চব্বিশের জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো সাহসিকতা ও সক্রিয়তার কারণে সমুদ্র শহরের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন প্রয়াত ছাত্রদল নেতা খোরশেদ আলম।
গত ২৪ মার্চ রাতে সৈকতের কবিতা চত্বর সংলগ্ন এলাকায় দুর্বৃত্তরা হত্যা করে তাকে, শরীর জুড়ে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে এঘটনার পেছনে আছে আততায়ীর জমে থাকা ক্ষোভ।
ঘটনার সময় খোরশেদের সাথে ছিলেন তারিন নামে এক নারী সমন্বয়ক যাকে সেদিন রাতে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়, পরদিন ছাড়া হয় পরিবারের জিম্মায়।
২৫ মার্চ সকালে শহরের কথিত গ্যাং বিচ্ছু গ্রুপের সদস্য কাকা তারেককে খোরশেদ হত্যাকান্ডে চকরিয়ার খুটাখালী থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ, বিষয়টি সংবাদ সম্মেলন করে বিকেলে গণমাধ্যমকে জানান পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।
ঘটনার রাতে তারিনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যেখানে তিনি দাবী করেন কবিতা চত্বরে অবস্থানের সময় একদল দুর্বৃত্ত তাদের ঘিরে ধরে খোরশেদের কাছে মূল্যবান জিনিসপত্র দাবি করে।
তারিনের ভাষ্যনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা বিচ্ছু গ্রুপের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ‘আরিফ’ নামে একজনকে মারধরের অভিযোগ তুলে খোরশেদকে আঘাত করতে থাকে।
নিহতের ছোটভাই নওশাদের দায়ের করা মামলায় এই আরিফ তিন নং আসামি, কারাগারে থাকা কাকা তারেককে প্রধান আসামি সহ মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে যেখানে আরও ৩ থেকে ৪ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও এজাহারে স্বাক্ষী হিসেবে রয়েছে তারিনের নাম।
২৬ মার্চ রাতে এই মামলা দায়ের করা হয় বলে জানান কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি ছমিউদ্দিন।
হত্যাকান্ডের ২০ দিন আগে ৫ ও ৬ মার্চ কলাতলীতে বিবাদে জড়ায় আলোচিত গ্যাং ফকির গ্রুপ ও বিচ্ছু গ্রুপ। নেপথ্যে কারণ ছিল আধিপত্য ও এক নারীকে কেন্দ্র করে ত্রিভুজ প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব। আরিফ ও খোরশেদ ৬ তারিখের ঘটনায় আহত হয়।
খোরশেদের বন্ধু মহল ও একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবী, তারিন তাকে কবিতা চত্বরে ডেকেছিলেন৷ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার কিছু ঘন্টা আগে খোরশেদ ফেসবুকে লিখেন, ‘ চলো ঘুরতে যায়,এমন বলার তুমি নাই।’
সূত্রের দাবী, তারিন ও খোরশেদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ছিলো এবং কক্সবাজার থেকে তারিন ঢাকামুখী হওয়ায় সেই সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে।
দীর্ঘদিন পর ঈদের ছুটিতে সেদিন দেখা হয় দুজনের, খোরশেদ জানত না এটি তার জীবনের শেষ সাক্ষাৎ।
‘মিছিলেও প্রেম হোক, ভেঙে যাক মোহ, তুমি সাজো ব্যারিকেড, আমি বিদ্রোহ’ বিখ্যাত কবিতার এই লাইনের মত অনেক প্রেম জন্ম দিয়েছে চব্বিশের জুলাই। বরগুনার জুলাই যোদ্ধা নিলয়-আনিকার মতো আন্দোলনে প্রেম থেকে পরিণয়ের অনেক গল্প গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় এসেছে।
কক্সবাজারে আন্দোলনে জড়িতদের চায়ের আড্ডায় প্রচার আছে খোরশেদ ছাড়াও অন্য এক সমন্বয়কের সাথে তারিনের যোগাযোগ ছিলো। যদিও প্রতিবেদক সেই সমন্বয়ক ও সম্পর্ক নিয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি।
ত্রিভুজ প্রেমের মুখরোচক আলাপ ছাড়াও সমানতালে গ্যাং ক্ল্যাশের গন্ধ মিলছে খোরশেদের পরিণতির পেছনে।
হত্যা পরবর্তী সময়ে খোরেশেদের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা রিয়াদ মনি ফেসবুকে লিখেন, ‘কিশোর গ্যাং এর সাথে জড়িত কত ফেরেস্তা রাজনীতিবিদ! তাদের প্রতি থু— নিজেদের স্লোগানের লাইন ভারী করার জন্য এই গ্যাং’কে কারা আশ্রয় প্রশ্রয় দেয় তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে প্রতিহত করা হউক।’
এছাড়াও তিনি আরেকটি স্ট্যাটাসে বলেন, ‘ খোরশেদ’কে আয়োজন করে খু/ন করা হয়েছে। খুনি কাকা তারেকের সাথে খোরশেদ ভাইয়ের এমন কোন শত্রুতা নাই যে আয়োজন করে খুন করবে। সহযোদ্ধা তারিনের যে বক্তব্য, খুনি কাকা তারেক’কে সর্বোচ্চ জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হউক। বাকী অপরাধীদের ও গ্রেফতার করতে হবে।’
জুলাই আন্দোলনের কক্সবাজারের পরিচিত মুখ এসএস সাগর ফেসবুকে বলেন, ‘খোরশেদকে বাঁচাতে পারিনাই আমরা। চেষ্টা করেছিলাম খোরশেদকে যারা হত্যা করেছে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে। কিন্তু একটা পক্ষ, একটা চক্র, অথবা একটা অদৃশ্য শক্তি পর্দার আড়ালে বসে ইচ্ছেকৃতভাবে সবকিছু এলোমেলো করে দিলো। ‘
এছাড়াও তিনি বলেন, ‘মারাত্মক ভাবে মনে হচ্ছে, সবকিছুর ভেতর কোথাও যেনো একটা বিরাট ভুল হচ্ছে। কেউ ইচ্ছেকৃতভাবে সবকিছু সাজিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যে হলো খোরশেদ হত্যা মামলাকে বিতর্কিত করে, মামলার মেরিট নষ্ট করে! সমালোচনার মুখে ফেলে প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচানোর নীল নকশা বাস্তবায়ন করা।’
ওসি ছমি উদ্দিন জানান, ‘হত্যাকান্ডে দায়েরকৃত মামলার এজাহারে নাম থাকা ব্যক্তিদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলকে তদন্তের আওতায় আনা হবে। তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ‘খোরশেদ আলম হত্যাকাণ্ড কেবল একটি ব্যক্তিগত বিরোধের ফল নয়—এটি সমাজে ক্রমবর্ধমান গ্যাং সংস্কৃতি, সম্পর্কের জটিলতা এবং তরুণদের মধ্যে সহিংস প্রবণতার একটি প্রতিচ্ছবি।’
একটি তুচ্ছ দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝি বা প্রেমের টানাপোড়েন যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে—খোরশেদের মৃত্যু তারই একটি নির্মম উদাহরণ।
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন সমাজের গভীরে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধান—যাতে আর কোনো খোরশেদকে এমন নির্মম পরিণতির শিকার হতে না হয় এমনই বলছেন কক্সবাজারের সচেতন মহল।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক 


















