রাখাইনে কি আবারও নতুন করে সংঘাতের মাত্রা বাড়ছে? সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই প্রশ্নই সামনে আনছে। উত্তর রাখাইনের কিয়াউক্তাওয়ে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলায় ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের পর এবার মংডুতেও আরাকান আর্মি (AA) ও আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (ARSA) মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে সীমান্তঘেঁষা রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা ও সামরিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
২৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে কিয়াউক্তাও শহরের একটি ব্যস্ত বাজার ও সংলগ্ন এলাকায় মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় প্রথমে ৩৩ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত হওয়ার তথ্য আসে। পরদিন AP জানায়, উদ্ধারকারী কর্মকর্তা ও আরাকান আর্মির তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৪৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৫৮ জন। আহতদের মধ্যে ২২ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানানো হয়েছে।
কিয়াউক্তাও বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল উত্তর রাখাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদেরও সমাগম হয়। স্থানীয় উদ্ধারকর্মীর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার স্থানটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে ছিল।
মংডুতেও নতুন সংঘর্ষ
কিয়াউক্তাওয়ের হামলার একদিনের মধ্যেই উত্তর মংডুতে আরাকান আর্মি ও ARSA-র মধ্যে সংঘর্ষের খবর দিয়েছে Development Media Group (DMG)। প্রতিবেদনে বলা হয়, মংডু টাউনশিপের উত্তরাঞ্চলে মাইলপোস্ট ৫৬-এর কাছে ARSA আরাকান আর্মির একটি অবস্থানে হামলা চালানোর পর সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর আরাকান আর্মি ওই এলাকায় অভিযান চালায় বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
মংডু বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তের খুব কাছের এলাকা হওয়ায় সেখানে সংঘাতের যেকোনো বিস্তার সরাসরি সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগ—নতুন রোহিঙ্গা ঢল
রাখাইনে সংঘাত তীব্র হলে সবচেয়ে বড় মানবিক ঝুঁকি তৈরি হয় বেসামরিক জনগোষ্ঠীর নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার। চলতি বছরই রাখাইনের সংঘাতের কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে RRRC-এর তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, গত এক বছরে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার নতুন রোহিঙ্গার নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে।
এর আগেও মংডু ও বুথিডং এলাকায় বিমান হামলা ও সংঘাতের সময় টেকনাফ সীমান্তে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা এবং নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল সীমান্তবর্তী সূত্রগুলো। সে সময় বিজিবিও সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছিল।
অর্থাৎ, নতুন করে সংঘাত বাড়লে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি শুধু সীমান্ত নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নতুন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, মানবিক চাপ, মাদক ও অস্ত্র পাচারের ঝুঁকি এবং নাফ নদী ও সীমান্তবর্তী জনপদে নিরাপত্তা উদ্বেগ।
সংঘাত কি বড় আকার নিচ্ছে?
এ মুহূর্তে রাখাইনে নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে কয়েকটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটছে।
কিয়াউক্তাওয়ে বড় ধরনের বিমান হামলা, উত্তর মংডুতে AA–ARSA সংঘর্ষ এবং রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক তৎপরতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে অস্থির, তা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সংঘাতের কারণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
কিয়াউক্তাও হামলার পর আরাকান আর্মি পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে সামনে জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা এবং আরাকান আর্মির সামরিক প্রতিক্রিয়া—দুই দিকেই উত্তেজনা বাড়ে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সীমান্তে নজর এখন মংডু–নাফে
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চল মংডু ও নাফ নদীসংলগ্ন এলাকা। অতীতে রাখাইনের সংঘাত তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তের ওপারে রোহিঙ্গাদের জড়ো হওয়ার এবং বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করার ঘটনা ঘটেছে। চলমান পরিস্থিতিতে সীমান্তে নতুন করে এমন চাপ তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
তবে কিয়াউক্তাওয়ের হামলা থেকে সরাসরি বাংলাদেশ সংলগ্ন ওপারের সীমান্ত অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে-এমন কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং বর্তমান পরিস্থিতিকে রাখাইনে সংঘাতের নতুন করে তীব্রতা বৃদ্ধি এবং তার সম্ভাব্য সীমান্ত-প্রভাব হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক।
রাখাইনের পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে এর প্রথম প্রতিক্রিয়া কোথায় দেখা যাবে—মংডু, নাফ নদী নাকি সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সেদিকেই এখন নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























