ঢাকা ০৪:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মহেশখালীতে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: পরিবারের দাবি আত্মহত্যা বাঁকখালী নদীর পানি পৌঁছাচ্ছে ঘরে ঘরে সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে নৃশংসতা: চকরিয়ায় ছয় ভাই হত্যার রহস্য উদঘাটন আমাদের অর্থনীতিকে আরও বিনিয়োগবান্ধব করে তুলতে হবে : বাণিজ্যমন্ত্রী লাবনী পয়েন্টে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার বাবরি মসজিদ বানাতে যাওয়া সেই হুমায়ুন কবির জিতলেন দুই আসনে সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা আর বহাল নেই: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গুলিতে এআরও নেতা হালিম নিহত উখিয়ায় টমটম থেকে ৪০ হাজার ইয়াবা ছিনতাই, গা-ঢাকা দুই কারবারির রামুতে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অস্ত্র-গুলিসহ আটক ৭ কক্সবাজার সদর থানার বিশেষ অভিযানে সাজাপ্রাপ্তসহ ১২ পলাতক আসামি গ্রেফতার টিটিপি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে রোহিঙ্গা তরুণ গ্রেপ্তার: পুলিশ গাছখেকোদের বাঁচাতে মরিয়া বিট কর্মকর্তা মান্নান ভোলায় খুন করে চকরিয়ায় আত্মগোপন, আসামী বাঘা গ্রেপ্তার হামের টিকা কেন দেওয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে

সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে নৃশংসতা: চকরিয়ায় ছয় ভাই হত্যার রহস্য উদঘাটন

কক্সবাজারের চকরিয়ার ব্যস্ত মহাসড়ক। ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে, অন্ধকার পুরোপুরি কাটার আগেই এক পরিবারের ওপর নেমে আসে মর্মান্তিক বিপর্যয়। হাসিনাপাড়ার সুরেশ চন্দ্র সুশীলের ছয় ছেলে একে একে সড়কে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাটি প্রথমে একটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হয়—একটি বেপরোয়া পিকআপ, নিয়ন্ত্রণ হারানো, আর মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া জীবন।

থানা পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত, এমনকি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ভাষাও ছিল একই—“সড়ক দুর্ঘটনা”। একাধিক প্রাণহানির ঘটনাও ফাইলবন্দী হয় ‘রোড ট্রাফিক ইনজুরি’ হিসেবে।

কিন্তু সময়ের সাথে সেই ধারণা পাল্টে যায়। প্রায় এক বছরের মাথায় নতুন তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাদের অনুসন্ধানে এই ঘটনাকে দুর্ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তাদের একটি গ্রন্থেও ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।

ঘটনার দিন, ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে নিহতদের পরিবার পিতার মৃত্যুর দশম দিনের পূজা শেষে রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। ঠিক তখনই একটি সবজি বোঝাই পিকআপ দ্রুতগতিতে এসে প্রথম ধাক্কায় চারজনকে চাপা দেয় এবং একটি খুঁটিতে আঘাত করে থেমে যায়।

এখানেই যদি শেষ হতো, তাহলে হয়তো এটি দুর্ঘটনাই থাকত। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, চালক গাড়ি থামানোর পর আবার সেটি চালু করে পিছনে নিয়ে আহতদের ওপর পুনরায় তুলে দেয়। এরপর সামনে এগিয়ে আরও দুজনকে চাপা দেয় এবং একজনকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়, পরে হাসপাতালে আরও দুই ভাই প্রাণ হারান। নিহতরা হলেন অনুপম (৪৬), নিরুপম (৪০), দীপক (৩৫), চম্পক (৩০), স্মরণ (২৯) এবং ১৪ দিন পর মারা যাওয়া রক্তিম (৩২)। আহত প্লাবন ও হীরা চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে যান।

প্রথমদিকে অজ্ঞাতনামা চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। অধিকাংশ মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়; একটি ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে দুর্ঘটনাজনিত আঘাতজনিত শক ও রক্তক্ষরণের কথা উল্লেখ ছিল।

তবে ঘটনাটি আলোচনায় এলে তদন্তভার হস্তান্তর করা হয় পিবিআইয়ের কাছে। নতুন করে শুরু হওয়া তদন্তে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চালক স্বীকারোক্তি দেন। পরে পিকআপের মালিককেও গ্রেফতার করা হয়।

পিবিআইয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পিকআপটি ছিল ফিটনেসবিহীন, চালকের লাইসেন্স ও রুট পারমিটও ছিল না। প্রথম ধাক্কা দুর্ঘটনা হতে পারে, কিন্তু এরপর চালকের আচরণ—আহতদের উদ্ধার না করে বারবার গাড়ি চালিয়ে তাদের ওপর তুলে দেওয়া—এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা দেয়।

এই ধারাবাহিক আচরণগত প্রমাণই তদন্তকে দুর্ঘটনা থেকে সরিয়ে এনে হত্যাকাণ্ডের দিকে নির্দেশ করে।

