বিশেষ ক্রোড়পত্র
২৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার, ২০২৬ খ্রি.
জুলাই বিপ্লবের চেতনা: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
খালেকুজ্জামান এর লালিত স্বপ্নাকাংখা
মোহাম্মদ সহিদুজ্জামান
সাবেক সংসদ সদস্য (কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাও)
সদস্য- জাতীয় নির্বাহি কমিটি, বিএনপি
২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি আন্দোলনের নাম নয়; এটি ছিল বৈষম্য, অন্যায়, জবাবদিহিহীনতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার এক ঐতিহাসিক প্রকাশ। ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই সর্বস্তরের মানুষের গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়।
জুলাইয়ের চেতনার অন্তর্নিহিত প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্র হবে জনগণের, ক্ষমতা হবে জবাবদিহিমূলক, আইনের শাসন সবার জন্য সমান হবে এবং নাগরিকের কথা বলার, মত প্রকাশের ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত হবে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন এবং ২০২৬ সালের গণভোটে সাংবিধানিক সংস্কার-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর অনুমোদন সেই আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো গণআন্দোলনের সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন বা কোনো সনদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব হয়ে ওঠে; যখন আইনের শাসন বাস্তবে সবার জন্য সমান হয়; যখন নাগরিকের স্বাধীনতা নিরাপদ থাকে এবং রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষের মর্যাদা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।
এই জায়গাতেই আজ জুলাইয়ের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার হিসাব মেলানোর প্রয়োজন।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রম করেছে। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত যে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারার বিকাশ ঘটেছিল, পরবর্তী দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার নানা সংকট ও বিচ্যুতি তৈরি হয়। গুম, হত্যা, নির্যাতন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মতপ্রকাশের সংকোচন নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও বিতর্ক মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সেই জমে থাকা ক্ষোভ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে আবারও সামনে নিয়ে আসে।
আর এই জায়গাতেই আমাদের ফিরে তাকাতে হয় কক্সবাজারের এক উজ্জ্বল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দিকে—অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান।
খালেকুজ্জামান ছিলেন একজন সৎ, বিনয়ী, মেধাবী আইনজীবী এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি কক্সবাজার-৩ আসন থেকে দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রামুর বাইপাসে এক নির্বাচনী জনসভাস্থলে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। তাঁর মৃত্যুর দুই দশক পরও কক্সবাজার-রামুর মানুষের স্মৃতিতে তাঁর জনপ্রিয়তা ও মানবিক রাজনৈতিক দর্শনের যে উপস্থিতি রয়েছে, তা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।

খালেকুজ্জামানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। তিনি কৃষক, শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের ভাষা বুঝতেন। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যুক্তিতর্কে নিজের অবস্থান তুলে ধরার সক্ষমতাও তাঁর ছিল। সংসদে তাঁর বক্তব্য ছিল কখনো তীক্ষ্ণ, কখনো রসিক, আবার কখনো গভীর রাজনৈতিক দর্শনে সমৃদ্ধ।
তাঁর কয়েকটি বহুল আলোচিত সংসদীয় মন্তব্য—“প্রেসিডেন্টের ভাষণ বিমানবালার হাসির মতো”, “চাঁদ দেখা কমিটির মতো জাতীয় পানি দেখা কমিটি”, “এবারের বাজেট ছলনাময়ী সুন্দরী রমণীর মতো”—তাঁর রসবোধ ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গের পরিচয় বহন করে। কিন্তু এসব রসাত্মক বক্তব্যের আড়ালে ছিল রাষ্ট্র ও রাজনীতির অসংগতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস।
আর তাঁর সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক উপলব্ধিগুলোর একটি ছিল জনগণকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনার আহ্বান। তিনি বলেছিলেন—
«“আমরা রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলো সবাই সবার বিরুদ্ধে লড়াই করছি। তাতে আমরা একবার এক দল হেরেছি, অন্য দল জিতেছে। কিন্তু এরকম লড়াইয়ে বারবার কেবল জনগণ হেরেছে। আসুন, আমরা একবার রাজনৈতিক দলগুলো হার মেনে নিয়ে জনগণকে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দেই।”»
এই বক্তব্য আজকের বাংলাদেশেও আশ্চর্য রকম প্রাসঙ্গিক। কারণ গণতন্ত্রের মূল প্রশ্ন ক্ষমতায় কে আছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—ক্ষমতার মালিক জনগণ কি সত্যিই রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে আছে?

