২০২৬ বিশ্বকাপ এখন শেষ চারের লড়াইয়ে। সেমিফাইনালে উঠেছে স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এই চার দলের টুর্নামেন্টজুড়ে আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সাফল্য এসেছে একাধিক খেলোয়াড়ের সম্মিলিত অবদানে, কিন্তু আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে ছবিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
স্পেনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বোচ্চ গোল করেছেন মিকেল ওইয়ারজাবাল। অ্যাসিস্ট ও বিগ চান্স তৈরিতে এগিয়ে আছেন মার্ক কুকুরেয়া। কী পাসে পেদ্রো পোরো, প্রতি ৯০ মিনিটে সফল ড্রিবলে লামিন ইয়ামাল, চান্স ক্রিয়েশনে অ্যালেক্স বায়েনা এবং সবচেয়ে নিখুঁত ক্রসে রদ্রিগেজ শীর্ষে রয়েছেন। অর্থাৎ আক্রমণের প্রতিটি দিক ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
ফ্রান্সের চিত্রও প্রায় একই। গোলে কিলিয়ান এমবাপ্পে, অ্যাসিস্ট ও বিগ চান্স ক্রিয়েশনে মাইকেল ওলিসে, কী পাস ও ক্রসে উসমান দেম্বেলে, সফল ড্রিবলে ব্র্যাডলি বারকোলা এবং মোট চান্স তৈরিতে আবারও এমবাপ্পে এগিয়ে। দলটির আক্রমণভাগে দায়িত্বের ভার স্পষ্টভাবেই ভাগ হয়ে আছে একাধিক তারকার মধ্যে।
ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যায়। গোলে যৌথভাবে শীর্ষে হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম। অ্যাসিস্টে অ্যান্থনি গর্ডন, কী পাস ও বিগ চান্স তৈরিতে ডেকলান রাইস, সফল ড্রিবলে এবেরেচি এজে, চান্স ক্রিয়েশনে বেলিংহাম এবং সবচেয়ে নিখুঁত ক্রসে ননি মাদুয়েকে সবার উপরে।
কিন্তু আর্জেন্টিনার পরিসংখ্যানে এসে বদলে যায় পুরো গল্প।
সর্বোচ্চ গোলদাতা—লিওনেল মেসি।
সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতা—লিওনেল মেসি।
সবচেয়ে বেশি কী পাস—লিওনেল মেসি।
প্রতি ৯০ মিনিটে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবল—লিওনেল মেসি।
সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগ সৃষ্টি—লিওনেল মেসি।
সবচেয়ে বেশি বিগ চান্স তৈরি—লিওনেল মেসি।
সবচেয়ে নিখুঁত ক্রস—লিওনেল মেসি।
অর্থাৎ আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্সের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই শীর্ষে একই ফুটবলারের নাম। সেমিফাইনালে ওঠা বাকি তিন দলের ক্ষেত্রে যেখানে এই সাত বিভাগে মোট ১৮ জন ভিন্ন খেলোয়াড়ের নাম উঠে এসেছে, সেখানে আর্জেন্টিনার সাতটি বিভাগই দখল করে আছেন একজন—লিওনেল মেসি।
এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এটি করছেন ৩৯ বছর বয়সে। আধুনিক ফুটবলে এই বয়সে অধিকাংশ খেলোয়াড়ের ভূমিকা সীমিত হয়ে আসে। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো চিত্র। তিনি শুধু গোল করছেন না, সতীর্থদের দিয়ে গোলও করাচ্ছেন; আক্রমণ গড়ে তুলছেন, ড্রিবল দিয়ে রক্ষণ ভাঙছেন, সৃজনশীল পাস দিচ্ছেন এবং ডেড বল কিংবা ওপেন প্লে—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর ক্রস সরবরাহ করছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপেই মেসির সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। গোল, সুযোগ সৃষ্টি, সৃজনশীলতা ও বলের ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই তিনি দলের প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল পর্যায়ে এসে একটি দলের সাতটি প্রধান আক্রমণাত্মক সূচকে একই খেলোয়াড়ের শীর্ষে থাকা নিঃসন্দেহে বিরল ঘটনা। আর সেই খেলোয়াড়ের বয়স যখন ৩৯, তখন এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যার তালিকা নয়; এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ব্যতিক্রমী ব্যক্তিগত আধিপত্যেরও প্রতিচ্ছবি।
ছবি: জিমেনি
সায়ন্তন ভট্টাচার্য 




