সব তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে পিবিআই চালকের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। মালিকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা করা হয়।

শেষ পর্যন্ত আদালত চালককে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লক্ষ টাকা জরিমানার আদেশ দেন। অন্য দুই আসামির বিচার এখনও চলমান।

পিবিআইয়ের মতে, এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত—প্রাথমিকভাবে সাধারণ দুর্ঘটনা মনে হলেও, সূক্ষ্ম তদন্ত, ঘটনাস্থলের বিশ্লেষণ এবং অভিযুক্তের আচরণ মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটন সম্ভব।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

মহেশখালীতে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার: পরিবারের দাবি আত্মহত্যা

সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে নৃশংসতা: চকরিয়ায় ছয় ভাই হত্যার রহস্য উদঘাটন

আপডেট সময় : ০১:২৩:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

কক্সবাজারের চকরিয়ার ব্যস্ত মহাসড়ক। ২০২২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে, অন্ধকার পুরোপুরি কাটার আগেই এক পরিবারের ওপর নেমে আসে মর্মান্তিক বিপর্যয়। হাসিনাপাড়ার সুরেশ চন্দ্র সুশীলের ছয় ছেলে একে একে সড়কে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাটি প্রথমে একটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হয়—একটি বেপরোয়া পিকআপ, নিয়ন্ত্রণ হারানো, আর মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া জীবন।

থানা পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত, এমনকি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের ভাষাও ছিল একই—“সড়ক দুর্ঘটনা”। একাধিক প্রাণহানির ঘটনাও ফাইলবন্দী হয় ‘রোড ট্রাফিক ইনজুরি’ হিসেবে।

কিন্তু সময়ের সাথে সেই ধারণা পাল্টে যায়। প্রায় এক বছরের মাথায় নতুন তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাদের অনুসন্ধানে এই ঘটনাকে দুর্ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তাদের একটি গ্রন্থেও ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়।

ঘটনার দিন, ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে নিহতদের পরিবার পিতার মৃত্যুর দশম দিনের পূজা শেষে রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। ঠিক তখনই একটি সবজি বোঝাই পিকআপ দ্রুতগতিতে এসে প্রথম ধাক্কায় চারজনকে চাপা দেয় এবং একটি খুঁটিতে আঘাত করে থেমে যায়।

এখানেই যদি শেষ হতো, তাহলে হয়তো এটি দুর্ঘটনাই থাকত। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, চালক গাড়ি থামানোর পর আবার সেটি চালু করে পিছনে নিয়ে আহতদের ওপর পুনরায় তুলে দেয়। এরপর সামনে এগিয়ে আরও দুজনকে চাপা দেয় এবং একজনকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়, পরে হাসপাতালে আরও দুই ভাই প্রাণ হারান। নিহতরা হলেন অনুপম (৪৬), নিরুপম (৪০), দীপক (৩৫), চম্পক (৩০), স্মরণ (২৯) এবং ১৪ দিন পর মারা যাওয়া রক্তিম (৩২)। আহত প্লাবন ও হীরা চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে যান।

প্রথমদিকে অজ্ঞাতনামা চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। অধিকাংশ মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়; একটি ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে দুর্ঘটনাজনিত আঘাতজনিত শক ও রক্তক্ষরণের কথা উল্লেখ ছিল।

তবে ঘটনাটি আলোচনায় এলে তদন্তভার হস্তান্তর করা হয় পিবিআইয়ের কাছে। নতুন করে শুরু হওয়া তদন্তে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চালক স্বীকারোক্তি দেন। পরে পিকআপের মালিককেও গ্রেফতার করা হয়।

পিবিআইয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পিকআপটি ছিল ফিটনেসবিহীন, চালকের লাইসেন্স ও রুট পারমিটও ছিল না। প্রথম ধাক্কা দুর্ঘটনা হতে পারে, কিন্তু এরপর চালকের আচরণ—আহতদের উদ্ধার না করে বারবার গাড়ি চালিয়ে তাদের ওপর তুলে দেওয়া—এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা দেয়।

এই ধারাবাহিক আচরণগত প্রমাণই তদন্তকে দুর্ঘটনা থেকে সরিয়ে এনে হত্যাকাণ্ডের দিকে নির্দেশ করে।

সব তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে পিবিআই চালকের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। মালিকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা করা হয়।

শেষ পর্যন্ত আদালত চালককে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লক্ষ টাকা জরিমানার আদেশ দেন। অন্য দুই আসামির বিচার এখনও চলমান।

পিবিআইয়ের মতে, এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত—প্রাথমিকভাবে সাধারণ দুর্ঘটনা মনে হলেও, সূক্ষ্ম তদন্ত, ঘটনাস্থলের বিশ্লেষণ এবং অভিযুক্তের আচরণ মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটন সম্ভব।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন