ঢাকা ০৩:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অন্যের দুর্দশার খবর লিখি, আমাদের দুর্দশা লিখবে কে? তাজমিনের মৃত্যু :রাজুর বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ডের নির্দেশ আদালতের রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি ভূমধ্যসাগরীয় খাবার নিয়ে ওশ্যান প্যারাডাইসে ১০ দিনের ‘মেডিটেরেনিয়ান ফুড ফেস্টিভ্যাল’ ঈদগাঁওয়ে অগ্নিকাণ্ডে ৩ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত, ক্ষতি অর্ধকোটি টাকা লোহাগাড়ায় ব্যবসায়ীকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, স্বামীকে অক্ষত ফেরত চেয়ে স্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার করেছে এসআরবি-১৫ টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তবর্তী পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে রামুর সেক্টর কমান্ডার শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার করেছে এসআরবি-১৫ লামায় বিদায়ী ইউএনও মঈন উদ্দিনকে প্রেসক্লাবের বিদায় সংবর্ধনা প্রশাসন-গণমাধ্যমের সমন্বয়ে জনসেবা গতিশীল হবে- উখিয়া প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ইউএনওর মতবিনিময় পেকুয়ায় করাতকলে অভিযান, মেশিন ও গাছ জব্দ কয়েক যুগেও লাগেনি উন্নয়নের ছোঁয়া , দুর্ভোগে দুই গ্রামের হাজার মানুষ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম

অন্যের দুর্দশার খবর লিখি, আমাদের দুর্দশা লিখবে কে?

  • সিয়াম সোহেল
  • আপডেট সময় : ০১:১৮:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
  • 135

কক্সবাজারের সাংবাদিকতা আমার কাছে শুধু পেশা নয়; এটি দীর্ঘদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন ও জীবনের অংশ। স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, মাল্টিমিডিয়া হাউজ এবং ২৪ ঘণ্টার জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করেছি। সংবাদকক্ষ পরিচালনা, সম্পাদনা, শিরোনাম নির্বাচন ও মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

তারপরও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চাকরি হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। এখনো এই পেশায় টিকে থাকার চেষ্টা করছি। পরিচয় আছে, অভিজ্ঞতা আছে, কাজের দক্ষতা আছে কিন্তু নেই স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা। এই বাস্তবতা শুধু আমার নয়; কক্সবাজারের অনেক সংবাদকর্মীর জীবনেই এর প্রতিফলন দেখা যায়।

প্রশ্ন উঠছে, সাংবাদিকতা কি ক্রমেই বেকার তৈরির কারখানা হয়ে উঠছে?

সংবাদে গুরুত্বপূর্ণ কক্সবাজার, সংবাদকর্মীর জীবনে অনিশ্চয়তা

রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমার সীমান্ত, মানবপাচার, মাদক, পর্যটন, ভূমি দখল, পরিবেশ বিপর্যয় ও স্থানীয় রাজনীতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বের অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন কক্সবাজারের সংবাদকর্মীদের মাঠে নামায়। তথ্য সংগ্রহ, বক্তব্য নেওয়া, ছবি-ভিডিও ধারণ ও সংবাদ পাঠাতে তাঁদের ব্যয় করতে হয় সময়, শ্রম ও অর্থ।

কিন্তু সেই শ্রমের বিনিময়ে অনেকের ভাগ্যে জোটে সীমিত বেতন, অনিয়মিত পারিশ্রমিক ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান। যাতায়াত, ইন্টারনেট, ফোনকল এবং সরঞ্জামের খরচও অনেক সময় বহন করতে হয় নিজের পকেট থেকে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এ প্রকাশিত How local journalism survives on debt, pressure and press cards শীর্ষক প্রতিবেদনে স্থানীয় সাংবাদিকদের এমন বাস্তবতা উঠে আসে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক সংবাদকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো জাতীয় সংবাদমাধ্যমে মাসিক বেতন ১০–১৫ হাজার টাকা; অথচ রোহিঙ্গা শিবির বা বন্দর এলাকায় একেকটি যাতায়াতেই খরচ হতে পারে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

তথ্যসূত্র: The Business Standard, “How local journalism survives on debt, pressure and press cards” (জানুয়ারি ২০২৬)।

এই বাস্তবতা শুধু কম বেতনের সংকট নয়; এটি মানসম্মত সাংবাদিকতারও সংকট। সংবাদ সংগ্রহের ন্যূনতম ব্যয় বহন করতে না পারলে একজন সাংবাদিকের পক্ষে ঘটনার গভীরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংবাদ, সংবাদমাধ্যম এবং মানুষের জানার অধিকার।

