ঐতিহ্য, ইতিহাস ও প্রশাসনিক গুরুত্বের বিচারে কক্সবাজার জেলার অন্যতম প্রাচীন জনপদ রামুকে পৌরসভা ঘোষণার দাবি জোরালো হয়েছে। দীর্ঘদিনের এ দাবির প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের কাছে দ্রুত রামু পৌরসভা বাস্তবায়ন করার আবেদন জানিয়েছেন ব্যারিস্টার আবুল আলা সিদ্দিকী।
তাঁর মতে, ঐতিহাসিক মর্যাদা ও বর্তমান জনসংখ্যা–বাস্তবতার আলোকে রামুকে আর উপজেলা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই; এখনই সময় পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে পৌরসভা ঘোষণা করার।
প্রাচীন জনপদের ইতিহাস
ইতিহাসবিদদের মতে, রামু ছিল আরাকান ও চট্টগ্রাম উপকূলীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। প্রাচীনকালে এ অঞ্চল বাণিজ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
ধারণা করা হয়, আরাকান রাজ্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘেঁষা এ জনপদে বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে বহু শতাব্দী আগে।
রামুর বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার, প্রাচীন স্তূপ ও প্রত্ননিদর্শন সেই ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। বিশেষ করে রামু কেন্দ্রীয় সীমা বৌদ্ধ বিহারসহ একাধিক ধর্মীয় স্থাপনা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। এখানকার বিশাল বুদ্ধমূর্তি ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য কক্সবাজারের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঔপনিবেশিক আমলেও রামু ছিল প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের একটি কেন্দ্র।
নদীপথ ও সড়কপথের সংযোগ থাকায় এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট এলাকা। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য, বনজ সম্পদ ও নৌ-বাণিজ্যের মাধ্যমে রামুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
জনসংখ্যা ও নগরায়ন
বর্তমানে রামু উপজেলা দ্রুত নগরায়নের পথে এগোচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ব্যাংক-বীমা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষ এখানে সমবেত হচ্ছেন।
কক্সবাজার শহরের সম্প্রসারণ এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ রামুর ওপরও প্রভাব ফেলেছে।
স্থানীয়দের মতে, পৌরসভা কাঠামো না থাকায় পরিকল্পিত সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আলোকসজ্জা ও নাগরিক সেবায় ঘাটতি রয়ে গেছে।
দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপ সামাল দিতে একটি স্বতন্ত্র পৌর প্রশাসন প্রয়োজন।
ব্যারিস্টার আবুল আলা সিদ্দিকী বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে কক্সবাজারের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদ রামু। শতবর্ষের ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এটি এখনও পৌরসভার মর্যাদা পায়নি। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্যোগে রামুকে পৌরসভা ঘোষণা করা হলে এটি হবে। কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ।’
তিনি আরও বলেন, রামুকে পৌরসভা ঘোষণা করা হলে পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। এতে স্থানীয় যুবসমাজের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, রামুকে পৌরসভা ঘোষণা করা হলে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।’
কক্সবাজার জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় রামুর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে তাঁরা মত দেন।
এদিকে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পৌরসভা ঘোষণার জন্য নির্দিষ্ট জনসংখ্যা, অবকাঠামো ও রাজস্ব আয়ের মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। রামু সে মানদণ্ডে কতটা এগিয়ে রয়েছে, তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে রামুকে একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এখন দেখার বিষয়, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















