তিত্ব ও সীমানার ভবিষ্যৎ কী হবে?

প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের সীমানায় সদর উপজেলার খুরুশকুল ও পিএমখালী ইউনিয়ন পুরোপুরি এবং ঝিলংজা ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালং ইউনিয়নও নতুন নগর প্রশাসনের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।

কিন্তু সদর উপজেলার ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২১ সালে ঈদগাঁওকে পৃথক উপজেলা ঘোষণার পর কক্সবাজার সদর উপজেলার প্রশাসনিক পরিধি অনেকটাই ছোট হয়ে আসে। বর্তমানে সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের মধ্যে খুরুশকুল ও পিএমখালী পুরোপুরি এবং ঝিলংজার একটি অংশ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে সদর উপজেলার বাইরে থাকবে মূলত চৌফলদণ্ডী, ভারুয়াখালী এবং ঝিলংজার অবশিষ্ট অংশ।

তাহলে সীমিত এই ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে বর্তমান কাঠামোয় সদর উপজেলা বহাল থাকবে, নাকি প্রয়োজন হবে নতুন প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাদ পড়া দুই ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্তির দাবি

সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত সীমানা প্রকাশের পর চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নকে নতুন নগর প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল নিজের ফেসবুক পোস্টে ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নকে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করার দাবিকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন।

চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঈদগাঁও উপজেলা গঠনের সময় চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব উঠলেও স্থানীয়দের দাবির মুখে ইউনিয়নটি সদর উপজেলায় রাখা হয়েছিল।

এখন সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রক্রিয়ায় চৌফলদণ্ডীবাসীকে নতুন নগর প্রশাসনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত না করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে ছাত্রদল নেতা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক রিয়াদ মনি চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নকে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানানোর কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন।

তার ভাষ্য, এলাকার উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নাগরিক সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে এ দাবি বাস্তবায়নে শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক প্রচেষ্টা চালানো হবে। প্রয়োজনে আইনি পথেও যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সুবেদার মেজর আব্দু মাবুদও চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নকে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

সংসদ সদস্যের বার্তা, আবেদন করা যাবে

কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলও বিষয়টি নিয়ে নিজের ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেছেন।

তিনি লিখেছেন, কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার লক্ষ্যে গণবিজ্ঞপ্তি ও শুনানির প্রক্রিয়ায় পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের আগ্রহী অধিবাসীরা অন্তর্ভুক্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে এক মাসের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ প্রস্তাবিত সীমানা এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় স্থানীয় জনগণের মতামত ও আবেদন জানানোর সুযোগ রয়েছে।

এতে চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালীসহ অন্যান্য এলাকার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

উপজেলা থাকবে, নাকি বদলাবে সীমানা?

সিটি কর্পোরেশন গঠিত হলেই কোনো উপজেলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। তবে একটি উপজেলার বড় অংশ নতুন নগর প্রশাসনের অধীনে চলে গেলে তার সীমানা, প্রশাসনিক কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।

এক্ষেত্রে সামনে আসতে পারে কয়েকটি সম্ভাবনা।

বর্তমান সদর উপজেলা ছোট পরিসরে বহাল রাখা হতে পারে। আবার নতুন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে। প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী এলাকার সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর কথাও ভাবতে পারে সরকার।

তবে চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নও ভবিষ্যতে সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে সদর উপজেলার বর্তমান কাঠামো নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কক্সবাজার সদর উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ফলে সদর উপজেলার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।

সদর উপজেলা কার্যালয়ের ভবিষ্যৎ কী?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব কার্যালয় নিয়ে।

বর্তমান সদর উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর শহরকেন্দ্রিক এলাকায় অবস্থিত। সিটি কর্পোরেশনের নতুন সীমানা কার্যকর হলে উপজেলা প্রশাসনের সদর দপ্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার মধ্যে থাকবে কি না, নাকি ভবিষ্যতে তা অন্যত্র স্থানান্তরের প্রয়োজন হবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

যদি নতুন উপজেলা কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রয়োজন হয়, তাহলে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

ঝিলংজার আংশিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জটিলতা

সবচেয়ে বেশি প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে ঝিলংজা ইউনিয়নকে ঘিরে।

প্রস্তাব অনুযায়ী ইউনিয়নটির পুরো এলাকা নয়, নির্দিষ্ট কিছু মৌজা সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হবে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, ইউনিয়নের একটি অংশ সিটি কর্পোরেশনে এবং বাকি অংশ ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে চলবে?

ভোটার তালিকা, ওয়ার্ড সীমানা, ভূমি রেকর্ড, কর ব্যবস্থা, জন্মনিবন্ধন, স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে।

একই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের কেউ সিটি কর্পোরেশনের নাগরিক এবং অন্যরা ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা হলে নাগরিক সেবার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের কী হবে?

খুরুশকুল ও পিএমখালী পুরোপুরি সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের সম্পদ, অফিস, নথিপত্র, জনবল এবং স্থানীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব কীভাবে নতুন কাঠামোয় স্থানান্তরিত হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে বর্তমান চেয়ারম্যান-মেম্বারদের প্রশাসনিক ভূমিকা এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

‘সদর’ উপজেলার পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন

কক্সবাজার শহর শুধু একটি পৌরসভা নয়, এটি জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রও। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান শহরকেন্দ্রিক।

নতুন সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়িত হলে শহর একটি পৃথক নগর প্রশাসনের আওতায় যাবে। তখন শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বর্তমান সদর উপজেলার প্রশাসনিক পরিচয় ও কার্যকারিতা কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো সংশ্লিষ্টদের মতে, সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা প্রশাসন ভিন্ন ধরনের স্থানীয় সরকার কাঠামো হলেও সীমানা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন।

উন্নয়নের সঙ্গে চাই প্রশাসনিক পরিকল্পনাও

প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের আয়তন দাঁড়াবে প্রায় ১৬৯ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার। বর্তমান পৌরসভার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি ইউনিয়নের পুরো বা আংশিক এলাকা যুক্ত করে বড় একটি নগর প্রশাসন গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এতে পরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক, ড্রেনেজ ও নাগরিক সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে শুধু সিটি কর্পোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণ করলে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখন একদিকে সদর উপজেলার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনের সুবিধার আওতায় আসতে বাদ পড়া ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকেও দাবি জোরালো হচ্ছে।

সব মিলিয়ে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশন শুধু একটি নতুন নগর প্রশাসনের পরিকল্পনা নয়, এটি বদলে দিতে পারে জেলার বিদ্যমান প্রশাসনিক মানচিত্রও।

সিটি কর্পোরেশনের নতুন মানচিত্র তৈরির সঙ্গে তাই সমান গুরুত্ব দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে কক্সবাজার সদর উপজেলার ভবিষ্যৎ মানচিত্রও।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

সিটি কর্পোরেশন হলে কক্সবাজার সদর উপজেলা থাকবে না

চৌফলদণ্ডী-ভারুয়াখালীকে যুক্ত করার দাবিও জোরালো

সিটি কর্পোরেশন হলে কক্সবাজার সদর উপজেলা থাকবে না

আপডেট সময় : ০৭:২১:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রশ্ন। নতুন সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত সীমানা বাস্তবায়ন হলে কক্সবাজার সদর উপজেলার ভবিষ্যৎ কী হবে?

একদিকে সদর উপজেলার দুই ইউনিয়ন পুরোপুরি এবং একটি ইউনিয়নের আংশিক এলাকা সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে প্রস্তাবিত সীমানার বাইরে থাকা চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নকেও নতুন নগর প্রশাসনের আওতায় আনার দাবি উঠতে শুরু করেছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার সদর উপজেলার বর্তমান প্রশাসনিক অস্তিত্ব ও সীমানার ভবিষ্যৎ কী হবে?

প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের সীমানায় সদর উপজেলার খুরুশকুল ও পিএমখালী ইউনিয়ন পুরোপুরি এবং ঝিলংজা ইউনিয়নের নির্দিষ্ট কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালং ইউনিয়নও নতুন নগর প্রশাসনের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।

কিন্তু সদর উপজেলার ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২১ সালে ঈদগাঁওকে পৃথক উপজেলা ঘোষণার পর কক্সবাজার সদর উপজেলার প্রশাসনিক পরিধি অনেকটাই ছোট হয়ে আসে। বর্তমানে সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের মধ্যে খুরুশকুল ও পিএমখালী পুরোপুরি এবং ঝিলংজার একটি অংশ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে সদর উপজেলার বাইরে থাকবে মূলত চৌফলদণ্ডী, ভারুয়াখালী এবং ঝিলংজার অবশিষ্ট অংশ।

তাহলে সীমিত এই ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে বর্তমান কাঠামোয় সদর উপজেলা বহাল থাকবে, নাকি প্রয়োজন হবে নতুন প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাদ পড়া দুই ইউনিয়নকে অন্তর্ভুক্তির দাবি

সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাবিত সীমানা প্রকাশের পর চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নকে নতুন নগর প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল নিজের ফেসবুক পোস্টে ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নকে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সংযুক্ত করার দাবিকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন।

চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ঈদগাঁও উপজেলা গঠনের সময় চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব উঠলেও স্থানীয়দের দাবির মুখে ইউনিয়নটি সদর উপজেলায় রাখা হয়েছিল।

এখন সিটি কর্পোরেশন গঠনের প্রক্রিয়ায় চৌফলদণ্ডীবাসীকে নতুন নগর প্রশাসনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত না করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে ছাত্রদল নেতা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক রিয়াদ মনি চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নকে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানানোর কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন।

তার ভাষ্য, এলাকার উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নাগরিক সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে এ দাবি বাস্তবায়নে শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক প্রচেষ্টা চালানো হবে। প্রয়োজনে আইনি পথেও যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

অন্যদিকে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সুবেদার মেজর আব্দু মাবুদও চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নকে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

সংসদ সদস্যের বার্তা, আবেদন করা যাবে

কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলও বিষয়টি নিয়ে নিজের ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করেছেন।

তিনি লিখেছেন, কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার লক্ষ্যে গণবিজ্ঞপ্তি ও শুনানির প্রক্রিয়ায় পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের আগ্রহী অধিবাসীরা অন্তর্ভুক্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে এক মাসের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ প্রস্তাবিত সীমানা এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় স্থানীয় জনগণের মতামত ও আবেদন জানানোর সুযোগ রয়েছে।

এতে চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালীসহ অন্যান্য এলাকার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

উপজেলা থাকবে, নাকি বদলাবে সীমানা?

