কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে একটি ডাবের দাম ৬০০ টাকা চাওয়ার অভিযোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনাটি ভাইরাল হওয়ার পর এবার সামনে এসেছে কক্সবাজার ভ্রমণে গিয়ে কনটেন্ট নির্মাতা ‘টুকু দ্য আগলি’ ওরফে গোলাম রব্বানীর স্কুটি নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগও। তাঁর অভিযোগ, ইনানীতে ভাড়ায় নেওয়া স্কুটির সঙ্গে অন্য একটি গাড়ির সামান্য ধাক্কা লাগার পর তাঁকে কোটবাজারে নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। পরে স্কুটি ভাড়া দেওয়া প্রতিষ্ঠানের মালিকও তাঁর কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা নেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শহিদুল্লাহ শহিদ টুকু দ্য আগলির সঙ্গে দেখা করেন। পরে তাঁর সঙ্গে একটি সেলফি তুলে নিজের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট দেন। সেখানে তিনি জানান, ডাবের দাম ৬০০ টাকা চাওয়ার বিষয়টি টুকুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে টুকু তাঁকে জানান, সালসা বিচের সামনে একটি ডাবের দাম সত্যিই তাঁর কাছে ৬০০ টাকা চাওয়া হয়েছিল।
ফেসবুক পোস্টে অ্যাডভোকেট শহিদুল্লাহ শহিদ লেখেন, ‘পর্যটন এলাকায় এমন অস্বাভাবিক দাম পর্যটকদের ভোগান্তিতে ফেলতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
ডাবের দাম নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি টুকু দ্য আগলির স্কুটি ভাড়া নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগও পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
টুকু দ্য আগলির অভিযোগ, ইনানীতে ভাড়ায় নেওয়া স্কুটির সঙ্গে অন্য একটি গাড়ির সামান্য ধাক্কা লাগার পর স্থানীয় কয়েকজন তাঁকে ধরে কোটবাজারে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। পরে স্কুটি ভাড়া দেওয়া প্রতিষ্ঠানের মালিকও তাঁর কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন।
এসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে টুকু বলেন, ‘কক্সবাজারের মানুষ এত খারাপ—তা জানলে কখনোই কক্সবাজার আসতাম না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর কখনো কক্সবাজারে আসব না।’
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাতে নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতেও কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন টুকু। তাঁর পেজে অনুসারীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।
ভিডিওতে তিনি অভিযোগ করেন, যে হোটেলকক্ষের ভাড়া ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা হওয়ার কথা, সেটির জন্য নেওয়া হচ্ছে আড়াই হাজার টাকা। আবার ১০০ টাকার খাবারের জন্য ৪০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, দেশীয় পর্যটকদেরই যদি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে বিদেশি পর্যটকেরা কক্সবাজারে এসে কী ধরনের অভিজ্ঞতা পাবেন?
আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার পথে বাধা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে কক্সবাজারের সম্ভাবনা অনেক। দীর্ঘ বালুকাময় সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি রয়েছে পাহাড়, দ্বীপ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও নানা ধরনের পর্যটন আকর্ষণ। তবে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেতে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যথেষ্ট নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা, আবাসন, পরিবহন, খাবারের দাম এবং সেবার মানও গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, শুধু হোটেল নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, মানসম্মত সেবা এবং আন্তর্জাতিক মানের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য পর্যটন খাতের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, পর্যটন এলাকায় বর্জ্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশদূষণ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটন মৌসুমে সৈকত থেকে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা মোজ্জামেল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত মূল্যতালিকা থাকা জরুরি। অতিরিক্ত দাম আদায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর সহজ সুযোগও থাকতে হবে।
মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত জুলাইয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পর্যটন অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, বিনিয়োগ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও আধুনিক নগরসেবার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পর্যটনসেবার মান উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কক্সবাজারের পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা, যুক্তিসংগত মূল্য এবং হয়রানিমুক্ত ভ্রমণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
একটি ডাবের দাম ৬০০ টাকা চাওয়া কিংবা স্কুটি ভাড়া নিয়ে বিরোধের মতো অভিযোগ কক্সবাজার সম্পর্কে পর্যটকদের ধারণা ও আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাই শুধু প্রচার-প্রচারণা নয়, পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক 



















