ঢাকা ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মাদরাসা কমিটি নিয়ে বিরোধ, শিক্ষককে পিটিয়ে আহত কক্সবাজারে সদর থানা পুলিশের বিশেষ অভিযান: ১৭ গ্রেপ্তার ওভারটেকের সময় ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে গেলো সিএনজি, প্রাণ গেল দুই যাত্রীর পেকুয়ায় গরুর কা/টা মাথার সূত্র ধরেই মিলল চোরের সন্ধান, গ্রেপ্তার ৩ শাহপরীর দ্বীপে সাড়ে চার কোটি টাকার ইয়াবা উদ্ধার কক্সবাজারে প্রথমবারের মতো ৩ মাসব্যাপী পর্যটন কার্নিভাল সেন্টমার্টিনে খতনার পর অসুস্থ হওয়া শিশুদের চিকিৎসা দিলো সরকারি মেডিকেল টিম আবেগঘন স্ট্যাটাস :সহধর্মিণীর আরোগ্য কামনায় দোয়া চাইলেন এমপি কাজল কক্সবাজারে ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেফতার কক্সবাজারে বিলাস ভ্রমণে গিয়ে ধরা ‘কেডিসি বস্তি’র ৫ বাসিন্দা আজ পৃথিবীর মন খারাপ: ‘বিদায়’ বললেন, ফুটবলের কবি হামের টিকার আওতায় ২ কোটি শিশু, এক মাসে দেওয়া হবে আরও ৩৫ লাখ প্রবাসীদের পরিবার নিয়ে সৌদি থাকার সুযোগ সাগরে লঘুচাপ, টানা বৃষ্টির আভাস দেশকে অস্থির করার জন্য পতিত দোসররা নানাভাবে কাজ করছে : রিজভী

দুদকের হাতে ‘ধরা খাওয়া’ উখিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার বহাল! অনিয়মে জন-ভোগান্তি

কক্সবাজারের উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসছে, তা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘ওপেন সিক্রেট’।

প্রশ্ন উঠছে – অভিযোগের পাহাড়, দুদকের সরেজমিন অভিযান এবং ভুক্তভোগীদের আর্তনাদের পরও কেন কার্যকর পরিবর্তন আসেনি?

সরেজমিনে দেখা যায়, অফিসটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের প্রবেশ সহজ নয়। ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে কার্যত দালালনির্ভর ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। অনেকেই জানান, দালাল ছাড়া ফাইল এগোয় না, আর ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না।

উখিয়া সদর এলাকার এক ভুক্তভোগী বলেন,
“সরকারি ফি জমা দিয়েও আমাকে কয়েকদিন ঘুরতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বলা হলো—‘ম্যানেজ’ না করলে দলিল নামবে না।”

স্থানীয় দলিল লেখক ও একাধিক সূত্রের দাবি, অফিস সহকারী বেবী রাণী দে পুরো অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন এছাড়াও তার সঙ্গে মোহরার সৃদুল দাশ ও রবিউল্লাহ রবির নামও বারবার উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তাদের ঘিরেই একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা অফিসের প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

জমি নিবন্ধনের সময় সরকারি ফি’র বাইরে জমির ঘোষিত মূল্যের প্রায় ০.৫ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ এক কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে দিতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত অর্থ।

জানা গেছে, এই অর্থ সরাসরি নেওয়া হয় না এবং দলিল লেখকদের মাধ্যমেই আদায় করা হয় যাতে করে লেনদেন আড়ালে থাকে।

গত বছরের ১৬ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জেলা কার্যালয়ের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান চালায়।

অভিযানে অতিরিক্ত ফি আদায়, সেবা দিতে গড়িমসি এবং অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অফিসের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,’দুদক আসার খবর আগেই পেয়ে যান সাব-রেজিস্ট্রার। সেদিন অস্বাভাবিকভাবে তিনি সকালেই অফিসে আসেন। অফিসের ভেতরের নগদ সাড়ে ৩ লাখ টাকা দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক গোলসান আনোয়ার অভিযানের দিন গণমাধ্যমকে জানান, ‘ ছদ্মবেশে অভিযানে দলিলের খরচ, পদ্ধতি ও খরচ সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়। উপস্থিত সেবা গ্রহীতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে গ্রহীতাদের হয়রানি এবং অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের বিষয়ে সত্যতা পাওয়া যায়।’

দুদকের অভিযানের পরও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়ায় প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা—এই অভিযান কি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পতিত সরকার আমল থেকে সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলমের দীর্ঘদিন ধরে বহাল তবিয়তে থাকার বিষয়ে । স্থানীয়রা জানান, একাধিকবার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও তিনি বছরের পর বছর একই অফিসে বহাল রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন— ‘যদি অফিসে অনিয়ম না থাকে, তাহলে বারবার অভিযোগ আসে কেন? আর যদি অভিযোগের সত্যতা না থাকে, তাহলে দুদক অভিযান চালাল কেন?’

