ঢাকা ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কারিনা কায়সার আর নেই লবণের পরিচয় সংকট: কৃষকের ঘামের ফসল, নাকি শুধু শিল্পের কাঁচামাল? ঐক্যবদ্ধ টেকনাফ গড়ার অঙ্গীকার: এনসিপি, যুবশক্তি ও ছাত্রশক্তির যৌথ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপে চ্যাম্পিয়ন পেকুয়ার রাজাখালী  ফারুক – উখিয়া উপজেলা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বে এগিয়ে যে নাম চট্টগ্রামে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হ্নীলার ইসমাইল ‘মানিলন্ডারিং-মানবপাচার চক্রের’ রোহিঙ্গা সদস্য আটক সোহেল সরওয়ার কাজল অসুস্থ: দোয়া কামনা পরিবারের টেকনাফে সরকারি কাজে বাধা ও কর্মকর্তা লাঞ্ছিত করার মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ২৯৬তম আবির্ভাব উৎসব উদযাপন কমিটি গঠিত র‌্যাবের জালে মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি টেকনাফ ও উখিয়ায় পৃথক অভিযানে ৭২ হাজার ইয়াবাসহ আটক ২ ”খেলাঘরের “ ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন রামুর দরিয়া খেলাঘর আসরের হজে গিয়ে আরও দুই বাংলাদেশির মৃত্যু, মোট মৃতের সংখ্যা ১৪ ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলক চালুর অনুমতি দিয়েছিল আ. লীগ সরকার, যা এখন মরণফাঁদ : মির্জা ফখরুল

লবণের পরিচয় সংকট: কৃষকের ঘামের ফসল, নাকি শুধু শিল্পের কাঁচামাল?

বাংলাদেশের উপকূলজুড়ে হাজার হাজার লবণ চাষী বছরের পর বছর ধরে একই অভিযোগ করে আসছেন “লবণের দাম কম”, “উৎপাদন খরচ উঠছে না”, “আমদানিতে বাজার নষ্ট হচ্ছে”, “চাষী বাঁচছে না”। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি শুধুই বাজারের? নাকি এর গভীরে রয়েছে নীতিগত ও প্রশাসনিক কাঠামোগত দুর্বলতা?

বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের লবণ খাত দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে উৎপাদনকারী কৃষকের চেয়ে শিল্প ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে লবণকে কৃষিপণ্য হিসেবে নয়, অনেকাংশে শিল্প কাঁচামাল হিসেবে দেখা হয়েছে। আর এখানেই মূল দ্বন্দ্বের শুরু।

বর্তমান কাঠামোতে দেখা যায়;

১। লবণ চাষী বা কৃষক শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে,

২। লবণের উৎপাদন ও চাহিদা নিরূপণ শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে,

৩। লবণ রিফাইনারি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে,

৪। সর্বজনীন আয়োডিন যুক্ত লবণ (ইউএসআই) কার্যক্রমও শিল্প মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীক,

৫। এমনকি লবণ আমদানিও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে পরিচালিত হয়।

অর্থাৎ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার, আমদানি, সবকিছু একই প্রশাসনিক ছাতার নিচে। এর ফলে নীতি নির্ধারণে স্বার্থের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ একই প্রতিষ্ঠান যখন কৃষকের অভিভাবক, শিল্পের পরিচালক এবং আমদানির সুপারিশকারী, তখন কৃষকের স্বার্থ প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে।

লবণ চাষীরা মূলত কৃষক। তারা প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে উৎপাদন করেন। তাদের বাস্তবতা ধান, মাছ বা সবজি চাষীর বাস্তবতার মতোই, জলবায়ু ঝুঁকি, মৌসুমি ক্ষতি, উৎপাদন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী, ঋণ সংকট ও বাজার অনিশ্চয়তা। অথচ কৃষি খাতের জন্য যে ধরনের নীতিগত সহায়তা থাকে, ন্যায্য মূল্য, ভর্তুকি, কৃষি বীমা, উৎপাদন তথ্যভান্ডার, গবেষণা, সম্প্রসারণ, সেসব সুবিধা লবণ চাষীরা কাঠামোগত ভাবে খুব সীমিত আকারে পান।

তাই একটি সমন্বিত পুনর্বিন্যাস এখন সময়ের দাবি হতে পারে। সম্ভাব্য কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস;

১। লবণ চাষী ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে লবণকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনলে উৎপাদন পরিকল্পনা, কৃষক নিবন্ধন, মাঠ পর্যায়ে সহায়তা ও গবেষণা আরও বাস্তব ভিত্তিক হতে পারে।

২। উৎপাদন ও চাহিদা নিরূপণে কৃষি ভিত্তিক ডাটা সিস্টেম লবণের প্রকৃত উৎপাদন, মজুদ ও চাহিদা নিরূপণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ভান্ডার না থাকলে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত আমদানির ঝুঁকি থেকেই যায়।

৩। লবণ রিফাইনারি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা রিফাইনারি মূলত শিল্প ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাত। তাই এটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকাটা যৌক্তিক। তবে কৃষক ও রিফাইনারির মধ্যে ন্যায্য মূল্য ভিত্তিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে।

৪। সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ কার্যক্রম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আয়োডিন ঘাটতি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই ইউএসআই কার্যক্রমকে জনস্বাস্থ্য নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হলে এর কার্যকারিতা বাড়তে পারে।

৫। লবণ আমদানিতে যৌথ সিদ্ধান্ত ব্যবস্থা কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আমদানি সিদ্ধান্ত হলে স্থানীয় উৎপাদন, শিল্পের চাহিদা ও বাজার স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে।

আজ বাস্তব প্রশ্ন হলো, আমরা কি লবণকে শুধুই শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে দেখবো, নাকি উপকূলীয় লাখো মানুষের জীবিকা হিসেবে দেখবো?

