কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণার পরপরই জেলায় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া আলোচনা-সমালোচনা সরাসরি বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
রোববার (৩ মে) পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা শহরের গুমগাছতলা এলাকায় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করেন। এতে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।
এর আগে মিজানুল আলমের নেতৃত্বে পদবঞ্চিত নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে সদ্য ঘোষিত কমিটি বাতিল ও পুনর্গঠনের দাবি জানান।
শনিবার (২ মে) কমিটি ঘোষণার পরপরই পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক পোস্টে ত্যাগের স্বীকৃতি না পাওয়া, পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্ব বাছাইয়ে প্রভাবশালী বলয়ের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়।
সাইফুর রহমান নয়ন তার পোস্টে লিখেছেন, “এমপি কাজল ভাইয়ের অনুসারী হয়ে ছাত্রদল করায় জেলা কমিটি থেকে বাদ পড়লাম। আমাদের ত্যাগ, পরিশ্রম, সময়—সবকিছুই কি মূল্যহীন?”
হুমায়ুন কবির হিমু লিখেছেন, “লাইফ রিস্ক নিয়ে দলের দুঃসময়ে কর্মসূচি পালন করাই মনে হয় আমাদের বোকামি ছিল।” তিনি আরও বলেন, “পদ-পদবীর দরকার নাই, আজীবন পাশে আছি।”
ইনজামামুল হক আবেগঘন ভাষায় লেখেন, “আমার মায়ের চোখের পানি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় কষ্ট… বিচার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম… আমি থামিনি, থামবো না।”
আবু বক্কর ছিদ্দিক লিখেছেন, “উপরে একজন আল্লাহ আছে, ভুলে গেলে চলবে না। ক্ষমতার দাম্ভিকতা আর কত?”
এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়েছে, কমিটি গঠন নিয়ে তৃণমূলের একটি অংশ সন্তুষ্ট নয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ শনিবার (২ মে) কক্সবাজার জেলা শাখার আংশিক কমিটি অনুমোদন দেয়। এতে সভাপতি করা হয় ফাহিমুর রহমানকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় মোহাম্মদ সাঈদ আনোয়ারকে।
এছাড়া সিনিয়র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হোসেন মাদু, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহেদ নুর জিতু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মুহাম্মাদ সালমান বাপ্পি এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফ ইমরান দায়িত্ব পেয়েছেন।
কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নবঘোষিত সভাপতি ফাহিমুর রহমান বলেন, “ঐক্যবদ্ধভাবে ছাত্রদলকে এগিয়ে নেব।” তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদবঞ্চিত ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে।
সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ আনোয়ার বলেন, “এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করবো।” তিনি যোগ করেন, “আগে গ্রুপিং ছিল, এখন আমরা গ্রুপিং বাদ দিয়ে কাজ করতে চাই।”
তবে নেতৃত্বের এই ঐক্যের বার্তার বিপরীতে তৃণমূলের একাংশের প্রতিক্রিয়ায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, কমিটি গঠনে পুরনো গ্রুপভিত্তিক সমীকরণ পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী নেতাদের অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তি ছিল। নতুন কমিটি ঘোষণার পর আবারও সেই বিভক্তির ইঙ্গিত মিলছে।
সামাজিক মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের প্রাধান্যের অভিযোগ উঠলেও এ বিষয়ে দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সদর–রামু আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলকে একটি ভিড়িও বার্তায় বলতে শোনা গেছে “জেলা ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্র সংগঠনের কমিটি ঘিরে ক্ষোভ নতুন নয়। তবে এবার সামাজিক মাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া এবং মাঠে নেমে বিক্ষোভ—দুটিই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে স্পষ্ট করেছে।
একদিকে নতুন নেতৃত্বের ঐক্যের বার্তা, অন্যদিকে তৃণমূলের ক্ষোভ-এই দ্বৈত বাস্তবতায় এখন বড় চ্যালেঞ্জ ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন। ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের কতটা সম্পৃক্ত করা যায়, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের সাংগঠনিক ভারসাম্য।
সব মিলিয়ে, নতুন কমিটি যেমন নেতৃত্বের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে, তেমনি ভেতরের অমীমাংসিত সমীকরণও সামনে নিয়ে এসেছে।
সিয়াম সোহেল 

