সিটি কর্পোরেশন গঠিত হলেই কোনো উপজেলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। তবে একটি উপজেলার বড় অংশ নতুন নগর প্রশাসনের অধীনে চলে গেলে তার সীমানা, প্রশাসনিক কার্যকারিতা ও ভবিষ্যৎ কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে।

এক্ষেত্রে সামনে আসতে পারে কয়েকটি সম্ভাবনা।

বর্তমান সদর উপজেলা ছোট পরিসরে বহাল রাখা হতে পারে। আবার নতুন করে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে। প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী এলাকার সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর কথাও ভাবতে পারে সরকার।

তবে চৌফলদণ্ডী ও ভারুয়াখালী ইউনিয়নও ভবিষ্যতে সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে সদর উপজেলার বর্তমান কাঠামো নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কক্সবাজার সদর উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ফলে সদর উপজেলার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।

সদর উপজেলা কার্যালয়ের ভবিষ্যৎ কী?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব কার্যালয় নিয়ে।

বর্তমান সদর উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর শহরকেন্দ্রিক এলাকায় অবস্থিত। সিটি কর্পোরেশনের নতুন সীমানা কার্যকর হলে উপজেলা প্রশাসনের সদর দপ্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার মধ্যে থাকবে কি না, নাকি ভবিষ্যতে তা অন্যত্র স্থানান্তরের প্রয়োজন হবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

যদি নতুন উপজেলা কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রয়োজন হয়, তাহলে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

ঝিলংজার আংশিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জটিলতা

সবচেয়ে বেশি প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে ঝিলংজা ইউনিয়নকে ঘিরে।

প্রস্তাব অনুযায়ী ইউনিয়নটির পুরো এলাকা নয়, নির্দিষ্ট কিছু মৌজা সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হবে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, ইউনিয়নের একটি অংশ সিটি কর্পোরেশনে এবং বাকি অংশ ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে থাকলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে চলবে?

ভোটার তালিকা, ওয়ার্ড সীমানা, ভূমি রেকর্ড, কর ব্যবস্থা, জন্মনিবন্ধন, স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে।

একই ইউনিয়নের বাসিন্দাদের কেউ সিটি কর্পোরেশনের নাগরিক এবং অন্যরা ইউনিয়ন পরিষদের বাসিন্দা হলে নাগরিক সেবার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের কী হবে?

খুরুশকুল ও পিএমখালী পুরোপুরি সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের সম্পদ, অফিস, নথিপত্র, জনবল এবং স্থানীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব কীভাবে নতুন কাঠামোয় স্থানান্তরিত হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে বর্তমান চেয়ারম্যান-মেম্বারদের প্রশাসনিক ভূমিকা এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

‘সদর’ উপজেলার পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন

কক্সবাজার শহর শুধু একটি পৌরসভা নয়, এটি জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রও। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান শহরকেন্দ্রিক।

নতুন সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়িত হলে শহর একটি পৃথক নগর প্রশাসনের আওতায় যাবে। তখন শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বর্তমান সদর উপজেলার প্রশাসনিক পরিচয় ও কার্যকারিতা কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামো সংশ্লিষ্টদের মতে, সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা প্রশাসন ভিন্ন ধরনের স্থানীয় সরকার কাঠামো হলেও সীমানা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন।

উন্নয়নের সঙ্গে চাই প্রশাসনিক পরিকল্পনাও

প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের আয়তন দাঁড়াবে প্রায় ১৬৯ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার। বর্তমান পৌরসভার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি ইউনিয়নের পুরো বা আংশিক এলাকা যুক্ত করে বড় একটি নগর প্রশাসন গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এতে পরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক, ড্রেনেজ ও নাগরিক সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে শুধু সিটি কর্পোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণ করলে নতুন জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখন একদিকে সদর উপজেলার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে সিটি কর্পোরেশনের সুবিধার আওতায় আসতে বাদ পড়া ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকেও দাবি জোরালো হচ্ছে।

সব মিলিয়ে কক্সবাজার সিটি কর্পোরেশন শুধু একটি নতুন নগর প্রশাসনের পরিকল্পনা নয়, এটি বদলে দিতে পারে জেলার বিদ্যমান প্রশাসনিক মানচিত্রও।

সিটি কর্পোরেশনের নতুন মানচিত্র তৈরির সঙ্গে তাই সমান গুরুত্ব দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে কক্সবাজার সদর উপজেলার ভবিষ্যৎ মানচিত্রও।