৫ আগস্টের পর চাকরিহীনতা: পেশাগত দক্ষতার মূল্য কোথায়?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্ব ও কর্মপরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। আমিও চাকরি হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা হারানো শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়; এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পেশাগত স্থিতির ওপরও বড় আঘাত।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টসের (IFJ) 23rd Annual South Asia Press Freedom Report 2024–2025 এবং ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা ট্রিবিউন-এ প্রকাশিত ৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যমের শীর্ষ পদে পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের কর্মপরিবর্তন ও চাকরির অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

তথ্যসূত্র: IFJ–SAMSN, 23rd Annual South Asia Press Freedom Report 2024–2025; Dhaka Tribune, “Changes in top media positions in Bangladesh after August 5”।

এখানে প্রশ্নটি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। প্রশ্ন হলো সাংবাদিকের চাকরি ও পেশাগত অবস্থান কি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর কর্মজীবনের নিরাপত্তাও বদলে যাবে?

মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা: দক্ষতা বাড়ছে, নাকি শ্রমের বোঝা?

কক্সবাজারে অনলাইন পোর্টাল, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল ও মাল্টিমিডিয়া সংবাদমাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে। এতে সংবাদ প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে, তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মীকেই প্রতিবেদক, ভিডিওগ্রাফার, উপস্থাপক, স্ক্রিপ্ট রাইটার, ভিডিও সম্পাদক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। অথচ পারিশ্রমিক বাড়ে না দায়িত্বের অনুপাতে।
মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা মানে একজন কর্মীর কাছ থেকে একাধিক পদের কাজ কম খরচে আদায় করা নয়। বাড়তি দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পারিশ্রমিক, কর্মঘণ্টা, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয়কে রাজনৈতিক প্রচার, ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ঠেকাতে প্রয়োজন পেশাগত নীতিমালা ও জবাবদিহি। তবে নতুন বা স্বাধীন সংবাদকর্মীদের সবাইকে এক কাতারে ফেলা নয়—মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত কাজের মান, নৈতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

সংকট ব্যক্তির নয়, পেশাগত কাঠামোরও

সাংবাদিকের আর্থিক দুরবস্থাকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সংবাদমাধ্যমের কাঠামোগত দুর্বলতা আড়ালে থেকে যায়। সংবাদকর্মীর দক্ষতা বাড়ানো, নতুন প্রযুক্তি শেখা ও বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত বেতন, সংবাদ সংগ্রহের ব্যয়, স্বচ্ছ নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতি প্রক্রিয়া এবং পেশাগত সুরক্ষা।

২০২৫ সালে প্রকাশিত UNDP–UNESCO-এর An Assessment of Bangladesh’s Media Landscape শীর্ষক মূল্যায়নেও রাজনৈতিক চাপ, দুর্বল কর্মপরিবেশ, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা ও জনআস্থার সংকটের মতো বিষয় আলোচিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র: UNDP–UNESCO, An Assessment of Bangladesh’s Media Landscape (২০২৫)।

কক্সবাজারের সাংবাদিকতার বাস্তবতা বুঝতে আরও কিছু প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক উত্তর প্রয়োজন: কতজন সাংবাদিক নিয়মিত বেতন পান? কতজনের নিয়োগপত্র রয়েছে? কতজনের বেতন বকেয়া? কতজন নিজের খরচে সংবাদ সংগ্রহ করেন? চাকরি হারিয়ে কতজন পেশা পরিবর্তন করেছেন?

সবশেষ – আমাদের দুর্দশা

আমি সিয়াম সোহেল। স্থানীয় পত্রিকা থেকে অনলাইন, মাল্টিমিডিয়া সংবাদমাধ্যম থেকে জাতীয় টেলিভিশন সাংবাদিকতার বিভিন্ন পরিসরে কাজ করেছি। সংবাদকক্ষ পরিচালনা করেছি, সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দেখেছি। তবু আজও পেশাগত অভিজ্ঞতাকে স্থায়ী কর্মসংস্থান ও সম্মানজনক আয়ে রূপ দেওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে সব সাংবাদিকের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যাবে না। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে, যে পেশার মানুষ অন্যের বঞ্চনা তুলে ধরেন, তাঁদের নিজেদের বঞ্চনা কেন আড়ালেই থেকে যাবে? সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে শুধু নতুন সংবাদমাধ্যম, আরও পেজ কিংবা পরিচয়পত্রের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, ন্যায্য পারিশ্রমিক, পেশাগত স্বাধীনতা এবং অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন।

সাংবাদিকতার মানুষগুলো যদি নিজেরাই অনিশ্চয়তা ও বেকারত্বে ডুবে থাকেন, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভিত্তি শক্ত হবে কীভাবে?

