ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি কলাবাগানে কাজ করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। কেউ আগাছা কাটছিলেন, কেউ গাছের গোড়া পরিষ্কার করছিলেন। তাদের মাঝেই ছিলেন আব্দুল খালেক (৩০)।
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকা খালেক প্রায়ই স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে সীমান্ত এলাকার পাহাড়ি বাগানে কাজ করতে আসতেন।
গতকাল ৯ জুন (মঙ্গলবার) সকালে কাজ করার সময় হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন খালেক। বিস্ফোরণে তার দুই পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
সহকর্মীরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়েন। আশপাশেও আরও মাইন থাকতে পারে—এমন আতঙ্কে কেউ কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিলেন না। পরে কয়েকজন ঝুঁকি নিয়ে তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনেন। কাপড় ছিঁড়ে রক্তপাত বন্ধের চেষ্টা করা হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
ঘটনাস্থল ছিল নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী সীমান্তের ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী এলাকা। স্থানীয়দের ধারণা, সেখানে আগে থেকেই পুঁতে রাখা ছিল অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন।
১৬ দিনে ৫ জনের মৃত্যু, দেড়বছরে নিহত ১০
আব্দুল খালেকের মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই বাইশফাঁড়ি সীমান্তে একই ধরনের বিস্ফোরণে মারা যায় এক কিশোর। এর আগে ২৪ মে তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি এলাকায় একসঙ্গে প্রাণ হারান তিন বাংলাদেশি পাহাড়ি শ্রমিক।
সব মিলিয়ে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত চারজন।
বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসন ও সীমান্তবাসীর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন ও অবিস্ফোরিত গোলার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন এবং আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪০ এর অধিক। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি কৃষক, পাহাড়ি শ্রমিক, রোহিঙ্গা শরণার্থী, কাঠুরে এবং বিজিবি সদস্যও।
একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরও দুইজনের মৃত্যু
গত ২৪ মে দুপুরে ঘুমধুম ইউনিয়নের ভালুকিয়াপাড়া এলাকার কয়েকজন পাহাড়ি শ্রমিক সীমান্তঘেঁষা কলাবাগানে কাজ করতে যান। এলাকাটি ছিল তুমব্রু সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল।
প্রথম বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন অক্যমং তংচঙ্গ্যা (৪০)। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তার দিকে ছুটে যান চিক্যং তংচঙ্গ্যা (৩৪) ও শৈফুচিং তংচঙ্গ্যা (৩২)। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই আবারও বিস্ফোরণ। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে নিভে যায় তিনটি প্রাণ।
তিনজনই ছিলেন দরিদ্র পাহাড়ি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। প্রতিদিন পাহাড়ে কাজ না করলে তাদের সংসার চলত না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য অংসাই মারমা বলেন,
‘এটা ছিল খুবই ভয়ংকর দৃশ্য। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজন মারা গেল। তিনটি পরিবার একসঙ্গে নিঃস্ব হয়ে গেছে।’
অক্যমং তংচঙ্গ্যার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের বেড়ার ছোট ঘরের এক কোণে এখনো ঝুলছে তার ব্যবহৃত কাপড়। কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্ত্রী।
তিনি বলেন,’সকালেও বলছিল বিকেলে ফিরে মাছ নিয়ে আসবে। আমি জানতাম না এটাই শেষ কথা।’
দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আহতদের কাটছে মানবেতর জীবন
প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে পা হারান ঘুমধুম ইউনিয়নের অং না থিং (২৮), বেচে গেলেও তিনি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন এক নির্মম স্মৃতি।
দীর্ঘ সময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি, চিকিৎসকেরা অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তার পা রক্ষা করতে পারেননি। পরে হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়।
বর্তমানে ঘুমধুম এলাকায় রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি পান-সিগারেটের দোকান চালিয়ে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ করছেন অং না থিং।
তিনি বলেন,’অনেকেই সাহায্যের কথা বলেছিল। কেউ টাকা দেবে, কেউ পাশে থাকবে বলেছিল। কিন্তু আমার হারানো পা কি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে?’
সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক, মাইন অপসারণের দাবী
নিহত তিন শ্রমিকের পরিবারসহ মাইন বিস্ফোরণে হতাহতদের খোঁজখবর নিতে সম্প্রতি ঘুমধুম সীমান্ত পরিদর্শন করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিন।
তিনি বলেন,’মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা এখন এক নীরব মানবিক সংকটের মধ্যে দিনযাপন করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, মাইন অপসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”
আগামী ১৩ জুন নাইক্ষ্যংছড়ির পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার জেলায় দুই দিনের সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার ও মাইন অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে তার সুদৃষ্টি কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঘুমধুমের স্থানীয় সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় মাইন অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে যারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মাইন পুঁতে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করা উচিত। নিরাপদ ভূখণ্ড ও নিরাপদ জীবন আমাদের ন্যায্য অধিকার।’
নাইক্ষ্যংছড়ির স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন,’সীমান্ত এলাকার মানুষ সবসময় আতঙ্কে থাকেন। মাটির নিচে যেন মৃত্যু লুকিয়ে আছে। বারবার প্রাণহানির ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।’
মাইনে প্রাণ গেছে বিজিবি সদস্যেরও
মাইন বিস্ফোরণে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, প্রাণ হারিয়েছেন বিজিবির এক সদস্য। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর তুমব্রু সীমান্তের ৪১ নম্বর পিলারসংলগ্ন এলাকায় টহলের সময় মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের নায়েক মোহাম্মদ আক্তার হোসেন।
বিস্ফোরণে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত লাগে। প্রথমে তাকে কক্সবাজার, পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ ১৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩১ অক্টোবর রাতে তার মৃত্যু হয়।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে লাল পতাকা টানিয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে।
৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন,’ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদারের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে নানা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে হতাহতদের সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রগুলোর একটি। কারণ এসব মাইন সৈন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষতি করে সাধারণ মানুষের।
১৯৯৭ সালের অটোয়া চুক্তি অনুযায়ী অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন ব্যবহার, মজুত ও উৎপাদন নিষিদ্ধ। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
জাতিসংঘ বলছে, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে হাজারো মানুষ মাইন বিস্ফোরণের শিকার হন। হতাহতদের বড় অংশই শিশু ও বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও এসব মাইন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে। বিশেষ করে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষের কারণে সীমান্তের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় মাইন পুঁতে রাখা হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: 






