খালেকুজ্জামানের এই দর্শনের সঙ্গে জন মিল্টনের ১৬৪৪ সালের Areopagitica-র বিখ্যাত স্বাধীনতার ধারণার একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়—“Give me the liberty to know, to utter, and to argue freely according to conscience, above all liberties.” অর্থাৎ জানার, বলার এবং বিবেক অনুযায়ী স্বাধীনভাবে যুক্তি ও মত প্রকাশের অধিকারই সর্বোচ্চ স্বাধীনতার অন্যতম ভিত্তি।
খালেকুজ্জামানও তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সেই স্বাধীন চিন্তা ও মুক্ত বক্তব্যের চর্চা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে সাধারণ মানুষের অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন বারবার উঠে এসেছে।
তবে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে মানবিক দিকটি ছিল তাঁর একটি সরল উচ্চারণ:
«“আমি পেশীশক্তি বা অস্ত্রের রাজনীতি করি না, আমি ভালোবাসার রাজনীতি করি।”»
এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন খালেকুজ্জামানের রাজনীতির দর্শন নিহিত ছিল। তিনি মনে করতেন, পেশীশক্তি, অস্ত্র, ভয় বা প্রতিহিংসা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ীভাবে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধের মধ্য দিয়েই একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে।
২০০১ সালের মে মাসে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলার মুখেও তিনি মামলা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—এমন স্মৃতি তাঁর ঘনিষ্ঠজন ও অনুসারীদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ: প্রতিহিংসার বদলে ক্ষমা, ঘৃণার বদলে ভালোবাসা এবং সংঘাতের বদলে সহাবস্থান।
২০০১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রামুর বাইপাসে জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার আগে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরদিন তাঁর জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ ও সর্বস্তরের লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতি তাঁর প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসার সাক্ষ্য হয়ে আছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের স্মৃতিচারণেও তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তার কথা উঠে এসেছে।
খালেকুজ্জামান আমাদের জন্য তাই শুধু একজন সাবেক সংসদ সদস্যের নাম নন; তিনি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক—যেখানে রাজনীতির উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়, জনগণকে বিজয়ী করা; যেখানে ক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জন বড়; যেখানে অস্ত্রের চেয়ে যুক্তি শক্তিশালী এবং প্রতিহিংসার চেয়ে মানবিকতা মূল্যবান।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সময়ের সঙ্গে রাজনীতিতে সেই মানবিকতার জায়গা অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে। লোভ, লালসা, হিংসা, ঘৃণা, প্রতিহিংসা ও দুর্নীতির অভিযোগের ভিড়ে ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সম্প্রীতি ও ন্যায়বোধ যেন ক্রমেই আড়ালে চলে গেছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বপরিস্থিতিও আমাদের উদ্বিগ্ন করে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু সংকট, মাদক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট—সব মিলিয়ে মানবসভ্যতা এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে।সৌদি-হুতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান,রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত,গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত আক্রমণ,চীন-তাইওয়ান সম্পর্ক এবং মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতার মতো ঘটনাগুলো বিশ্বরাজনীতির জটিল বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। এই পরিস্থিতিতে শান্তি, ভারসাম্য, মানবিকতা ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এমন এক সময়ে খালেকুজ্জামানের রাজনৈতিক দর্শন নতুন করে আমাদের ভাবতে শেখায়।
জুলাই ২০২৪-এর চেতনার অন্যতম আকাঙ্ক্ষা যদি হয় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, তাহলে খালেকুজ্জামানের রাজনীতির সঙ্গে তার একটি মানবিক সেতুবন্ধন তৈরি করা যায়। কারণ তিনি বহু বছর আগেই বলেছিলেন—রাজনীতির লড়াইয়ে দল জিতলেও জনগণ যেন বারবার না হারে।
আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে আমাদের সামনে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন—আমরা কি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা বলব, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটাব?
জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার, বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় ঐক্য, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার পরিবর্তে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং ভয় দেখানোর রাজনীতির পরিবর্তে ভালোবাসা ও মানবিকতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ ও সংস্কারের উদ্যোগ সেই যাত্রার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথরেখা তৈরি করেছে। কিন্তু সেই পথের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহিমূলক হয়, নাগরিক স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত থাকে এবং জনগণ কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্রের মালিকানার অনুভূতি ফিরে পায়।
খালেকুজ্জামানের স্বপ্ন ছিল একটি সুন্দর, শান্তিময়, সম্প্রীতিপূর্ণ ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ—যেখানে মানুষ মানুষকে ভয় করবে না, রাজনীতি মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করবে না এবং ক্ষমতা জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করার হাতিয়ার হবে না।
জুলাই ২০২৪-এর আকাঙ্ক্ষা আমাদের সামনে সেই স্বপ্নকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
তাই আজ, খালেকুজ্জামানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের অঙ্গীকার হোক—রাজনীতিতে সত্য কথা বলার সাহস থাকবে, ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা থাকবে, প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা হবে না এবং সর্বোপরি জনগণই হবে রাষ্ট্র ও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
খালেকুজ্জামান বলেছিলেন, তিনি পেশীশক্তি বা অস্ত্রের রাজনীতি করেন না—তিনি ভালোবাসার রাজনীতি করেন।
হয়তো আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেই ভালোবাসার রাজনীতিই।
জুলাইয়ের চেতনা যদি হয় জনগণের বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা, তবে খালেকুজ্জামানের স্বপ্ন ছিল সেই বিজয়কে মানবিকতা, ন্যায়, সম্প্রীতি ও ভালোবাসায় পূর্ণ করা।
এই দুই আকাঙ্ক্ষার মিলনেই গড়ে উঠতে পারে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ—একটি সুন্দর, শান্তিময়, গণতান্ত্রিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ।
হে রাব্বুল আলামিন, খালেকুজ্জামানের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। তাঁর মানবিক রাজনীতি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার আদর্শ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলোকিত করুক।
আমিন।
ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সহিদুজ্জামান : সাবেক সংসদ সদস্য, কক্সবাজার-০৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) ও এডভোকেট মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানের আপন ছোট ভাই।
খালেকুজ্জামানের জন্য
মুহম্মদ নূরুল হুদা
জন্মেছিলে তুমি ঐ দরিয়ানগরে
যেখানে আকাশ মাটি দুনিয়ার নোয়া জলরাশি
তরঙ্গে সোয়ার হয়ে উদয়াস্ত বাজে ঝাড়ুবাশি
পাহাড়ে সমুদ্রে আর সমতলে
মানুষ বসত করে বৃক্ষদের ঘরে
জন্মেছিলে তুমি এই দরিয়ানগরে।
মাছেরা সাঁতার কাটে ঘোনায় পেরায়,
চিংড়ির পোনারা এসে জড়ো হয়, শুঁড় তোলে গোপন ডেরায়
কোরাল বাটার সাথে টেংড়ার অঘোর মিতালি
কেবল এখানে ঘোরে রূপচাঁদা
দরিয়ার বুকে বান্ধা
আথালিপাথালি
সূর্যাস্তর আলো পেয়ে বালুচরে কাঁকড়ার ঝাঁক নড়ে চড়ে-
জন্মেছিলে তুমি এই দরিয়ানগরে।
জগতের জলস্থল পার হয়ে এসেছিল পূর্ব পুরুষেরা
হাতে তসবীহ, তিনজাহানের আয়না বুকে সুফী সাধকেরা
সেই রাহে হেঁটেছেন কুপি হাতে পিতামহ পিতামহেরা
দুনিয়াদারির চিন্তা করেননি খুব চুলচেরা
আন্ধারে জিকির করে আজো কতো রূহের বাজার
আধ্যাত্মবাদের সেই পথপাশে পিতার পাদুকা পরে তুমি হলে পার
মাতামুহুরীর ব্রীজ, বাঁকখালী, নাফ নদী, আনদেষা কক্সবাজার
জীবনকে ভালোবেসে ক্ষিপ্র পায়ে ঢুকে গেলে মানুষের ঘরে..
