নয় বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা এবার নিজেদের মাতৃভূমিতে ফেরার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দেখতে চান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উত্থাপিত পাঁচ দফা প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে তারা বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি ও সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন প্রত্যাবাসনের কার্যকর রোডম্যাপ। মিয়ানমারে নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ে নিজ দেশে ফিরতে চান তারা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৫-তে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়। রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার (ইউসিআর) উদ্যোগে সংগঠনটির কার্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে সহস্রাধিক রোহিঙ্গা অংশ নেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বনেতারা যখন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন শরণার্থীশিবির থেকে নিজেদের প্রত্যাবাসনের দাবি তুলে ধরেন ইউসিআরের নেতারা। তাদের প্রত্যাশা, এবারের অধিবেশনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
মানববন্ধনে ইউসিআরের সভাপতি প্যানেলের সদস্য মাস্টার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উত্থাপিত পাঁচ দফা প্রস্তাব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দাবিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে তুলে ধরেছে। এ উদ্যোগকে তাঁরা স্বাগত জানান। তবে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁরা এমন একটি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চান, যেখানে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর তাঁদের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত থাকবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তত্ত্বাবধানে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
ইউসিআর প্যানেলের আরেক সদস্য মৌলভী সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রায় এক দশক ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধানে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এখন সেই সংহতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তবে শুধু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিকও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাবে নতুন প্রত্যাশা
গতকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি পার্শ্বসভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় ইউরোপীয় ইউনিয়নও সহ-আয়োজক হিসেবে যুক্ত ছিল।
সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের আস্থার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন; মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা; রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা; আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কার্যক্রমে সহযোগিতার মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মাদক, মানবপাচার ও অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে সহযোগিতা জোরদার করা।
মানববন্ধনে ইউসিআরের নেতারা বলেন, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। বিশেষ করে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।
‘নয় বছর পেরিয়ে গেছে, আর দেরি নয়’
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এরপর নয় বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা কাটেনি। বছরের পর বছর শরণার্থীশিবিরে কাটলেও নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা থেকে তারা সরে আসেননি।
জাতিসংঘের চলমান অধিবেশনকে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন ইউসিআরের নেতারা। তাঁদের দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রত্যাবাসনের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণের পাশাপাশি মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
মানববন্ধনে ইউসিআরের সভাপতি প্যানেলের সদস্য মাস্টার কিন মং রফিক, মাস্টার শোয়াইব ও সাজেদা বেগমসহ সংগঠনটির অন্য নেতারা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
রোহিঙ্গাদের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়া। জাতিসংঘের এবারের অধিবেশন থেকে তারা এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছেন, যার মাধ্যমে দীর্ঘ নয় বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের ঘরে ফেরার পথ তৈরি হবে।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক: 
























