ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এর মূল শিক্ষা ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও মানবিকতা। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই কোরবানির এই বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোরবানির প্রকৃত চেতনার পাশাপাশি সমাজে এক ধরনের প্রতিযোগিতা মূলক প্রবণতাও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন জাগে, আজকের কোরবানি কি সত্যিই ইবাদতের অংশ, নাকি তা ধীরে ধীরে সামাজিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে?
বর্তমানে কোরবানির পশুর মূল্য, আকার, ওজন কিংবা বিরল জাত নিয়ে মানুষের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিগত সামর্থ্য বা ধর্মীয় অনুপ্রেরণার চেয়ে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় ও ব্যয়বহুল পশুর ছবি প্রচার, দাম নিয়ে আলোচনা কিংবা “কার গরু বড়” এই মানসিকতা কোরবানির আধ্যাত্মিক দিককে অনেকাংশে আড়াল করে দিচ্ছে।
অথচ ইসলামে কোরবানির মূল বিষয় পশুর আকার বা মূল্য নয়; বরং মানুষের নিয়ত ও তাকওয়া। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া। অর্থাৎ, কোরবানির প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় আত্মত্যাগের মানসিকতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সামর্থ্যবান ব্যক্তি ভালো ও মূল্যবান পশু কোরবানি করতে পারেন। ইসলাম কখনোই উৎকৃষ্ট বিষয়কে নিরুৎসাহিত করে না। তবে যখন কোরবানি আত্মপ্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন এর মৌলিক উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমাজে এমন অনেক পরিবার রয়েছে, যারা নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খায়। সেখানে অপ্রয়োজনীয় বাহুল্য ও অপচয় কেবল বৈষম্যের অনুভূতিই বাড়ায়।
কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে ভাগাভাগি ও সহমর্মিতায়। গরিব, অসহায় ও প্রতিবেশীর মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই এই ইবাদতের সামাজিক তাৎপর্য প্রকাশ পায়। তাই কোরবানিকে যদি কেবল পশুর দামের হিসাব বা সামাজিক মর্যাদার প্রতীকে সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে এর আত্মিক শিক্ষা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
আজ সময় এসেছে কোরবানির প্রকৃত দর্শনে ফিরে যাওয়ার। কোরবানি হোক আত্মশুদ্ধির অনুশীলন, অহংকার ত্যাগের শিক্ষা এবং মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ। পশুর মূল্য নয়, মানুষের মন ও নিয়তই হোক কোরবানির আসল পরিচয়।
শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক 




