জন্মেছিলে তুমি এই দরিয়ানগরে।
মগজে আইনী শিখা, পেশা রাজনীতি বুকে ভালোবাসা
এমন মানুষ, হায় এ সমাজে খুব বেশি করি না তা আশা
এখন ক্ষমতা মানে অস্ত্রহাতে পারঙ্গম দখলনায়ক
এখন নেতৃত্ব মানে কনুইয়ের গুঁতোগুঁতি, বুটের ঠমক-
সপক্ষ বিপক্ষ বলো সব পক্ষ আউড়ায় অভিন্ন সবক-
তুমি কিন্তু চিনেছিলে কড়াগণ্ডা, গরীবের হক।
মানুষ মরিয়া হয়ে তাই বুঝি এসেছিল তোমার দুয়ারে,
ডাকলো আকুল বুকে; তাহলে ফেরাবে কারে, বলো তুমি কারে?
একাকী মানুষ তুমি চেয়েছো জ্বালাতে বাতি সকলের ঘরে
তোমার প্রাণের বাতি চিরোজ্জ্বল অনন্তের ঘরে-
জন্মেছিলে তুমি এই দরিয়ানগরে।
তোমাকে রাখবে ঘরে মাটি জল মানুষের মন
ভালোবাসা শ্রেষ্ঠ মুদ্রা, কিনে নেয় জগতের ধন।
মুহম্মদ নূরুল হুদা : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি
এডভোকেট খালেকুজ্জামানের বর্ণাঢ্য জীবন
১। পরিচিতি
জন্ম : ১৬ জানুয়ারি ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দ।
পিতার নাম ঃ মরহুম ফরিদ আহমদ। জাতীয় সংসদ সদস্য ও ১৯৫৭ সালে গঠিত আই আই চুন্দ্রীগড় মন্ত্রীসভার কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী
ঠিকানা ঃ (অস্থায়ী) বাড়ি – নং এস.ই-৯ (এফ), সড়ক নং-১৪২, গুলশান, ঢাকা-১২১২।
স্থায়ী : জামান ভিলা, হাসপাতাল সড়ক, কক্সবাজার ।
২। শিক্ষা জীবন
ক) উপ-স্নাতক পর্যায় : ধানমণ্ডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ ও ঢাকা সরকারি কলেজ। এসএসসি এবং এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ।
খ) স্নাতক পর্যায় : বিএ, এলএলবি ৩য় স্থান, এমবিএ (ঢা.বি) প্রথম স্থান ।
৩। স্নাতকত্তোর
ক) তথ্য পযুক্তি বিশেষজ্ঞ : ঢাকাস্থ আমেরিকার একটি বহুজাতিক কম্পিউটার কোম্পানী এনসিআর এর অধিনে পদ্ধতি বিশেষক (System Analyst) হিসাবে পেশাগত জীবন শুরু ১৯৭৯ সালে।
খ) কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষা : মিশরের কায়রো, সাইপ্রাসের নিকোশিয়া, পাকিস্তানের করাচী, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্রের ডেটন, আটলান্টা ও নিউইয়র্ক এ অবস্থিত এনসিআরের স্কুল থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন ।
৪। পেশাগত কৃতি
আমেরিকার উইচিটা ও ক্যানসাসে অবস্থিত এনসিআরের সফটওয়্যার উন্নয়ন কেন্দ্রে পেশাগত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন এবং লব্দ পযুক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে এনসিআরের প্রোপ্রাইটরি অপারেটিং সিসটেম এন্ড কমপাইলারকে আন্তর্জাতিক ভাবে ব্যবহার উপযোগী করতে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন ।
খ) বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও হোটেলে বৃহৎ ও ক্ষুদ্রায়তর কম্পিউটার স্থাপনে তিনি
সহায়তা করেন ।
গ) বাংলাদেশে অবস্থিত কুয়েত এয়ারওয়েজের কার্যালয়ে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পরস্পরের উপর ক্রিয়াশীল মেনুচালিত সফটওয়্যার প্যাকেজ স্থাপন করে তিনি সকলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন ।
ঘ) ইন্টারেকটিভ ব্যাংকিং সফটওয়্যার বিষয়েও তাঁর দক্ষতা রয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থিত ২টি বিদেশী ব্যাংকে ইন্টারেকটিভ সফটওয়্যার স্থাপনেও তিনি সহযোগিতা করেন ।
ঙ) একজন তন্ত্র বিশ্লেয়ক হিসেবেও তিনি পদ্ধতির উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন এবং ফাইজার, স্কুইব, পিডিবি, সাধারণ বীমা করপোরেশন, জীবন বীমা করপোরেশন, বিআইডাব্লিউটি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, কৃষি ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি বিশেষজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
