কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং, বারবাকিয়া ও শিলখালীসহ তিন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে এবং পাহাড়ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শত শত বসতি। বর্ষা মৌসুমে টানা বৃষ্টিপাত হলেই এসব বসতির হাজারো মানুষকে পাহাড়ধসের আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাতে হয়। সম্প্রতি টৈটং ইউনিয়নে পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে উপজেলার পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোর ভয়াবহ ঝুঁকির চিত্র।
স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অসাধু চক্রের সহযোগিতায় পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণের প্রবণতা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে পাহাড় কাটার খবর প্রকাশ পেলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনেক এলাকায় এটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, টৈটং ইউনিয়নে প্রায় ৩৮ হাজার ভোটার থাকলেও জনসংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। ইউনিয়নের ২, ৬ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাড়া প্রায় সব এলাকাই পাহাড়বেষ্টিত। ঢালারমুখ, আলিম্যারজিরি, মধুখালী, ঝুমপাড়া, হাসানের ঝুম, কেরুনছড়ি, গর্জনিয়া, সরকারমোড়া, খুনির্যা ভিটা, খলিফার মুড়া ও লাইনের সিরাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কেটে কিংবা পাহাড়ঘেঁষে অসংখ্য বসতি গড়ে উঠেছে।
একই চিত্র দেখা যায় বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালী, চাকমার ডুরি, ভারুয়াখালী, রাব্বানপাড়া, সবুজপাড়া ও ছনখোলার ঝুম এলাকায়।
এছাড়া শিলখালী ইউনিয়নের সাপেরঘারা, জারুলবুনিয়া, তারাবুনিয়ার ছড়া ও সবুজপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায়ও পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে বহু বসতি।
স্থানীয়দের মতে, ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে প্রতিটি বর্ষা মৌসুমেই আতঙ্কে থাকতে হয় পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোর বাসিন্দাদের।
পহরচাঁদা বিট কর্মকর্তা সরওয়ার জানান, পহরচাঁদা বিটের আওতাধীন সংরক্ষিত বনাঞ্চলে প্রায় ৪০০টি বসতি রয়েছে। এর মধ্যে শিলখালী এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বসতি রয়েছে। পাহাড়ের ঢাল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নির্মিত হওয়ায় এসব বসতি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বারবাকিয়া বিট কর্মকর্তা সজিব বলেন, বারবাকিয়া এলাকায় অন্তত ৩০টি পরিবারকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের সতর্ক করতে বিভিন্ন মসজিদে মাইকিংও করা হয়েছে।
টৈটং বিট কর্মকর্তা আবদুল মোমিন মোতালেব বলেন, “ইতোমধ্যে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। টৈটং এলাকায় প্রায় ৪০০টি বসতি রয়েছে। তবে ঠিক কতটি বসতি চরম ঝুঁকিতে রয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।”
টৈটং ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল আলিম বলেন, টৈটং একটি পাহাড়বেষ্টিত ইউনিয়ন। অধিকাংশ গ্রাম ও বসতি বনাঞ্চলের ভেতরে কিংবা পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় অবস্থিত। অনেক বসতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সম্প্রতি পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
পেকুয়া বারবাকিয়া রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. খালেকুজ্জামান বলেন, “পাহাড়ে বসবাসকারীরা সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাদের সচেতন করতে নিয়মিত মসজিদে মসজিদে মাইকিং করা হচ্ছে।”
পাহাড়ঘেঁষা বসতি প্রসঙ্গে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোছাইন বলেন, “আমাদের তিনটি ইউনিয়নেই পাহাড় রয়েছে এবং সেখানে অনেক বসতিও আছে। তবে পাহাড়গুলোর উচ্চতা তুলনামূলক কম। কিছু ব্যক্তি পাহাড়ঘেঁষে বসতি নির্মাণ করায় তাদের সতর্ক করা হয়েছে।”
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে অনেক বাসিন্দাই নিজ বসতি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে চান না। পাহাড়ধসে নিহত শিশুর পরিবারকে ইতোমধ্যে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু মাইকিং বা সতর্কীকরণ যথেষ্ট নয়। অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর অভিযান, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন, বনভূমি দখল ও পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড়ধসে প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যাবে।
রেজাউল করিম, পেকুয়া: 























