বিশ্বকাপ এলে আমাদের দেশ এক অদ্ভুত আবেগে ভেসে যায়। পতাকায় পতাকায় ছেয়ে যায় আকাশ, মধ্যরাতের আড্ডায় জমে ওঠে তর্ক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আবেগ অনেক সময় সুস্থ সীমানা ছাড়িয়ে পরিণত হয় বিষাক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং সহিংসতার ছায়ায়।
ফেসবুক টাইমলাইনে আমরা প্রায়ই এমন কিছু ঘটনা দেখি যা আমাদের গভীরভাবে ভাবায়। আসুন, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজের কয়েকটি বাস্তব চিত্র নিয়ে কথা বলি—
১. শিশুমনে অন্ধ বিদ্বেষের বিষ ও অভিভাবকত্বের দায়ঃ
সম্প্রতি একটি দৃশ্য আমার মনকে ভীষণ নাড়া দিয়ে গেল। আমার বাসার সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ৭/৮ বছরের দুটি শিশু। একজনের গায়ে Argentina-র জার্সি, অন্যজনের গায়ে Brazil-এর। আগের দিন ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে, তাই আর্জেন্টিনার জার্সি পরা শিশুটি চরম কটু ভাষায় ট্রল করছে ব্রাজিল সমর্থক শিশুটিকে। আর পরাজিত দলের ছোট্ট শিশুটি মাথা নিচু করে নীরবে সেই অপমান সহ্য করছে।
বাস্তবতা ও অভিভাবকদের ভূমিকা:
৭/৮ বছরের একটি শিশু ফুটবলের কৌশল, অফসাইড রুলস কিংবা ট্যাকটিক্স—কোনো কিছুই বোঝে না। তাদের কাছে খেলাটা হওয়ার কথা ছিল কেবলই আনন্দের। কিন্তু খেলা বোঝার আগেই অভিভাবকরা নিজেদের অন্ধ আবেগ সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন। তাদের গায়ে নির্দিষ্ট কোনো দলের জার্সি চড়িয়ে দিয়ে ‘আমাদের দল সেরা’ আর ‘অন্য দল শত্রু’—এই মানসিকতা পরোক্ষভাবে ইনজেক্ট করে দেন। মা-বাবারা যদি জার্সি কিনে দেওয়ার আগে শিশুদের খেলার নিয়ম, দলগত চেতনা এবং জয়-পরাজয়কে সমানভাবে মেনে নেওয়ার মহানুভবতা (Sportsmanship) শেখাতেন, তবে শিশুরা একে অপরকে অপমান করতে শিখত না।
এই বয়সে এমন বুলিং ও মানসিক পীড়নের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি:
#হীনমন্যতা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট: প্রকাশ্যে সমবয়সীদের সামনে বারবার অপদস্থ ও ট্রলড হলে শিশু নিজেকে গুটিয়ে নেয়, যা তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে।
#সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয়: শৈশবেই খেলাকে কেন্দ্র করে বন্ধুদের শত্রু ভাবা শুরু করলে স্বাভাবিক বন্ধু তৈরির ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
#আগ্রাসী ও প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব: শৈশবে যে শিশু অপমান নীরব মুখে সহ্য করে, বড় হয়ে সে নিজের ক্ষোভ মেটাতে অন্য দুর্বল কারও ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ করতে পারে।
#সুস্থ বিনোদনের আনন্দ থেকে বিচ্যুতি: বিদ্বেষ শেখার কারণে শিশুটি খেলার কৌশল উপভোগ করার বদলে বিজয়ী হলে অহংকার এবং হেরে গেলে হিংসা প্রকাশের রোগে আক্রান্ত হয়।
২. সারাজীবন একই দল সাপোর্ট করার চুক্তিপত্র কোথায় সই হয়েছে?
আমাদের দেশে আরেকটা বড় অন্ধবিশ্বাস কাজ করে—ছোটবেলায় কোনো এক দলের জার্সি গায়ে উঠে গেছে মানে সারাজীবন অন্ধের মতো ওই দলকেই সাপোর্ট করে যেতে হবে! অথচ একজন সচেতন ফুটবলপ্রেমী তো কোনো দল বেছে নেবে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে।
খেলার আগে প্রতিটি দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, স্কোয়াড ডেপথ, খেলোয়াড়দের ইনজুরি আপডেট, কোচিং ট্যাকটিক্স এবং শক্তিমত্তা বিশ্লেষণ করে যেকোনো ভালো দলকে সমর্থন জানানো বা পছন্দের শীর্ষে রাখাটাই যৌক্তিক ও প্রফেশনাল দৃষ্টিভঙ্গি। যে দল ভালো খেলবে বা কৌশলগতভাবে সুন্দর ফুটবল উপহার দেবে, তাকে সমর্থন জানাতে আপত্তি কোথায়? খেলাকে নির্দিষ্ট কোনো ব্র্যান্ড বা ধর্মের জায়গায় না বসিয়ে, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিচার করে পছন্দ বদলানোর মুক্ত মানসিকতা থাকা উচিত।
৩. বিশ্বজুড়ে কোটি টাকার ব্যবসা, আর আমাদের দেশে শুধুই সর্বনাশা আবেগ!
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—বিশ্বজুড়ে আধুনিক ফুটবল মূলত একটি বিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রফেশনাল বিজনেস (Business)। ফিফা, বিভিন্ন স্পনসর কোম্পানি, টেলিভিশন সম্প্রচার মাধ্যম এবং খেলোয়াড়েরা প্রতি বিশ্বকাপে শত শত মিলিয়ন ডলার মুনাফা বা ইনকাম নিশ্চিত করছে। অথচ আমাদের দেশে এই খেলাকে ঘিরে তৈরি হয় অন্ধ আবেগ, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।
আমাদের দেশে অতি-আবেগের কারণে যেসব ক্ষতি হচ্ছে:
#অর্থনৈতিক অপচয়: দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও কোটি কোটি টাকা অপচয় করে শত শত গজের অতিকায় পতাকা তৈরি, প্রজেক্টর কেনা বা বিশাল মিছিল-শোডাউন করা হয়, যার কোনো ইতিবাচক অর্থনৈতিক বা সামাজিক রিটার্ন নেই।
#উৎপাদনশীলতা ও কর্মঘণ্টা নষ্ট: রাত জেগে খেলা দেখা এবং পরবর্তীতে দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় বা চায়ের দোকানে তর্কে লিপ্ত থাকার কারণে পড়ালেখা, প্রফেশনাল কর্মঘণ্টা এবং অফিসিয়াল দক্ষতা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
#সামাজিক ও পারিবারিক বিভেদ: অতি-আবেগের বশে প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব এবং এমনকি পরিবারের সদস্যরাও এক অদৃশ্য শত্রুতার দেওয়াল তুলে দাঁড়ায়, যা ঘরোয়া সহিংসতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়ায়।
৪. “ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা করি না” মানেই কি অপরাধ?
বিশ্বকাপের সময় যেকোনো আড্ডায় সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্ন—”ভাই, তুই ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা?”
যখন আমি বলি, “আমি স্পেন সাপোর্ট করি”, তখন চারপাশের মানুষের অভিব্যক্তি দেখার মতো হয়! সবাই এমন এক বিস্ময়, বিরক্তি আর করুণা নিয়ে তাকায়, যেন আমি মারাত্মক কোনো অন্যায় করে ফেলেছি!
আমাদের দেশের ক্রীড়াসংস্কৃতি এক অদ্ভুত দ্বিধাবিভক্ত (Binary) জায়গায় আটকে গেছে। ফুটবলপ্রেম মানেই যেন কেবল ‘ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা’। স্পেনের Tiki-taka পাসিং ফুটবল, তাদের একাডেমিভিত্তিক নিখুঁত অবকাঠামো বা ইউরোপিয়ান ফুটবলের নান্দনিক ট্যাকটিক্স পছন্দ করাটাও এ দেশে যেন এক অদৃশ্য অপরাধ! নিরপেক্ষভাবে সুন্দর ফুটবলকে ভালোবাসার স্বাধীনতাটুকু আমাদের অন্ধ আবেগের সমাজ সহজে মেনে নিতে পারে না।
৫. অন্ধ আবেগের ট্র্যাজেডি: ২০২৬ বিশ্বকাপে ১২-১৫ জন মানুষের জীবনহানি।
ফুটবল মানুষকে মেলবন্ধন শেখায়, কিন্তু আমাদের অতি-আবেগ একে বানিয়ে ফেলেছে এক বিষাক্ত লড়াইয়ের ক্ষেত্র।
২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালেই আমাদের দেশে অন্ধ উন্মাদনা আর উগ্রতার কারণে প্রায় ১২ থেকে ১৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন! বিভিন্ন জেলায় সমর্থক-সমর্থকে বাকবিতণ্ডা থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাত, ছাদে পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ও ছাদ থেকে পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু এবং প্রিয় দল হেরে যাওয়ায় অতিরিক্ত মানসিক উত্তেজনায় হার্ট অ্যাটাকের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—যে দলগুলোর জন্য এ দেশে ভাইয়ে-ভাইয়ে রক্তারক্তি হয়, সেই ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা হয়তো জানেও না যে হাজার মাইল দূরে তাদের পতাকার জন্য কোনো পরিবার তার একমাত্র সন্তান বা উপার্জনের আশ্রয়কে চিরতরে হারিয়ে ফেলল!
আত্মউপলব্ধিঃ
খেলাধুলার মূল সুরই হলো আনন্দ ও সৌহার্দ্য। খেলাকে ব্যবসার জায়গায় ব্যবসায়ীদের করতে দিন, আমরা কেবল বিনোদনটুকু গ্রহণ করি। অতি-আবেগ যেন কোনো শিশুর মানসিক কষ্টের কারণ না হয়, কিংবা কোনো প্রাণ কেড়ে না নেয়।
#শিশুদের দলের অন্ধ ভক্ত না বানিয়ে খেলার আসল নিয়ম ও সৌন্দর্য শেখান।
#আবেগ না দেখিয়ে স্কোয়াড, ইনজুরি ও পারফরম্যান্স বিচার করে খেলা উপভোগ করুন।
#ভিন্ন দলের সমর্থককে শ্রদ্ধা জানাতে শিখুন।
#মনে রাখবেন—একটি ফুটবল ম্যাচের চেয়ে মানুষের জীবন ও ভালোবাসার মূল্য অনেক অনেক বেশি!
রাকিবুল হাসান 


