একজন প্রবীণ দলিল লেখক বলেন, ‘ এখানে যে সিন্ডিকেট চলে, তা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন একই কর্মকর্তা থাকলে এমন কাঠামো গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক।’

ঘুষ আদায়ের পাশাপাশি আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—জমির শ্রেণি পরিবর্তন, প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন এবং এর মাধ্যমে সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এতে অফিসের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বলেন , ‘সরকার বদলেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বদলায়নি। যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আস্থা আরও ভেঙে পড়বে।’

অফিস সহকারী বেবী রাণী দে ও মোহরার সৃদুল দাশের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রবিউল্লাহ রবি বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলম বলেন, ‘অফিসে প্রবেশে কোনো বাধা নেই। সবকিছু সিসিটিভির আওতায়। অবৈধ লেনদেনের সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের অভিমত, কেবল অভিযান নয়—প্রয়োজন প্রশাসনিক জবাবদিহি। একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই জায়গায় বহাল থাকলে সেখানে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে। তারা দ্রুত স্বাধীন তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

মাদরাসা কমিটি নিয়ে বিরোধ, শিক্ষককে পিটিয়ে আহত

দুদকের হাতে ‘ধরা খাওয়া’ উখিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার বহাল! অনিয়মে জন-ভোগান্তি

আপডেট সময় : ০৭:৪১:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসছে, তা এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘ওপেন সিক্রেট’।

প্রশ্ন উঠছে – অভিযোগের পাহাড়, দুদকের সরেজমিন অভিযান এবং ভুক্তভোগীদের আর্তনাদের পরও কেন কার্যকর পরিবর্তন আসেনি?

সরেজমিনে দেখা যায়, অফিসটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের প্রবেশ সহজ নয়। ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে কার্যত দালালনির্ভর ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। অনেকেই জানান, দালাল ছাড়া ফাইল এগোয় না, আর ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না।

উখিয়া সদর এলাকার এক ভুক্তভোগী বলেন,
“সরকারি ফি জমা দিয়েও আমাকে কয়েকদিন ঘুরতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বলা হলো—‘ম্যানেজ’ না করলে দলিল নামবে না।”

স্থানীয় দলিল লেখক ও একাধিক সূত্রের দাবি, অফিস সহকারী বেবী রাণী দে পুরো অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন এছাড়াও তার সঙ্গে মোহরার সৃদুল দাশ ও রবিউল্লাহ রবির নামও বারবার উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তাদের ঘিরেই একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা অফিসের প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

জমি নিবন্ধনের সময় সরকারি ফি’র বাইরে জমির ঘোষিত মূল্যের প্রায় ০.৫ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ এক কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে দিতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত অর্থ।

জানা গেছে, এই অর্থ সরাসরি নেওয়া হয় না এবং দলিল লেখকদের মাধ্যমেই আদায় করা হয় যাতে করে লেনদেন আড়ালে থাকে।

গত বছরের ১৬ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জেলা কার্যালয়ের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান চালায়।

অভিযানে অতিরিক্ত ফি আদায়, সেবা দিতে গড়িমসি এবং অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অফিসের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,’দুদক আসার খবর আগেই পেয়ে যান সাব-রেজিস্ট্রার। সেদিন অস্বাভাবিকভাবে তিনি সকালেই অফিসে আসেন। অফিসের ভেতরের নগদ সাড়ে ৩ লাখ টাকা দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক গোলসান আনোয়ার অভিযানের দিন গণমাধ্যমকে জানান, ‘ ছদ্মবেশে অভিযানে দলিলের খরচ, পদ্ধতি ও খরচ সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়। উপস্থিত সেবা গ্রহীতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে গ্রহীতাদের হয়রানি এবং অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের বিষয়ে সত্যতা পাওয়া যায়।’

দুদকের অভিযানের পরও দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়ায় প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা—এই অভিযান কি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পতিত সরকার আমল থেকে সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলমের দীর্ঘদিন ধরে বহাল তবিয়তে থাকার বিষয়ে । স্থানীয়রা জানান, একাধিকবার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও তিনি বছরের পর বছর একই অফিসে বহাল রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন— ‘যদি অফিসে অনিয়ম না থাকে, তাহলে বারবার অভিযোগ আসে কেন? আর যদি অভিযোগের সত্যতা না থাকে, তাহলে দুদক অভিযান চালাল কেন?’

একজন প্রবীণ দলিল লেখক বলেন, ‘ এখানে যে সিন্ডিকেট চলে, তা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন একই কর্মকর্তা থাকলে এমন কাঠামো গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক।’

ঘুষ আদায়ের পাশাপাশি আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—জমির শ্রেণি পরিবর্তন, প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন এবং এর মাধ্যমে সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এতে অফিসের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বলেন , ‘সরকার বদলেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বদলায়নি। যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আস্থা আরও ভেঙে পড়বে।’

অফিস সহকারী বেবী রাণী দে ও মোহরার সৃদুল দাশের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রবিউল্লাহ রবি বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মোরশেদ আলম বলেন, ‘অফিসে প্রবেশে কোনো বাধা নেই। সবকিছু সিসিটিভির আওতায়। অবৈধ লেনদেনের সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের অভিমত, কেবল অভিযান নয়—প্রয়োজন প্রশাসনিক জবাবদিহি। একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই জায়গায় বহাল থাকলে সেখানে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে। তারা দ্রুত স্বাধীন তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।