ঢাকা ০৩:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কক্সবাজারের ১৭৩ আইনজীবীর জাতিসংঘে আবেদন  মেয়েদের শিক্ষা হবে ‘ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি’, আসছে ‘এলপিজি কার্ড’: প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি রোধে কক্সবাজারে ৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি, পছন্দের পদে ফেরাতে তদবিরে সক্রিয় অসাধুরা নির্মাণ শ্রমিককে চাপা দিয়ে পালানো পিকআপ ৩০ কিমি পর জব্দ ‘অখণ্ড ভারতের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন এ কে ফজলুল হক’ গর্জনিয়া বাজারে রাজস্ব ‘গায়েব’ – অ্যাডভোকেট স্বপ্নাকে জেলা বারের সংবর্ধনা: সকলকে সাথে নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি টেকনাফে ১৪ হাজার ইয়াবাসহ কারবারি আটক বিজিবি দেখে ২৮২ রাউন্ড তাজা গুলি ফেলে পালাল দুষ্কৃতকারীরা ইংরেজি প্রথম পত্রে নকলের অভিযোগ, কক্সবাজারে ৩ শিক্ষার্থী বহিষ্কার রামুর রাজারকুলে এপেক্সিয়ান আবুল কায়সারের সৌজন্যে ফ্রি চক্ষু ক্যাম্প টেকনাফে অপহরণ ও চাঁদাবাজি মামলার পলাতক আসামি গ্রেফতার কক্সবাজার সিটি কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে ছাত্রদলের স্মারকলিপি পাহাড় কেটে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণ ! পাচারকারীর ফেলে যাওয়া বস্তায় মিললো বিপুল ইয়াবা

মোদীর চীন সফর: ভারত-চীন সমীকরণ, রাশিয়ার তেল এবং আমেরিকার ভূ-খেলা!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক চীন সফরকে প্রথমে হয়তো অনেকেই নিছক সৌজন্য সফর বলে ধরে নিয়ে ছিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এই সফর যেন নতুন এক ভূরাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। কারণ, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, উত্তেজনা, জ্বালানি সংকট আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির টানাপোড়েন, সবকিছু মিলিয়ে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন বৈশ্বিক ভারসাম্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

ভারত ও চীন, দুটি দেশই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর। কিন্তু তাদের দুর্বলতা জ্বালানি খাতে। এই ঘাটতিকে কাজে লাগাচ্ছে রাশিয়া। সস্তায় তেল ও গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে রাশিয়া শুধু অর্থনীতিই বাঁচাচ্ছে না, বরং দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করছে।

ভারতের লক্ষ্য এখানে পরিষ্কার। রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও সুলভে জ্বালানি পাওয়া, চীনের কাছ থেকে সীমান্ত সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা, আর একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন করা।

ইউক্রেন যুদ্ধ লম্বা হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো রাশিয়া থেকে ভারত ও চীনের অব্যাহত জ্বালানি ক্রয়। রাশিয়ার সরবরাহ করা তেল এত সস্তা যে, রাশিয়ার অভ্যন্তরেও সেই দামে মেলে না। এই জ্বালানি প্রবাহ বন্ধ না হলে রাশিয়ার অর্থনীতি সহজে ভেঙে পড়বে না। ফলে যুদ্ধ ক্ষেত্রের গতি অনেকটাই নির্ভর করছে দিল্লি ও বেইজিং এর সিদ্ধান্তের ওপর।

এখানে ভারতের জন্য খেলার মাঠ একেবারেই ভিন্ন। আমেরিকা শুল্ক বাড়াচ্ছে, সহযোগিতার নামে শর্ত চাপাচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া কোনো শর্ত ছাড়াই সস্তায় তেল-গ্যাস দিচ্ছে। তাই ভারতের কূটনৈতিক হিসাবটা দাঁড়াচ্ছে; একদিকে শর্তযুক্ত আমেরিকা, অন্যদিকে শর্তহীন রাশিয়া। ভারত এখন এই সমীকরণের মাঝেই নিজের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল তৈরি করছে।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে মোদীর জাপান সফরও এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সেখানে তিনি হয়তো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে “আমার চারপাশে সমস্যা তৈরি করে আবার আমাকেই বলা হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটকে শক্তিশালী করতে। চলুন রাজনীতি করি, সার্বভৌমত্ব নিয়ে টানাটানি না করি।” এখানে ভারতের আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। বার্তাটা স্পষ্ট, ভারত শুধু পশ্চিমাদের সহযোগী নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান নিয়ে একটি স্বাধীন শক্তি হতে চাইছে।

অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও রাশিয়া খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের গোয়েন্দা সংস্থা এতটাই শক্তিশালী যে, পশ্চিমাদের “ডীপ স্টেট”-এর প্রভাব সহজে কাজ করতে পারে না। এই কারণেই ভারত ও চীন রাশিয়াকে এখনো নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে।

মোদীর চীন সফর তাই নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি বহুমাত্রিক এক কৌশলগত পদক্ষেপ । এখানে ভারত অর্থনীতির পাশাপাশি নিজের ভূরাজনৈতিক স্বার্থকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি, চীনের সঙ্গে সমঝোতা; সব মিলিয়ে ভারত এক নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়াতে চাইছে। আর এই ভারসাম্যের খেলায় আমেরিকার একক আধিপত্য আর আগের মতো কার্যকর নাও থাকতে পারে।

লেখক- শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কক্সবাজারের ১৭৩ আইনজীবীর জাতিসংঘে আবেদন 

মোদীর চীন সফর: ভারত-চীন সমীকরণ, রাশিয়ার তেল এবং আমেরিকার ভূ-খেলা!

আপডেট সময় : ১২:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক চীন সফরকে প্রথমে হয়তো অনেকেই নিছক সৌজন্য সফর বলে ধরে নিয়ে ছিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এই সফর যেন নতুন এক ভূরাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। কারণ, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, উত্তেজনা, জ্বালানি সংকট আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির টানাপোড়েন, সবকিছু মিলিয়ে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক এখন বৈশ্বিক ভারসাম্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

ভারত ও চীন, দুটি দেশই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর। কিন্তু তাদের দুর্বলতা জ্বালানি খাতে। এই ঘাটতিকে কাজে লাগাচ্ছে রাশিয়া। সস্তায় তেল ও গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে রাশিয়া শুধু অর্থনীতিই বাঁচাচ্ছে না, বরং দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করছে।

ভারতের লক্ষ্য এখানে পরিষ্কার। রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও সুলভে জ্বালানি পাওয়া, চীনের কাছ থেকে সীমান্ত সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা, আর একই সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক সমর্থন অর্জন করা।

ইউক্রেন যুদ্ধ লম্বা হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো রাশিয়া থেকে ভারত ও চীনের অব্যাহত জ্বালানি ক্রয়। রাশিয়ার সরবরাহ করা তেল এত সস্তা যে, রাশিয়ার অভ্যন্তরেও সেই দামে মেলে না। এই জ্বালানি প্রবাহ বন্ধ না হলে রাশিয়ার অর্থনীতি সহজে ভেঙে পড়বে না। ফলে যুদ্ধ ক্ষেত্রের গতি অনেকটাই নির্ভর করছে দিল্লি ও বেইজিং এর সিদ্ধান্তের ওপর।

এখানে ভারতের জন্য খেলার মাঠ একেবারেই ভিন্ন। আমেরিকা শুল্ক বাড়াচ্ছে, সহযোগিতার নামে শর্ত চাপাচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া কোনো শর্ত ছাড়াই সস্তায় তেল-গ্যাস দিচ্ছে। তাই ভারতের কূটনৈতিক হিসাবটা দাঁড়াচ্ছে; একদিকে শর্তযুক্ত আমেরিকা, অন্যদিকে শর্তহীন রাশিয়া। ভারত এখন এই সমীকরণের মাঝেই নিজের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল তৈরি করছে।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে মোদীর জাপান সফরও এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। সেখানে তিনি হয়তো স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে “আমার চারপাশে সমস্যা তৈরি করে আবার আমাকেই বলা হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটকে শক্তিশালী করতে। চলুন রাজনীতি করি, সার্বভৌমত্ব নিয়ে টানাটানি না করি।” এখানে ভারতের আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। বার্তাটা স্পষ্ট, ভারত শুধু পশ্চিমাদের সহযোগী নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান নিয়ে একটি স্বাধীন শক্তি হতে চাইছে।

অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও রাশিয়া খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের গোয়েন্দা সংস্থা এতটাই শক্তিশালী যে, পশ্চিমাদের “ডীপ স্টেট”-এর প্রভাব সহজে কাজ করতে পারে না। এই কারণেই ভারত ও চীন রাশিয়াকে এখনো নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে।

মোদীর চীন সফর তাই নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি বহুমাত্রিক এক কৌশলগত পদক্ষেপ । এখানে ভারত অর্থনীতির পাশাপাশি নিজের ভূরাজনৈতিক স্বার্থকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি, চীনের সঙ্গে সমঝোতা; সব মিলিয়ে ভারত এক নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়াতে চাইছে। আর এই ভারসাম্যের খেলায় আমেরিকার একক আধিপত্য আর আগের মতো কার্যকর নাও থাকতে পারে।

লেখক- শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক,গবেষক ও চিন্তক।