চ) এনসিআরের একজন ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে তিনি অসংখ্য কম্পিউটার ট্রেনিং কোর্স পরিচালনা করেন এবং কম্পিউটার সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়েও শিক্ষা দান করেন।
ছ) জাতীয় কম্পিউটার কাউন্সিল এবং সাধারণ বীমা করপোরেশনের তিনি কম্পিউটার পরামর্শক। এছাড়াও পাকিস্থানের করাচীতে এনসিআর-এর জন্য কম্পিউটারাইজড হিসাব চালু করেন ।
জ) বাংলাদেশ টেলিভিশনে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সম্পর্কিত বুনিয়াদী শিক্ষার উপর তাঁর পরিবেশিত অনুষ্ঠান গুলো অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে।
ঝ) কম্পিউটার সফটওয়্যার ও কম্পিউটার প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা সম্পর্কে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। শুধু তা নয়, বাংলাদেশ থেকে কম্পিউটার সফটওয়্যার রপ্তানিতে তাঁর অবদান প্রশংসার দাবি রাখে ।
৫। আইন পেশায় কৃতিত্ব
একজন আইনজীবী হিসেবে দেশের বিভিন্ন আদালতে মামলা পরিচালনা করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন । ক্রিমিনাল ল, কোম্পানী ল, ল অব কন্ট্রাক্ট এন্ড এজেন্সী, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড লেবার ল, ল অব ব্যাংকিং এন্ড ইন্সুরেন্স, ল্যান্ড ল, ল অফ আরবিট্রিশন, ল অফ রীট, ল অফ এ্যাডমিরালটি, ল অফ প্যাটান্ট, ডিজাইন এন্ড কপি রাইট আইন সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রযেেছ।
৬ । আইন সভার অভিজ্ঞতা
সপ্তম জাতীয় সংসদের তিনি সদস্য ছিলেন। সংসদ সদস্য হিসাবেও তাঁর যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। সংসদে তাঁর গঠনমূলক ভূমিকা সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বাজেটের উপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে বিমান বালার হাসি এবং বাজেটকে ছলনাময়ী সুন্দরী নারী হিসাবে আখ্যায়িত করেন । তাঁর সাবলীল ও বুদ্ধিদীপ্ত ভাষণে ক্ষমতাসীন বিরোধী দলের সকল সদস্য প্রীত হন এবং ক্ষমতাসীন দলের সদস্যদের অনুরোধে মাননীয় স্পীকার তাঁর বক্তৃতার সময় আরো বর্ধিত করেন। ইহা সংসদীয় ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
তিনি আইন, বিচার ও সংসদীয় সম্পর্কিত স্ট্যান্ডিং কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। সংসদে উত্থাপিত বিলগুলো যাচাই বাছাইয়েও তাঁর যথেষ্ট অবদান রয়েছে এবং জননিরাপত্তা আইন এর প্রতি তিনি নোট অব ডিসেন্ট জানান। এছাড়াও সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।
৭। শিক্ষকতা
International University of Business, Agriculture and Technology র ফ্যাকাল্টির অন্যতম সদস্য। উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ও এমবিএ প্রোগ্রামের একজন প্রভাষক । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন।
৮। প্রকাশনা
তাঁর লিখিত গ্রন্থ এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে তাঁর অনেক প্রবন্ধ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর প্রবন্ধ Computerisation in Bangladesh a two edged sword মর্নিং সানের ৪-৫ অক্টোবর/৯২ তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে Merketing of Computers Software in Bangladesh প্রবন্ধটি Kings HNK ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