অন্যের দুর্দশার খবর আমরা প্রতিদিন লিখি। এবার আমাদের দুর্দশার খবরটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

অন্যের দুর্দশার খবর লিখি, আমাদের দুর্দশা লিখবে কে?

অন্যের দুর্দশার খবর লিখি, আমাদের দুর্দশা লিখবে কে?

আপডেট সময় : ০১:১৮:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজারের সাংবাদিকতা আমার কাছে শুধু পেশা নয়; এটি দীর্ঘদিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন ও জীবনের অংশ। স্থানীয় পত্রিকা, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, মাল্টিমিডিয়া হাউজ এবং ২৪ ঘণ্টার জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ করেছি। সংবাদকক্ষ পরিচালনা, সম্পাদনা, শিরোনাম নির্বাচন ও মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

তারপরও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চাকরি হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। এখনো এই পেশায় টিকে থাকার চেষ্টা করছি। পরিচয় আছে, অভিজ্ঞতা আছে, কাজের দক্ষতা আছে কিন্তু নেই স্থায়ী আয়ের নিশ্চয়তা। এই বাস্তবতা শুধু আমার নয়; কক্সবাজারের অনেক সংবাদকর্মীর জীবনেই এর প্রতিফলন দেখা যায়।

প্রশ্ন উঠছে, সাংবাদিকতা কি ক্রমেই বেকার তৈরির কারখানা হয়ে উঠছে?

সংবাদে গুরুত্বপূর্ণ কক্সবাজার, সংবাদকর্মীর জীবনে অনিশ্চয়তা

রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমার সীমান্ত, মানবপাচার, মাদক, পর্যটন, ভূমি দখল, পরিবেশ বিপর্যয় ও স্থানীয় রাজনীতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বের অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন কক্সবাজারের সংবাদকর্মীদের মাঠে নামায়। তথ্য সংগ্রহ, বক্তব্য নেওয়া, ছবি-ভিডিও ধারণ ও সংবাদ পাঠাতে তাঁদের ব্যয় করতে হয় সময়, শ্রম ও অর্থ।

কিন্তু সেই শ্রমের বিনিময়ে অনেকের ভাগ্যে জোটে সীমিত বেতন, অনিয়মিত পারিশ্রমিক ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থান। যাতায়াত, ইন্টারনেট, ফোনকল এবং সরঞ্জামের খরচও অনেক সময় বহন করতে হয় নিজের পকেট থেকে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এ প্রকাশিত How local journalism survives on debt, pressure and press cards শীর্ষক প্রতিবেদনে স্থানীয় সাংবাদিকদের এমন বাস্তবতা উঠে আসে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক সংবাদকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো জাতীয় সংবাদমাধ্যমে মাসিক বেতন ১০–১৫ হাজার টাকা; অথচ রোহিঙ্গা শিবির বা বন্দর এলাকায় একেকটি যাতায়াতেই খরচ হতে পারে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

তথ্যসূত্র: The Business Standard, “How local journalism survives on debt, pressure and press cards” (জানুয়ারি ২০২৬)।

এই বাস্তবতা শুধু কম বেতনের সংকট নয়; এটি মানসম্মত সাংবাদিকতারও সংকট। সংবাদ সংগ্রহের ন্যূনতম ব্যয় বহন করতে না পারলে একজন সাংবাদিকের পক্ষে ঘটনার গভীরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংবাদ, সংবাদমাধ্যম এবং মানুষের জানার অধিকার।

৫ আগস্টের পর চাকরিহীনতা: পেশাগত দক্ষতার মূল্য কোথায়?

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্ব ও কর্মপরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। আমিও চাকরি হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা হারানো শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়; এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পেশাগত স্থিতির ওপরও বড় আঘাত।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টসের (IFJ) 23rd Annual South Asia Press Freedom Report 2024–2025 এবং ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা ট্রিবিউন-এ প্রকাশিত ৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যমের শীর্ষ পদে পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের কর্মপরিবর্তন ও চাকরির অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

তথ্যসূত্র: IFJ–SAMSN, 23rd Annual South Asia Press Freedom Report 2024–2025; Dhaka Tribune, “Changes in top media positions in Bangladesh after August 5”।

এখানে প্রশ্নটি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। প্রশ্ন হলো সাংবাদিকের চাকরি ও পেশাগত অবস্থান কি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর কর্মজীবনের নিরাপত্তাও বদলে যাবে?

মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা: দক্ষতা বাড়ছে, নাকি শ্রমের বোঝা?

কক্সবাজারে অনলাইন পোর্টাল, ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল ও মাল্টিমিডিয়া সংবাদমাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে। এতে সংবাদ প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে, তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মীকেই প্রতিবেদক, ভিডিওগ্রাফার, উপস্থাপক, স্ক্রিপ্ট রাইটার, ভিডিও সম্পাদক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। অথচ পারিশ্রমিক বাড়ে না দায়িত্বের অনুপাতে।
মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা মানে একজন কর্মীর কাছ থেকে একাধিক পদের কাজ কম খরচে আদায় করা নয়। বাড়তি দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পারিশ্রমিক, কর্মঘণ্টা, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে সাংবাদিকতার পরিচয়কে রাজনৈতিক প্রচার, ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা অনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ঠেকাতে প্রয়োজন পেশাগত নীতিমালা ও জবাবদিহি। তবে নতুন বা স্বাধীন সংবাদকর্মীদের সবাইকে এক কাতারে ফেলা নয়—মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত কাজের মান, নৈতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।

সংকট ব্যক্তির নয়, পেশাগত কাঠামোরও

সাংবাদিকের আর্থিক দুরবস্থাকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সংবাদমাধ্যমের কাঠামোগত দুর্বলতা আড়ালে থেকে যায়। সংবাদকর্মীর দক্ষতা বাড়ানো, নতুন প্রযুক্তি শেখা ও বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত বেতন, সংবাদ সংগ্রহের ব্যয়, স্বচ্ছ নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতি প্রক্রিয়া এবং পেশাগত সুরক্ষা।

২০২৫ সালে প্রকাশিত UNDP–UNESCO-এর An Assessment of Bangladesh’s Media Landscape শীর্ষক মূল্যায়নেও রাজনৈতিক চাপ, দুর্বল কর্মপরিবেশ, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা ও জনআস্থার সংকটের মতো বিষয় আলোচিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র: UNDP–UNESCO, An Assessment of Bangladesh’s Media Landscape (২০২৫)।

কক্সবাজারের সাংবাদিকতার বাস্তবতা বুঝতে আরও কিছু প্রশ্নের তথ্যভিত্তিক উত্তর প্রয়োজন: কতজন সাংবাদিক নিয়মিত বেতন পান? কতজনের নিয়োগপত্র রয়েছে? কতজনের বেতন বকেয়া? কতজন নিজের খরচে সংবাদ সংগ্রহ করেন? চাকরি হারিয়ে কতজন পেশা পরিবর্তন করেছেন?

সবশেষ – আমাদের দুর্দশা

আমি সিয়াম সোহেল। স্থানীয় পত্রিকা থেকে অনলাইন, মাল্টিমিডিয়া সংবাদমাধ্যম থেকে জাতীয় টেলিভিশন সাংবাদিকতার বিভিন্ন পরিসরে কাজ করেছি। সংবাদকক্ষ পরিচালনা করেছি, সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দেখেছি। তবু আজও পেশাগত অভিজ্ঞতাকে স্থায়ী কর্মসংস্থান ও সম্মানজনক আয়ে রূপ দেওয়ার নিশ্চয়তা নেই।

আমার অভিজ্ঞতা দিয়ে সব সাংবাদিকের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যাবে না। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে, যে পেশার মানুষ অন্যের বঞ্চনা তুলে ধরেন, তাঁদের নিজেদের বঞ্চনা কেন আড়ালেই থেকে যাবে? সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে শুধু নতুন সংবাদমাধ্যম, আরও পেজ কিংবা পরিচয়পত্রের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, ন্যায্য পারিশ্রমিক, পেশাগত স্বাধীনতা এবং অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন।

সাংবাদিকতার মানুষগুলো যদি নিজেরাই অনিশ্চয়তা ও বেকারত্বে ডুবে থাকেন, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভিত্তি শক্ত হবে কীভাবে?

অন্যের দুর্দশার খবর আমরা প্রতিদিন লিখি। এবার আমাদের দুর্দশার খবরটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক।