পিতার চোখে অঝোর শ্রাবণ, মায়ের বিমূঢ় আহাজারি, আত্মীয় স্বজনের আর্তনাদ, সহপাঠীদের চোখে ছলছল করা জলে, জানাযায় কান্নার কলরবে শেষ বিদায় নিয়ে চিরনিদ্রায় কবরে শায়িত হলেন মহেশখালীর ইয়াসের আহমেদ জীম।
দ্বীপের দূরন্তপনা শৈশব পেরিয়ে ইয়াসের কারাতে দিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে নগর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। নানা ঘাতপ্রতিঘাত;প্রতিযোগিতার ধাপ পেরিয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ ক্রিড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকেএসপি এর কারাতে বিভাগে। অর্জন করে নিয়েছিলেন ৩টি স্বর্ণপদক ও ৩১ টি রৌপ্য। সদ্য সমাপ্ত সাউথ এশিয়ান কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬—এ বাংলাদেশ জুনিয়র দলে অংশ নিয়ে করেছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব। যে প্রতিষ্ঠান ছিলো তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান, সে প্রতিষ্ঠানেই তার ফেলতে হলো শেষ নিঃশ্বাস।
গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত প্রায় ৩ টায় ইয়াসেরের শিক্ষক পিতা মোখতার আহমেদের মুঠোফোনে কল আসে। রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে বিকেএসপি কর্তৃপক্ষের পরিচয় দিয়ে জানানো হয় ‘রাত আনুমানিক দেড় টায় বিকেএসপি ক্যাম্পাসের দেয়াল টপকাতে গিয়ে তাঁর সন্তান ইয়াসের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে।’
এ যেনো মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়ার খবর। একটি পরিবার, এক দূরন্তপনা স্বপ্নবাজ কিশোরের বিশ্বজয়ের স্বপ্নের অবসানের খবর।
এই খবর শুনে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ইয়াসের’র পরিবার জানতে চান, ‘এতো রাতে ইয়াসের ভবণের দেয়াল টপকাতে যাবে কেন, সংরক্ষিত এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার কেন, হোস্টেলের নাইট শিক্ষক কোথায় ছিলেন।’ কোনো প্রশ্নেরই সদুত্তর মিলেনি এখনো।
পরদিন (বুধবার, ২৯ জুলাই) সকালে ইয়াসেরের পরিবার ঢাকায় পৌঁছালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে তাঁর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর ইয়াসেরের নিথর দেহ নেওয়া হয় তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে। যে প্রতিষ্ঠানের হয়ে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বুনেছিল ইয়াসের। বিকেএসপির অডিটোরিয়ামে হয় তাঁর প্রথম জানাযা।
এরপর সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে তাঁর জন্মভিটায় পাড়ি দেন বাকরুদ্ধ সন্তানহারা পরিবার। শৈশবের ধুলোবালি মাড়িয়ে স্বপ্নপুরণে যে নগর জীবনে পৌঁছেছিল ইয়াসের। শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সে নগর ছেড়ে ধুলোবালি মাখা শৈশবের ভূমিতে ফিরে এসেছে ইয়াসের। কিন্তু! প্রাণহীন এক নিশ্চুপ নিথর দেহ হয়ে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকাল ১১ টায় ইয়াসেরের গ্রাম মহেশখালীর কুতুবজোমের নয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত হয় স্বপ্নবাজ কিশোরের অন্তিম যাত্রার সমাবেশ; জানাযা। যেখানে ইয়াসের আহমেদ জীমের স্মরণে কান্নার রোলে আকাশ-বাতাস ধ্বনিত হলো। অশ্রুসজলে ভরে উঠলো আগতদের চোখ।
সকলের কন্ঠে দাবি উঠলো সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ইয়াসেরের মৃত্যু কারণ খতিয়ে দেখার। সন্তানহারা পরিবারকে সঠিক কারণ জানানোর। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো মহেশখালী দ্বীপ থেকে বিশ্বমঞ্চে কারাতের দামামা বাজানো, লাল সবুজের পতাকা উড়ানোর স্বপ্নবাজ কিশোর ইয়াসের আহমেদ জীম’কে।
কাব্য সৌরভ 























