কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে আবারও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পৃথক দুটি অভিযানে নারী ও শিশুসহ মোট ৬৯ জন মিয়ানমারের নাগরিককে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সঙ্গে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত তিনজন দালালকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। যদিও পরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ প্রকাশে অনীহা প্রকাশ করেন। তবুও মাঠপর্যায়ের একাধিক সূত্রে ঘটনার বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে।
দুই অভিযানে আটক ৬৯ জন :
বিজিবি’র একটি সূত্র জানায়, সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেল চারটার দিকে নাজিরপাড়া বিওপির অধীনস্থ ১নং বেড়িবাঁধ হতে নাফ নদীর তীরবর্তী গফুরের ঘের এলাকার একটি কেওড়া বাগানে অভিযান চালায়। রোহিঙ্গাবোঝাই একটি কাঠের নৌকাসহ ১১ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে চারজন নারী ও সাতজন শিশু। অভিযানের সময় একটি হাতচালিত কাঠের নৌকাও জব্দ করা হয়। যা দিয়ে তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে রোববার (২৬ এপ্রিল) ভোর সাড়ে চারটার দিকে ব্যাটালিয়ন সদর থেকে পরিচালিত আরেকটি বিশেষ টহল দল উপজেলার মহেশখালীয়া পাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। স্থানীয় এক বাসিন্দার বাড়ির পাশের একটি গোপন আস্তানা থেকে ৫৮ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, ২০ জন নারী ও ৩৩ জন শিশু রয়েছে।
অভিযান চলাকালে ঘটনাস্থল থেকে মানবপাচারে ব্যবহৃত একটি অটোরিকশা এবং দুটি খালি গ্যাস সিলিন্ডার জব্দ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার পর এসব স্থানে তাঁদের অস্থায়ীভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
দালালচক্রের সক্রিয় ভূমিকা :
অভিযানের সময় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত তিনজন দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা পারাপারে জড়িত একটি চক্রের সদস্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দালালরা প্রতি পরিবার বা ব্যক্তির কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে মরিয়া রোহিঙ্গারা নিজেদের সব সম্পদ বিক্রি করেও এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় নামছেন।
সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশের ধারাবাহিকতা :
শুধু এই ঘটনাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দিয়ে একাধিক অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে একই পরিবারের ১০ সদস্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে উখিয়ার জামতলী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। তাদের অধিকাংশই শিশু হওয়ায় বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
এছাড়া মার্চ মাসে মিয়ানমারের মংডু এলাকা থেকে পালিয়ে আসা আরেকটি পরিবার দালালদের সহায়তায় প্রায় ৭০ লাখ কিয়াট (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় চার লাখ টাকা) দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে উখিয়ার ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, “সম্প্রতি প্রায় প্রতিরাতেই নাফ নদীতে ছোট ছোট নৌকা বা ভেলা ভেসে আসতে দেখা যায়। অনেক সময় নারী-শিশুর কান্নার শব্দও শোনা যায়।”
রাখাইনের সহিংসতা ও পালিয়ে আসা মানুষ :
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতি নতুন করে অনুপ্রবেশ বৃদ্ধির মূল কারণ। বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি, বিভিন্ন রোহিঙ্গা সশস্ত্র সংগঠন এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর ত্রিমুখী সংঘর্ষে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
বুথিডং ও মংডু এলাকায় জোরপূর্বক নিয়োগ, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ভয়াবহ মানবিক চাপ :
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বেড়েছে। গত প্রায় ১৮ থেকে ২০ মাসে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী ও শিশু, যাদের মধ্যে অনেকেই অপুষ্টি, রোগব্যাধি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
এদিকে, মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
সীমান্তবাসীর উদ্বেগ :
টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন করে অনুপ্রবেশের ফলে এলাকায় অপরাধ, মাদক পাচার ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শামিমুল ইসলাম বলেন, “প্রতি রাতেই নতুন নতুন লোক ঢুকছে। আমরা ভয় নিয়ে থাকি, কখন কী হয়।”
নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ :
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন কেবল মানবিক ইস্যু নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলামের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় তিনটি বড় ঝুঁকি সামনে আসছে। তা হলো, সীমান্ত নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়া, ক্যাম্পে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচার চক্রের বিস্তার।
প্রত্যাবাসন স্থবির, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ :
২০১৭ সালের গণহত্যার পর শুরু হওয়া রোহিঙ্গা সংকটের এখনো কোনো টেকসই সমাধান হয়নি। একাধিকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাদেশ সরকার বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে, যাতে মিয়ানমারে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি করা হয়।
তবে বাস্তবতা হলো, রাখাইনে সংঘাত চলমান থাকায় সেই সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। ফলে সীমান্তের এপারে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
এব্যাপারে সামাজিক সংগঠন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার কন্ঠে হতাশা। তার ভাষ্য, “নাফ নদীর কালো জলে ভেসে আসা ছোট ছোট নৌকাগুলো যেন শুধু মানুষ নয়, বয়ে আনছে এক গভীর সংকটের গল্প। প্রতিটি মুখে ভয়, প্রতিটি চোখে অনিশ্চয়তা। আর বাংলাদেশের সীমান্তে দাঁড়িয়ে সেই সংকট দিন দিন আরও জটিল রূপ নিচ্ছে।”
ইমরান হোসাইন 



















