মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)।
সোমবার (১৭ আগস্ট) এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের বিবৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সরকারের বিবৃতি ইতিহাস বিকৃত করার, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত অপরাধ আড়াল করার এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা এড়ানোর একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
ইউসিআর বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের প্রকৃত কারণ ও বাস্তবতা নিয়ে মিয়ানমার সরকার বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। সংগঠনটি তাদের বিবৃতিতে মিয়ানমারের দাবিগুলোর পয়েন্টভিত্তিক জবাব দিয়েছে।
ইউসিআর বলেছে, রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ নয়, তারা রাখাইন রাজ্যের ঐতিহাসিক অধিবাসী,একটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে তাদের ওপর বৈষম্য ও নিপীড়নের অন্যতম কারণ বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
২০১৬ ও ২০১৭ সালের সামরিক অভিযান প্রসঙ্গে ইউসিআর বলেছে, এগুলো কোনো সাধারণ ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ ছিল না; বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পরিকল্পিত নিপীড়ন ও জাতিগত নিধনের অংশ।
সংগঠনটির দাবি, ওই অভিযানে গণহত্যা, ধর্ষণ, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং নির্বিচারে হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যা জাতিসংঘের বিভিন্ন তদন্তেও উঠে এসেছে।
মিয়ানমার সরকারের দেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে ইউসিআর।
সংগঠনটি বলেছে, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এর আগে ১৯৯১-৯২ সালের নিপীড়নের সময়ও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। বর্তমানে জাতিসংঘের হিসাবে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়াকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে ইউসিআর বলেছে, রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতির জন্য ‘বাঙালি’ হিসেবে নিবন্ধনের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের জাতিগত পরিচয় অস্বীকারের শামিল। সংগঠনটি দাবি করেছে, যাচাই প্রক্রিয়া অবশ্যই জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নেতৃত্বে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে হবে।
অতীত প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে ইউসিআর বলেছে, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সংগঠনটির দাবি, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতির ওপর রোহিঙ্গাদের আস্থা নেই।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেছে ইউসিআর বলেছে, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। মিয়ানমারের এমন অবস্থানের সমালোচনা করে ইউসিআর বলেছে, এটি সময়ক্ষেপণের কৌশল। সংগঠনটি দাবি করেছে, প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অধীনে।
বিবৃতিতে ইউসিআর মিয়ানমার সরকারকে অপপ্রচার বন্ধ করে বাস্তবতা স্বীকার করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) প্রতি মিয়ানমারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইউসিআর বলেছে, আমাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলা যাবে না। আমরা রোহিঙ্গা এবং নিরাপত্তা, পরিচয় ও অধিকার নিশ্চিত হলে আমরা আমাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে প্রস্তুত।
শামীমুল ইসলাম ফয়সাল 





















