সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প অধ্যুষিত হওয়ায় প্রশাসনিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ উখিয়া থানা। প্রতিমাসেই এই থানার মালখানায় জমা পড়ে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি-র্যাব সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জব্দ হওয়া কোটি টাকার অবৈধ মাদক ইয়াবা।
সুকৌশলে এসব ইয়াবাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও ইয়াবা কারবারিদের মধ্যে ওপেন সিক্রেট একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্য কয়েক স্তরে বিভক্ত যারা ইয়াবা মার্কেটের অবৈধ সাপ্লাই চেইনকে ব্যবহার করে অনৈতিকভাবে উপার্জন করছেন বিপুল অংকের অর্থ।
অনুসন্ধান বলছে, পালংখালী-হলদিয়ার সীমান্তবর্তী চোরাইপথ নিয়ন্ত্রণকারী কথিত মাদক কারবারিদের হাতে পৌঁছে দেয় সিন্ডিকেটটির থানা অংশের অসাধু পুলিশ সদস্যরা।
মূলত এমফেটামিন নামের দ্রব্যে তৈরি ইয়াবার বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে। মানের ভিত্তিতে এসব ইয়াবাগুলো ‘ডায়ামন্ড’, ‘সিংগাম’, ‘উপরের মাথা’, ‘নিচের মাথা’ সহ বিভিন্ন নামে পরিচিত। ডায়ামন্ড নামের ১০ হাজার ইয়াবা অবৈধভাবে ১২ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
উচ্চ মূল্যের কারণে মালখানায় এই শ্রেনির ইয়াবা ঢুকলে খবর পেয়ে যায় সিন্ডিকেটে জড়িত মাদককারবারীরা। পরে তাদের সাথে এক্সচেঞ্জ চুক্তিতে মালখানায় নিয়োজিত কর্মকর্তা ও তার সহযোগীরা নকল-নিম্নমানের ইয়াবা বা ইয়াবা সাদৃশ্য বিশেষ ট্যাবলেট দিয়ে আসল ইয়াবাগুলো কৌশলে পরিবর্তন করে দেন।
গত প্রায় দুই বছর ধরে উখিয়া থানার মালখানার দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশের ৩৮ তম ব্যাচের উপ-পরিদর্শক (এসআই) তপু বড়ুয়া রবি। তপুই অদৃশ্য সিন্ডিকেটটির বর্তমানের নিয়ন্ত্রক বলে জানা গেছে।
এছাড়াও অনুসন্ধানে তার সহযোগী হিসেবে এএসআই রণতোষ বড়ুয়া, কনেস্টবল লিমন সহ৪/৫ জন পুলিশ সদস্যের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা তপু বড়ুয়া পতিত স্বৈরাচার আমলের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ডিও লেটার ও বিপুল অংকের ঘুষ বিনিময় করে চাকরিতে প্রবেশ করেন বলে পুলিশে তার ব্যাচম্যাটদের মধ্যে প্রচার রয়েছে।
উখিয়া থানায় যোগদানের পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। অভিযোগ আছে সীমান্তের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি ফরিদ,মনির,বোরহান সহ চিহ্নিত কয়েকজনের সাথে কথিত সোর্সের মাধ্যমে সখ্যতা গড়ে রাষ্ট্রীয় জব্দকৃত আলামতকে কৌশলে বিক্রি করে তপু কামিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা।
উখিয়ায় অন্তত চারজন ওসিকে পেয়েছেন তপু, সম্প্রতি ওসি নুর আহমদ অন্তঃকোদলে বদলি হলে তপুও নিজের কালো টাকার বিনিময়ে অসাধু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার তদবির দ্বারা নিজের বদলি আদেশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
তপুর আগে মালখানায় দায়িত্ব পালন করা উখিয়া থানার সাবেক এসআই প্রভাকর বড়ুয়ার বিরুদ্ধেও ইয়াবা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠে। এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলমান রয়েছে বলে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উখিয়া থানার এক পুলিশ সদস্য প্রতিবেদকের সাথে কথোপকথনের এক ফাঁকে হাস্যরস করে জানান (অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত) ‘ তপু স্যারের অনেক টাকা, শুনেছি বৌদির নামে জায়গা কিনেছে। মালখানা তাকে কোটিপতি বানিয়ে দিয়েছে।’
পুলিশের এক কথিত সোর্সের দাবী (অডিও রেকর্ড) , শুধু উখিয়া থানায় নয় পার্শ্ববর্তী রামু-টেকনাফেও বিস্তৃত এই সিন্ডিকেট। তার দেওয়া ভাষ্যনুযায়ী, রামুর তদন্ত কর্মকর্তা জেলা ডিবির সাবেক দুই কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত।
তিনি বলেন, ‘ তপু হচ্ছে সিন্ডিকেটের অন্যতম মেম্বার তার সাথে আরো অনেকে জড়িত আছে। আমি একসময় ডিবির এক অফিসারকে তথ্য দিতাম এখন সে নাই। তপুকে উনি আমার সাথে পরিচয় করে দিছিল, আমি নিজের হাতেই লেনদেন করে দিছি টাকা।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তপু অস্বীকার করে বলেন, ‘ এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছুই না। আমার উর্ধতনের আদেশে মালখানা তদারকি করা হয় আর আমি এখন ঐ দায়িত্বে নাই৷ যারা অভিযোগ করেছে তারা প্রমাণ করুক।’
উখিয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমান জানান, ‘ মালখানা থানার মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও অধিক নিরাপত্তায় বেষ্টিত জায়গা। সেখান থেকে নয়ছয়ের কোন সুযোগ নেই। আমি মাত্র কয়েকদিন হল এসেছি এর আগে কি হয়েছে জানিনা।’
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত করা হবে বলে জানিয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদ্যুত মজুমদার বলেন, ‘ ইয়াবা জব্দ করে আদালতে প্রদর্শন করতে হয় এবং এই প্রক্রিয়া খুব কঠিনভাবে পালন করা হয় এখানে তেমন কোন গড়মিল করার কথা থাকবে বলে মনে হয় না। যদি সত্যিই এমন কিছু হয় তাহলে অবশ্যই বিধি মোতাবেক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘
ইমরান হোসাইন: 






















