ঢাকা ০৫:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে করিডোর চায় চীন হেরোইন ম্যানেজ হয়ে আটা-ময়দা হয়ে যায় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারে মাদকবিরোধী র‍্যালী, মানববন্ধন, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে প্রাণহানির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর শোক হিন্দুরা মন্দিরে মূর্তি বানাবে, মুসলমানরা মসজিদ বানাবে—সমস্যা কোথায়?’ সরকার মৌলিক পরিবর্তনের দাবিকে অগ্রাহ্য করছে : শফিকুর রহমান কারা উঠল শেষ বত্রিশে, বাদ পড়ল কারা আজ পবিত্র আশুরা টেকনাফে মাছের ঘের থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার, পরিবারের দাবি পরিকল্পিত হত্যা দেশে মোট গাঁজাখোর ৬১ লাখ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে কাজ করছে সরকার: নাইক্ষ্যংছড়িতে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু লামা পৌরসভার ১১ কোটি ২৩ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা গর্জনিয়ার মাঝিরকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি : সভাপতি ফরিদ উদ্দিন রামুর হাইটুপিতে রাখাইন তরুনীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার রামুর ২৬ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষক সংকট, ব্যাহত পাঠদান

‘মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট’ কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী পাড়া: চলছে মানবপাচার ও অপহরণ

টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী পাড়া এলাকা এখন মানবপাচারের এক অঘোষিত ‘মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে এই দুটি পয়েন্ট থেকে প্রতিনিয়ত সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচার হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও রোহিঙ্গারা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মিয়ানমারের অবৈধ পণ্যের চোরাচালান।

দুর্গম পাহাড় ও প্লাস্টিকের ঘরে বন্দি জীবন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেরিন ড্রাইভ সড়কের মাত্র ১০০ ফুট পূর্বে পাহাড় ও ঘন বনাঞ্চলকে পাচারকারীরা তাদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট ছোট প্লাস্টিকের তাবু বা ঘর তৈরি করে সেখানে জড়ো করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা মানুষ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সেখানে এনে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়।

মাথাপিছু ৫০ হাজার টাকার ‘অফার’ ও অপহরণ বাণিজ্য

পাচারকারীরা মানবপাচারকে এক লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে। জানা গেছে, কোনো দালালের হাতে একজন মানুষ তুলে দিতে পারলেই নগদ ৫০ হাজার টাকা কমিশন দেয়া হয়। এই টাকার লোভে এলাকায় শুরু হয়েছে ভয়ংকর ‘অপহরণ বাণিজ্য’। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষকে ভালো কাজের কথা বলে মোবাইলে প্রলুব্ধ করে এই এলাকায় এনে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন শতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যার বেশ কিছু ভিকটিমকে পুলিশ উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও মূল হোতারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

নেপথ্যে যারা: পাচারকারী চক্রের তালিকা

বাহারছড়া ইউনিয়নে এই শক্তিশালী পাচারকারী চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী। স্থানীয়দের সাথে আলাপকরে যাদের নাম পাওয়া গেছে সে বিষয়টি নিরপেক্ষতার স্বার্থে প্রশাসনের কর্মকর্তা, মামলাসহ বিভিন্ন নথি থেকে পাওয়া গেছে এই চক্রের সক্রিয় সদস্যদের কয়েকজনের নাম। আরো কিছু অনুসন্ধান শেষে যাদের নাম শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে।

সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ২৭৩ প্রাণহানি ও নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা

সাম্প্রতিক সময়ে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে ট্রলার ডুবির ঘটনায় প্রায় ২৭৩ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। জানা গেছে, এদের অধিকাংশকেই কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী পাড়া ঘাট দিয়ে ট্রলারে তোলা হয়েছিল।
ঐ ঘটনায় বেঁচে ফিরে আসা রফিক নামের এক রোহিঙ্গা নাগরিক জানান, পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া মানুষগুলোকে বনের ভেতরে ও ট্রলারে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। অনেক সময় মুক্তিপণের দাবিতে চলে এই নির্যাতন, যা সহ্য করতে না পেরে অনেকে পথেই প্রাণ হারান।

