ঢাকা ০৫:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মেরিন ড্রাইভে সড়ক দূর্ঘটনায় আহত ৬,আশঙ্কাজনক ২ ঘুমধুম সীমান্তে অনুপ্রবেশ, তিন আরকান আর্মি সদস্য আটক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছয় সিটি প্রশাসকের সৌজন্য সাক্ষাৎ মেয়াদ অনুযায়ী ধাপে ধাপে হবে সিটি নির্বাচন : মির্জা ফখরুল চট্টগ্রামে গ্যাস বিস্ফোরণ: মায়ের পর চলে গেল ছেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় সারজিস-হান্নানের নেতৃত্বে এনসিপির কমিটি রোয়াংছড়িতে সেনাবাহিনী – সন্ত্রাসীর গোলাগুলি, নিহত ১ রমজানে মহানবী (সা.)-এর দিনলিপি সিগারেট বা যে কোনো ধোঁয়া গ্রহন করলে রোজা ভাঙ্গবে কি? টেকনাফের সাগরতীরের পাহাড়ে আগুন: ৪ ঘন্টা পর নিয়ন্ত্রণে প্যারাবনে হাত দিলেই খবর আছে : এমপি আলমগীর ফরিদ রাজাপালংয়ের ‘রাজার চেয়ার’ দখলে যাবে কার? ঈদগাঁওয়ে সংরক্ষিত বনের গাছ কাটার সময় গ্রেপ্তার ২, কাঠ জব্দ রামুতে হাতকড়া পরে মায়ের জানাজায় আসা সেই দুই সহোদর হারালেন বাবাকেও ​চকরিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের ছবি তোলায় তিন সাংবাদিকের ওপর হামলা

মোদীর চীন সফর: ভারত-চীন সমীকরণ, রাশিয়ার তেল এবং আমেরিকার ভূ-খেলা!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক চীন সফরকে প্রথমে হয়তো অনেকেই নিছক সৌজন্য সফর বলে ধরে নিয়ে ছিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এই সফর যেন নতুন এক ভূরাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। কারণ, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, উত্তেজনা, জ্বালানি সংকট আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির টানাপোড়েন, সবকিছু মিলিয়ে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন বৈশ্বিক ভারসাম্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

ভারত ও চীন, দুটি দেশই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর। কিন্তু তাদের দুর্বলতা জ্বালানি খাতে। এই ঘাটতিকে কাজে লাগাচ্ছে রাশিয়া। সস্তায় তেল ও গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে রাশিয়া শুধু অর্থনীতিই বাঁচাচ্ছে না, বরং দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করছে।

ভারতের লক্ষ্য এখানে পরিষ্কার। রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও সুলভে জ্বালানি পাওয়া, চীনের কাছ থেকে সীমান্ত সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা, আর একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন করা।

ইউক্রেন যুদ্ধ লম্বা হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো রাশিয়া থেকে ভারত ও চীনের অব্যাহত জ্বালানি ক্রয়। রাশিয়ার সরবরাহ করা তেল এত সস্তা যে, রাশিয়ার অভ্যন্তরেও সেই দামে মেলে না। এই জ্বালানি প্রবাহ বন্ধ না হলে রাশিয়ার অর্থনীতি সহজে ভেঙে পড়বে না। ফলে যুদ্ধ ক্ষেত্রের গতি অনেকটাই নির্ভর করছে দিল্লি ও বেইজিং এর সিদ্ধান্তের ওপর।

এখানে ভারতের জন্য খেলার মাঠ একেবারেই ভিন্ন। আমেরিকা শুল্ক বাড়াচ্ছে, সহযোগিতার নামে শর্ত চাপাচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া কোনো শর্ত ছাড়াই সস্তায় তেল-গ্যাস দিচ্ছে। তাই ভারতের কূটনৈতিক হিসাবটা দাঁড়াচ্ছে; একদিকে শর্তযুক্ত আমেরিকা, অন্যদিকে শর্তহীন রাশিয়া। ভারত এখন এই সমীকরণের মাঝেই নিজের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল তৈরি করছে।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে মোদীর জাপান সফরও এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সেখানে তিনি হয়তো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে “আমার চারপাশে সমস্যা তৈরি করে আবার আমাকেই বলা হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটকে শক্তিশালী করতে। চলুন রাজনীতি করি, সার্বভৌমত্ব নিয়ে টানাটানি না করি।” এখানে ভারতের আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। বার্তাটা স্পষ্ট, ভারত শুধু পশ্চিমাদের সহযোগী নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান নিয়ে একটি স্বাধীন শক্তি হতে চাইছে।

অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও রাশিয়া খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের গোয়েন্দা সংস্থা এতটাই শক্তিশালী যে, পশ্চিমাদের “ডীপ স্টেট”-এর প্রভাব সহজে কাজ করতে পারে না। এই কারণেই ভারত ও চীন রাশিয়াকে এখনো নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে।

মোদীর চীন সফর তাই নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি বহুমাত্রিক এক কৌশলগত পদক্ষেপ । এখানে ভারত অর্থনীতির পাশাপাশি নিজের ভূরাজনৈতিক স্বার্থকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি, চীনের সঙ্গে সমঝোতা; সব মিলিয়ে ভারত এক নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়াতে চাইছে। আর এই ভারসাম্যের খেলায় আমেরিকার একক আধিপত্য আর আগের মতো কার্যকর নাও থাকতে পারে।

লেখক- শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

This will close in 6 seconds

মোদীর চীন সফর: ভারত-চীন সমীকরণ, রাশিয়ার তেল এবং আমেরিকার ভূ-খেলা!

আপডেট সময় : ১২:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক চীন সফরকে প্রথমে হয়তো অনেকেই নিছক সৌজন্য সফর বলে ধরে নিয়ে ছিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এই সফর যেন নতুন এক ভূরাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। কারণ, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, উত্তেজনা, জ্বালানি সংকট আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির টানাপোড়েন, সবকিছু মিলিয়ে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন বৈশ্বিক ভারসাম্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

ভারত ও চীন, দুটি দেশই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর। কিন্তু তাদের দুর্বলতা জ্বালানি খাতে। এই ঘাটতিকে কাজে লাগাচ্ছে রাশিয়া। সস্তায় তেল ও গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে রাশিয়া শুধু অর্থনীতিই বাঁচাচ্ছে না, বরং দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করছে।

ভারতের লক্ষ্য এখানে পরিষ্কার। রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও সুলভে জ্বালানি পাওয়া, চীনের কাছ থেকে সীমান্ত সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা, আর একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন করা।

ইউক্রেন যুদ্ধ লম্বা হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো রাশিয়া থেকে ভারত ও চীনের অব্যাহত জ্বালানি ক্রয়। রাশিয়ার সরবরাহ করা তেল এত সস্তা যে, রাশিয়ার অভ্যন্তরেও সেই দামে মেলে না। এই জ্বালানি প্রবাহ বন্ধ না হলে রাশিয়ার অর্থনীতি সহজে ভেঙে পড়বে না। ফলে যুদ্ধ ক্ষেত্রের গতি অনেকটাই নির্ভর করছে দিল্লি ও বেইজিং এর সিদ্ধান্তের ওপর।

এখানে ভারতের জন্য খেলার মাঠ একেবারেই ভিন্ন। আমেরিকা শুল্ক বাড়াচ্ছে, সহযোগিতার নামে শর্ত চাপাচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া কোনো শর্ত ছাড়াই সস্তায় তেল-গ্যাস দিচ্ছে। তাই ভারতের কূটনৈতিক হিসাবটা দাঁড়াচ্ছে; একদিকে শর্তযুক্ত আমেরিকা, অন্যদিকে শর্তহীন রাশিয়া। ভারত এখন এই সমীকরণের মাঝেই নিজের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল তৈরি করছে।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে মোদীর জাপান সফরও এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সেখানে তিনি হয়তো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে “আমার চারপাশে সমস্যা তৈরি করে আবার আমাকেই বলা হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটকে শক্তিশালী করতে। চলুন রাজনীতি করি, সার্বভৌমত্ব নিয়ে টানাটানি না করি।” এখানে ভারতের আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। বার্তাটা স্পষ্ট, ভারত শুধু পশ্চিমাদের সহযোগী নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান নিয়ে একটি স্বাধীন শক্তি হতে চাইছে।

অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও রাশিয়া খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের গোয়েন্দা সংস্থা এতটাই শক্তিশালী যে, পশ্চিমাদের “ডীপ স্টেট”-এর প্রভাব সহজে কাজ করতে পারে না। এই কারণেই ভারত ও চীন রাশিয়াকে এখনো নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে।

মোদীর চীন সফর তাই নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি বহুমাত্রিক এক কৌশলগত পদক্ষেপ । এখানে ভারত অর্থনীতির পাশাপাশি নিজের ভূরাজনৈতিক স্বার্থকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি, চীনের সঙ্গে সমঝোতা; সব মিলিয়ে ভারত এক নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়াতে চাইছে। আর এই ভারসাম্যের খেলায় আমেরিকার একক আধিপত্য আর আগের মতো কার্যকর নাও থাকতে পারে।

লেখক- শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।