৯। সেমিনার, আলোচক/বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি হিসাবে অংশগ্রহণ
ক) বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টের উদ্যোগে ঢাকাস্থ সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত OMBUDS- MAN শীর্ষক সেমিনারে তিনি বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন।
খ) সেন্টার ফর ষ্ট্যাটেজিক এন্ড পীস্ ষ্ট্যাটিজী কর্তৃক সিরাডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আশা এবং বাস্তবতা শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে তিনি আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন ।
গ) এমবিএ সমিতি কর্তৃক হোটেল শেরাটনে আয়োজিত শিল্পনীতি শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে একজন বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন।
ঘ) খান ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্লানিং একাডেমী মিলনায়তনে আয়োজিত Road to Democratic Local Govenment Structure in Bangladesh গোল টেবিল বৈঠকে তিনি একজন আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন।
ঙ) এমবিএ সমিতি কর্তৃক প্লানিং একাডেমী মিলনায়তনে আয়োজিত Good Governess শীর্ষক সেমিনারে তিনি আলোচক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন ।
চ) RMMFU নামে একটি সংস্থা কর্তৃক ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত National Law for Refugees শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি একজন বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন ।
ছ) ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে তিনি একজন অতিথি আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন ।
জ) ইউএনডিপি’র সহায়তায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কমিটি অব পার্লামেন্টারী স্টাডিজ এর প্রথম সম্মেলনে Community in Bangladesh, বিষয়ের উপর তাঁর লিখিত প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন ।
ঝ) সেন্টার ফর ষ্ট্যাটেজিক এন্ড পীস স্টাডি কর্তৃক আয়োজিত Neutrality and Security in fleetion টেবিল বৈঠকে তিনি অংশগ্রহণ করেন ।
ঞ) Best কর্তৃক সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত Information শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ঠ) বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃক আয়োজিত সংলাপেও তিনি অংশগ্রহণ করেন ।
১০। বিদেশ ভ্রমণ
তিনি সাইপ্রাস, মিশর, ফ্রান্স, গ্রীস, হংকং, ভারত, পাকিস্থান, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য ভ্রমণ করেন । ১১। সমাজ সেবা
তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত। এছাড়াও আইবিএ, মির্জাপুর এক্স ক্যাডেট এসোসিয়েশন, ঈদগাঁও রশিদ আহমদ কলেজ, নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়, আশরাফুল উলুম মাদ্রাসা, ফরিদা রহমান এতিমখানার সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন। সমাজের দরিদ্র অসহায় মানুষের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ আইন পেশার পাশাপাশি তিনি আদর্শগতভাবে রাজনীতিতে জড়িত এবং অত্র জেলার সফল রাজনীতিক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তিনি অমায়িক, সদালাপী এবং সৎ ও অত্যন্ত ন্যায়পরায়ন ব্যক্তি ছিলেন।
বিশেষ ক্রোড়পত্র 




















