চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসার অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছিল লোহাগাড়া ট্রমা সেন্টার। দুর্ঘটনার পর দূরের হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে কাছেই জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু চালুর এক বছর না যেতেই বন্ধ হয়ে গেছে সেই চিকিৎসাসেবা।
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ট্রমা সেন্টারটিতে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রয়েছে। সরকারের সঙ্গে চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের (সিআইএমসি) চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবায়ন না হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা। ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় সাধারণ রোগীরাও। চিকিৎসার জন্য এসে অনেককে ফিরে যেতে হচ্ছে। গুরুতর আহত রোগীদের নিয়ে স্বজনদের ছুটতে হচ্ছে চট্টগ্রাম শহরের হাসপাতালে।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পর গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিআইএমসির যৌথ ব্যবস্থাপনায় ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টারটি চালু করা হয়। এরপর এক বছরে প্রায় ১২ হাজার রোগী সেখানে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী চিকিৎসা নিতেন। সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষও এখানে চিকিৎসা পেয়েছেন।
ট্রমা সেন্টারে ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও ছিল। এটি পরিচালনার জন্য সিআইএমসির পক্ষ থেকে ছয়জন চিকিৎসক এবং ১৫ জন নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
তবে চলতি বছরের ৩১ জুলাই সরকারের সঙ্গে সিআইএমসির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর নতুন করে চুক্তি না হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর থেকে চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যায়।
মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৩ সালে ট্রমা সেন্টারটি নির্মাণ করা হয়। ওই বছরের ২৯ আগস্ট এর উদ্বোধনও হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে দীর্ঘদিন সেখানে চিকিৎসাসেবা চালু করা যায়নি।
প্রায় এক দশক পর স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর উদ্যোগে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ট্রমা সেন্টারটি আবার চালু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই স্থানীয় রোগীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হয়ে ওঠে এটি। এখন সেই কেন্দ্রের দরজায় ঝুলছে তালা।
ছেলের ড্রেসিং করাতে ট্রমা সেন্টারে এসেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম। এসে জানতে পারেন, সেখানে চিকিৎসাসেবা বন্ধ। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে নিয়ে ফিরে যেতে হয় তাঁকে।
হোসনে আরা বেগম বলেন, “ছেলের ড্রেসিং করাতে এসেছিলাম। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় সেবা পাইনি। এখানে চিকিৎসা বন্ধ থাকায় আমরা খুব সমস্যায় পড়েছি।”
ট্রমা সেন্টারে কর্মরত হাবীবুর রহমান শহীদ জানান, চালুর পর থেকে প্রায় ১২ হাজার রোগীকে সেখানে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ট্রমা সেন্টারটি পরিদর্শন করে যেকোনো মূল্যে এটি চালু রাখার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
হাবীবুর রহমান শহীদ বলেন, সংসদ সদস্যের আশ্বাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগস্ট মাসে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বেতন, চিকিৎসক, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় বর্তমানে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল ইফরান বলেন, ট্রমা সেন্টারটি পুনরায় চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
সিআইএমসির অধ্যক্ষ ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, ট্রমা সেন্টারটি চালু হওয়ার পর দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা ভালো চিকিৎসাসেবা পাচ্ছিলেন।
তিনি জানান, ট্রমা সেন্টারটি চালু করতে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। এর মধ্যে সরকার ৭৯ লাখ টাকা দিয়েছিল। বাকি অর্থ পরবর্তী অর্থবছরের বরাদ্দ থেকে সমন্বয় করার কথা ছিল। তবে পরবর্তী সময়ের জন্য সরকারের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় ট্রমা সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। প্রায়ই এ মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তির জন্য দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাছাকাছি ট্রমা সেন্টার বন্ধ থাকায় এখন আহতদের দূরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, চুক্তি বা প্রশাসনিক জটিলতায় গুরুত্বপূর্ণ এই চিকিৎসাকেন্দ্র যেন বন্ধ না থাকে। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ ও ওষুধের ব্যবস্থা করে ট্রমা সেন্টারটি আবার চালু করা হোক। মহাসড়কে দুর্ঘটনার পর আহত একজন মানুষের জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন: 






