শুধু “লবণের দাম কম” বলে চিৎকার করলে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ সমস্যা কেবল দামের নয়; সমস্যা নীতির, কাঠামোর এবং দৃষ্টি ভঙ্গির। যতদিন পর্যন্ত লবণ চাষীকে প্রকৃত কৃষক হিসেবে মূল্যায়ন করা না হবে, ততদিন “জাত গেল” ধরনের আবেগঘন আলোচনা চলবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

বাংলাদেশের লবণ শিল্পকে টেকসই করতে হলে এখন সময় এসেছে, চিৎকারের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে কাঠামোগত সংস্কারের আলোচনায় যাওয়ার।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

কারিনা কায়সার আর নেই

লবণের পরিচয় সংকট: কৃষকের ঘামের ফসল, নাকি শুধু শিল্পের কাঁচামাল?

আপডেট সময় : ১২:৫৪:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

বাংলাদেশের উপকূলজুড়ে হাজার হাজার লবণ চাষী বছরের পর বছর ধরে একই অভিযোগ করে আসছেন “লবণের দাম কম”, “উৎপাদন খরচ উঠছে না”, “আমদানিতে বাজার নষ্ট হচ্ছে”, “চাষী বাঁচছে না”। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি শুধুই বাজারের? নাকি এর গভীরে রয়েছে নীতিগত ও প্রশাসনিক কাঠামোগত দুর্বলতা?

বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের লবণ খাত দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে উৎপাদনকারী কৃষকের চেয়ে শিল্প ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে লবণকে কৃষিপণ্য হিসেবে নয়, অনেকাংশে শিল্প কাঁচামাল হিসেবে দেখা হয়েছে। আর এখানেই মূল দ্বন্দ্বের শুরু।

বর্তমান কাঠামোতে দেখা যায়;

১। লবণ চাষী বা কৃষক শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে,

২। লবণের উৎপাদন ও চাহিদা নিরূপণ শিল্প মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে,

৩। লবণ রিফাইনারি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে,

৪। সর্বজনীন আয়োডিন যুক্ত লবণ (ইউএসআই) কার্যক্রমও শিল্প মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীক,

৫। এমনকি লবণ আমদানিও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে পরিচালিত হয়।

অর্থাৎ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার, আমদানি, সবকিছু একই প্রশাসনিক ছাতার নিচে। এর ফলে নীতি নির্ধারণে স্বার্থের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ একই প্রতিষ্ঠান যখন কৃষকের অভিভাবক, শিল্পের পরিচালক এবং আমদানির সুপারিশকারী, তখন কৃষকের স্বার্থ প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে।

লবণ চাষীরা মূলত কৃষক। তারা প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে উৎপাদন করেন। তাদের বাস্তবতা ধান, মাছ বা সবজি চাষীর বাস্তবতার মতোই, জলবায়ু ঝুঁকি, মৌসুমি ক্ষতি, উৎপাদন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী, ঋণ সংকট ও বাজার অনিশ্চয়তা। অথচ কৃষি খাতের জন্য যে ধরনের নীতিগত সহায়তা থাকে, ন্যায্য মূল্য, ভর্তুকি, কৃষি বীমা, উৎপাদন তথ্যভান্ডার, গবেষণা, সম্প্রসারণ, সেসব সুবিধা লবণ চাষীরা কাঠামোগত ভাবে খুব সীমিত আকারে পান।

তাই একটি সমন্বিত পুনর্বিন্যাস এখন সময়ের দাবি হতে পারে। সম্ভাব্য কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস;

১। লবণ চাষী ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে লবণকে কৃষিপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনলে উৎপাদন পরিকল্পনা, কৃষক নিবন্ধন, মাঠ পর্যায়ে সহায়তা ও গবেষণা আরও বাস্তব ভিত্তিক হতে পারে।

২। উৎপাদন ও চাহিদা নিরূপণে কৃষি ভিত্তিক ডাটা সিস্টেম লবণের প্রকৃত উৎপাদন, মজুদ ও চাহিদা নিরূপণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ভান্ডার না থাকলে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত আমদানির ঝুঁকি থেকেই যায়।

৩। লবণ রিফাইনারি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা রিফাইনারি মূলত শিল্প ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাত। তাই এটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকাটা যৌক্তিক। তবে কৃষক ও রিফাইনারির মধ্যে ন্যায্য মূল্য ভিত্তিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে।

৪। সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ কার্যক্রম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আয়োডিন ঘাটতি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই ইউএসআই কার্যক্রমকে জনস্বাস্থ্য নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হলে এর কার্যকারিতা বাড়তে পারে।

৫। লবণ আমদানিতে যৌথ সিদ্ধান্ত ব্যবস্থা কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আমদানি সিদ্ধান্ত হলে স্থানীয় উৎপাদন, শিল্পের চাহিদা ও বাজার স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে।

আজ বাস্তব প্রশ্ন হলো, আমরা কি লবণকে শুধুই শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে দেখবো, নাকি উপকূলীয় লাখো মানুষের জীবিকা হিসেবে দেখবো?

শুধু “লবণের দাম কম” বলে চিৎকার করলে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ সমস্যা কেবল দামের নয়; সমস্যা নীতির, কাঠামোর এবং দৃষ্টি ভঙ্গির। যতদিন পর্যন্ত লবণ চাষীকে প্রকৃত কৃষক হিসেবে মূল্যায়ন করা না হবে, ততদিন “জাত গেল” ধরনের আবেগঘন আলোচনা চলবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

বাংলাদেশের লবণ শিল্পকে টেকসই করতে হলে এখন সময় এসেছে, চিৎকারের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে কাঠামোগত সংস্কারের আলোচনায় যাওয়ার।