কক্সবাজারের চকরিয়ায় মাদরাসা পরিচালনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে শাহাদাত হোসেন নামে এক সহকারী শিক্ষককে মারধর করে আহত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার আমজাদিয়া রফিকুল উলুম কামিল মাদরাসায় এ ঘটনা ঘটে।
আহত শাহাদাত হোসেন ওই মাদরাসার সহকারী শিক্ষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা। হামলায় তাঁর মাথা ও ডান হাতে আঘাত লাগে। পরে স্থানীয় লোকজন ও মাদরাসার অন্য শিক্ষকেরা তাঁকে উদ্ধার করে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শাহাদাত হোসেনের অভিযোগ, মাদরাসার পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে আপত্তি জানানো এবং মাদরাসার বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়ার পর থেকেই কয়েকজন শিক্ষক ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় তাঁকে বিভিন্ন সময় হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। সর্বশেষ বুধবার সকালে তাঁকে একা পেয়ে দুই শিক্ষক হামলা করেন।
শাহাদাতের ভাষ্য, মাদরাসার বর্তমান পরিচালনা কমিটি গঠনের পর থেকেই সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতবিরোধ চলে আসছিল। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে স্থানীয় জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। এ কারণে চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানান তিনি।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া-মাতামুহুরী) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে বর্তমান কমিটি বাতিল করে বিএনপির সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে আবেদন করেন শাহাদাত। তাঁর দাবি, মন্ত্রীর সুপারিশসংবলিত আবেদনটি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয় এবং উপাচার্য আবেদনটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন।
শাহাদাতের অভিযোগ, আবেদন জমা দেওয়ার পরই মাদরাসার গণিত শিক্ষক আব্দুল লতিফের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোপন নথি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ওই শিক্ষকসহ কয়েকজন তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন।
হুমকি ও মানসিক চাপের কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বলেও দাবি করেন শাহাদাত। তাঁর ভাষ্য, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাম্মদ রুকনুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে প্রায় এক মাস বিশ্রামে থেকে চিকিৎসা নেন তিনি। চিকিৎসাধীন থাকার বিষয়টি মাদরাসা প্রশাসনকেও জানানো হয়েছিল।
শাহাদাত বলেন, সুস্থ হয়ে ৪ অক্টোবর তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ লিখিত চিকিৎসা ছুটির আবেদন মাদরাসার সভাপতি ও অধ্যক্ষের কাছে জমা দেন। এরপর নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু আগের হুমকির ধারাবাহিকতায় বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাঁকে একা পেয়ে দুই শিক্ষক হামলা করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, হামলায় তাঁর মাথা ও ডান হাতে আঘাত লাগে। পরে স্থানীয় লোকজন ও অন্য শিক্ষকরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
শাহাদাত আরও অভিযোগ করেন, অসুস্থ থাকার সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ছুটিতে থাকলেও মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. এনায়েমুল হক তাঁকে চিকিৎসা ছুটি না দিয়ে সেপ্টেম্বর মাসের বেতন কর্তন করেন।
অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুল লতিফ চাকরির প্রয়োজনে কাকারা ইউনিয়ন বিএনপির কাছ থেকে নিজেকে বিএনপির কর্মী উল্লেখ করে প্রত্যয়ন নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন শাহাদাত। তাঁর দাবি, কাকারা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক তাঁকে জানিয়েছেন, চাকরির প্রয়োজনে ওই প্রত্যয়ন নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি যদি মন্ত্রীর সুপারিশের বিপরীতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে তা কাকারা বিএনপির সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুল লতিফের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. এনায়েমুল হকের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ করেছেন শাহাদাত। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে রসিদ ছাড়া অর্থ আদায় করে তা মাদরাসার অফিশিয়াল ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। গভর্নিং বডির সভাপতির অনুমোদন ছাড়াই ব্যাংক এশিয়ার লক্ষ্যারচর শাখায় একটি হিসাব পরিচালনা করে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন তিনি।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের সরকারি উপবৃত্তি ও বিভিন্ন সময়ে অনুমোদিত সরকারি বরাদ্দের অর্থ বিধিমতো ব্যবহার না করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর। মাদরাসার শিক্ষকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, ঈদ বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, আর্থিক তথ্য গোপন করা এবং উন্নয়ন ফান্ডে জনসাধারণের কাছ থেকে পাওয়া অনুদান প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা না দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।
শাহাদাতের অভিযোগ, দৈনন্দিন খরচের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে প্রতিষ্ঠানের অর্থ অপচয় করা হচ্ছে। শিক্ষকদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব করে নিজ অনুসারীদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার পর প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুযোগ পাওয়ার কথা থাকলেও পছন্দের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে যোগদানের পরপরই এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন কর্মরত শিক্ষক মো. আলমগীর, মো. শাহাদাত হোসেন, মো. সোহরাব হোছাইন ও মাওলানা নওশাদ ইসলামকে এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
উচ্চতর ডিগ্রিধারী ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের বাদ দিয়ে নিজ অনুসারী এবং প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের নিয়মবহির্ভূতভাবে উচ্চতর শ্রেণিতে পাঠদানের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন শাহাদাত। দাখিল পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালনায় জ্যেষ্ঠতা ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে আগে নকল সরবরাহের অভিযোগে বহিষ্কৃত শিক্ষক ও পছন্দের ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর।
শাহাদাত আরও অভিযোগ করেন, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে অধ্যক্ষের অনৈতিক ও অসৌজন্যমূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় কয়েকজন শিক্ষককে লাঠিপেটা করা হয় এবং দোতলা থেকে ফেলে দেওয়ার পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া গত ৪ মে ২০২৬ তারিখে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন শাহাদাত। এ ঘটনায় আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রভিডেন্ট ফান্ড নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন এই শিক্ষক। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে নিয়ম অনুযায়ী ১০ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক শিক্ষককে ফান্ডের আওতায় নেওয়া হয়নি। যাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও গত ২৬ মাসের মধ্যে ১৫ মাসের অর্থ জমা দেওয়া হয়নি।
এদিকে শাহাদাতের ওপর সর্বশেষ হামলার ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, মাদরাসার পরিচালনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তাই হামলার অভিযোগের পাশাপাশি মাদরাসার আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পরিচালনা কমিটি গঠন এবং শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
চকরিয়া পৌর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিন বাবলু শাহাদাত হোসেনের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, মাদরাসার অভ্যন্তরীণ বিরোধের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে পরিচালনা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে হবে।
বার্তা পরিবেশক 





















