বাংলাদেশে আয়োডিনের ঘাটতিজনিত রোগ প্রতিরোধ এবং মানুষের জন্য মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন, ২০২১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন কেবল আয়োডিনযুক্ত লবণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেনি; বরং লবণে আয়োডিনের নির্দিষ্ট মাত্রাও নির্ধারণ করে দিয়েছে।
আইনের ধারা ১০(৪)(ঘ) অনুযায়ী, উৎপাদন পর্যায়ে লবণে আয়োডিনের মাত্রা ৩০–৫০ পিপিএম এবং খুচরা পর্যায়ে ২০–৫০ পিপিএম থাকার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, একজন ভোক্তা যখন বাজার থেকে আয়োডিনযুক্ত ভোজ্য লবণ কিনবেন, তখন সেই লবণে আয়োডিনের মাত্রা কমপক্ষে ২০ পিপিএম থাকার কথা। আইনটি আরও নির্ধারিত মাত্রায় আয়োডিনযুক্ত না করে ভোজ্য লবণ বিক্রয়কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে।
আইনটি হয়েছে ২০২১ সালে। এরপর ২০২৫ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশ একাধিক সূচকভিত্তিক গুচ্ছ জরিপ। এই জাতীয় জরিপের লবণ পরীক্ষার ফলাফল আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষিত ৬১,২০৭টি পরিবারের লবণের ফলাফলে দেখা যায়;
২০.৭ শতাংশ — ০ পিপিএম
২১.৪ শতাংশ — ০-এর বেশি কিন্তু ১৫ পিপিএম-এর কম
৫৭.৩ শতাংশ — ১৫ পিপিএম বা তার বেশি
একই সঙ্গে জরিপে ৭৮.৬ শতাংশ পরিবারে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
পরিসংখ্যানগুলো দেখলে প্রথমে একটি স্বস্তির চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু একটু গভীরে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে; ১৫ পিপিএম কি ২০ পিপিএম? অবশ্যই নয়।
২০২৫ সালের জরিপে ১৫ পিপিএম বা তার বেশি লবণকে একটি পৃথক শ্রেণি হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু এই ৫৭.৩ শতাংশের মধ্যে কতটুকু লবণের আয়োডিনের মাত্রা ১৫ থেকে ১৯.৯ পিপিএম এবং কতটুকু ২০ থেকে ৫০ পিপিএম—তা এই উপাত্ত থেকে জানা যাচ্ছে না। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।
কারণ, কোনো পরিবারের লবণে যদি ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ বা ১৯ পিপিএম আয়োডিন থাকে, তাহলে সেটি জরিপের হিসাবে “১৫ পিপিএম বা তার বেশি” শ্রেণিতে পড়বে। কিন্তু ২০২১ সালের আইনের হিসাবে খুচরা পর্যায়ের ন্যূনতম ২০ পিপিএম মান পূরণ করবে না।
অর্থাৎ, “লবণে আয়োডিন পাওয়া গেছে” এবং
“লবণে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রায় আয়োডিন রয়েছে” এই দুটি একই বিষয় নয়।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। জরিপে ৭৮.৬ শতাংশ পরিবারকে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাকে সরাসরি ২০২১ সালের আইনের ২০–৫০ পিপিএম মান পূরণের হার হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ জরিপের আয়োডিনযুক্ত লবণের সংজ্ঞা এবং আইনে নির্ধারিত মানদণ্ড একই নয়। জরিপের সূচকটি মূলত লবণে কোনো আয়োডাইড বা আয়োডেট পাওয়া গেছে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো; ২০২১ সালে যখন আইন করে খুচরা পর্যায়ে ২০–৫০ পিপিএম আয়োডিনের মান নির্ধারণ করা হয়েছে, তখন ২০২৫ সালের জাতীয় পর্যায়ের লবণ পরীক্ষায় কেন সেই একই আইনগত মানদণ্ড অনুযায়ী ফলাফল প্রকাশ করা হলো না?
এই প্রশ্নটি কোনো প্রতিষ্ঠান বা জরিপকে দোষারোপ করার জন্য নয়। বরং আইন, পরিমাপ এবং নীতিনির্ধারণের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার জন্য।
একটি জাতীয় আইন যদি একটি নির্দিষ্ট মান নির্ধারণ করে, তাহলে সেই আইনের বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে তা জানতে জাতীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণেও একই মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।
আমাদের জানা দরকার;
১। কত শতাংশ পরিবারের লবণে আয়োডিন ২০ পিপিএমের নিচে?
২। কত শতাংশ পরিবারের লবণে ২০–৫০ পিপিএম আয়োডিন রয়েছে?
৩। আর কত শতাংশ লবণে নির্ধারিত সর্বোচ্চ মাত্রা ৫০ পিপিএমের বেশি?
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর ছাড়া আমরা প্রকৃত অর্থে বলতে পারব না—বাংলাদেশের বাজারে আইন অনুযায়ী মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণ কতটা পৌঁছেছে। এখন কী করা প্রয়োজন?
প্রথমত, খুচরা পর্যায়ে আয়োডিনযুক্ত লবণের মান যাচাইয়ে ২০–৫০ পিপিএমকে আইনগত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শুধু দ্রুত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণগত পরীক্ষাগার পরীক্ষা বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, বাজার থেকে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে লবণের আয়োডিনের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে।
চতুর্থত, জাতীয় পর্যায়ের প্রতিবেদনে “আয়োডিনযুক্ত লবণ” এবং “আইন অনুযায়ী ২০–৫০ পিপিএম আয়োডিনযুক্ত লবণ”—এই দুটি বিষয়কে পৃথকভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে কার্যকর পরিদর্শন, নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ আয়োডিনযুক্ত লবণ শুধু একটি খাদ্যপণ্যের মানের বিষয় নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিশুর শারীরিক ও মেধাগত বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আইন প্রণয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু আইনে নির্ধারিত মান বাস্তবে নিশ্চিত করাই হলো প্রকৃত সাফল্য।
২০২১ সালে আমরা আইন করেছি। ২০২৫ সালে আমরা জাতীয় পর্যায়ে তথ্য পেয়েছি। এখন ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের আরও সুনির্দিষ্টভাবে জানতে হবে; আইনে যখন ২০–৫০ পিপিএম নির্ধারিত, তখন আমাদের জাতীয় পর্যায়ের পরিমাপ কি সত্যিই ২০–৫০ পিপিএম মানদণ্ডে হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু লবণ শিল্পের জন্য নয়; বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“লবণে আয়োডিন আছে” এই প্রশ্ন থেকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে “লবণে কি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রায় আয়োডিন আছে?” সেখানেই আয়োডিনযুক্ত লবণ কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নিহিত।
শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক 
