প্রশাসনের নীরবতা ও শঙ্কা

বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্র থেকে এই দুর্গম এলাকাগুলোর দূরত্ব বেশি হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এত বড় বড় ট্র্যাজেডি আর শত শত মানুষের মৃত্যুর পরও এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বড় অভিযান বা কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে পাচারকারী চক্রটি।

টেকনাফ ও উখিয়ার সচেতন মহল মনে করেন, এই ‘অঘোষিত এয়ারপোর্ট’ দ্রুত বন্ধ করা না গেলে সমুদ্রপথে লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে এবং পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে সাধারণ মানুষ।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

‘মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট’ কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী পাড়া: চলছে মানবপাচার ও অপহরণ

আপডেট সময় : ১১:২০:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী পাড়া এলাকা এখন মানবপাচারের এক অঘোষিত ‘মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে এই দুটি পয়েন্ট থেকে প্রতিনিয়ত সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচার হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও রোহিঙ্গারা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মিয়ানমারের অবৈধ পণ্যের চোরাচালান।

দুর্গম পাহাড় ও প্লাস্টিকের ঘরে বন্দি জীবন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেরিন ড্রাইভ সড়কের মাত্র ১০০ ফুট পূর্বে পাহাড় ও ঘন বনাঞ্চলকে পাচারকারীরা তাদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট ছোট প্লাস্টিকের তাবু বা ঘর তৈরি করে সেখানে জড়ো করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আনা মানুষ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সেখানে এনে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়।

মাথাপিছু ৫০ হাজার টাকার ‘অফার’ ও অপহরণ বাণিজ্য

পাচারকারীরা মানবপাচারকে এক লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছে। জানা গেছে, কোনো দালালের হাতে একজন মানুষ তুলে দিতে পারলেই নগদ ৫০ হাজার টাকা কমিশন দেয়া হয়। এই টাকার লোভে এলাকায় শুরু হয়েছে ভয়ংকর ‘অপহরণ বাণিজ্য’। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষকে ভালো কাজের কথা বলে মোবাইলে প্রলুব্ধ করে এই এলাকায় এনে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন শতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, যার বেশ কিছু ভিকটিমকে পুলিশ উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও মূল হোতারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

নেপথ্যে যারা: পাচারকারী চক্রের তালিকা

বাহারছড়া ইউনিয়নে এই শক্তিশালী পাচারকারী চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী। স্থানীয়দের সাথে আলাপকরে যাদের নাম পাওয়া গেছে সে বিষয়টি নিরপেক্ষতার স্বার্থে প্রশাসনের কর্মকর্তা, মামলাসহ বিভিন্ন নথি থেকে পাওয়া গেছে এই চক্রের সক্রিয় সদস্যদের কয়েকজনের নাম। আরো কিছু অনুসন্ধান শেষে যাদের নাম শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে।

সম্প্রতি আন্দামান সাগরে ২৭৩ প্রাণহানি ও নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা

সাম্প্রতিক সময়ে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে ট্রলার ডুবির ঘটনায় প্রায় ২৭৩ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। জানা গেছে, এদের অধিকাংশকেই কচ্ছপিয়া ও নোয়াখালী পাড়া ঘাট দিয়ে ট্রলারে তোলা হয়েছিল।
ঐ ঘটনায় বেঁচে ফিরে আসা রফিক নামের এক রোহিঙ্গা নাগরিক জানান, পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া মানুষগুলোকে বনের ভেতরে ও ট্রলারে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। অনেক সময় মুক্তিপণের দাবিতে চলে এই নির্যাতন, যা সহ্য করতে না পেরে অনেকে পথেই প্রাণ হারান।

প্রশাসনের নীরবতা ও শঙ্কা

বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্র থেকে এই দুর্গম এলাকাগুলোর দূরত্ব বেশি হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এত বড় বড় ট্র্যাজেডি আর শত শত মানুষের মৃত্যুর পরও এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বড় অভিযান বা কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে পাচারকারী চক্রটি।

টেকনাফ ও উখিয়ার সচেতন মহল মনে করেন, এই ‘অঘোষিত এয়ারপোর্ট’ দ্রুত বন্ধ করা না গেলে সমুদ্রপথে লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে এবং পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে সাধারণ মানুষ।