ঢাকা ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ আসছেন কক্সবাজার : যাবেন টেকনাফ,কুতুবদিয়া ও পেকুয়ায় ৩ দিনের সফরে কক্সবাজার আসছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী ১ দিনের সফরে কক্সবাজার আসছেন পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ঈদগড় ইউপি নির্বাচনে সৌদি প্রবাসী মঈন উদ্দিনের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা ঘোষণা কক্সবাজারে পুলিশের বিশেষ অভিযান : গ্রেপ্তার ১০ মহেশখালীতে স্কুলছাত্রকে ডিশের ক্যাবল দিয়ে পিটিয়ে জখম করলো শিক্ষক, থানায় অভিযোগ হঠাৎ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিস্থিতি দেখতে ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক, যা বললেন রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কা, ঘটনাস্থলেই শিশুর মৃত্যু ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে মানসিক চাপ, সৌদি আরবে লোহাগাড়ার যুবকের মরদেহ উদ্ধার লোহাগাড়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় চার যুবক গ্রেপ্তার, আদালতে সোপর্দ চাকরি দেয়ার নামে কিশোর অপহরণ : উখিয়ায় মানবপাচার চক্রের ২ সদস্য গ্রেপ্তার পুলিশ সুপারের বক্তব্যের নিন্দা কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির : জেলা জজকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, কক্সবাজারে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত হত্যা মামলার আসামি মুহুরি পাড়ার ছৈয়দ আলম গ্রেপ্তার কক্সবাজারে সাইবার মামলায় ৬ বিদেশির ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
রামু সহিংসতার ১৩ বছর

“মনে যে দাগ কেটেছে, তা মুছবে কিভাবে?”

১৩ বছর আগে কক্সবাজারের রামুর আজকের রাতটা ছিল আগুন আর আতঙ্কে মোড়া। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, হঠাৎই ফেসবুকে ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগ ঘিরে জ্বলে ওঠে সহিংসতা। মুহূর্তেই শত বছরের পুরোনো বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভস্মীভূত হয় ১২টি মন্দির, পুড়ে যায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর।

১৩ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু রামুর বৌদ্ধ পল্লীর মানুষদের মুখে প্রশ্ন, “বিচার হবে তো?”

“আজও সেই রাত মনে পড়লে ঘুম ভেঙে যায়”

রামুর বৌদ্ধপল্লীর বাসিন্দা দীপক বড়ুয়া, সেদিনের বিভীষিকা বর্ণনা করতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।
তিনি বলেন, “মন্দিরে আগুন লাগার পর আমরা শিশুদের নিয়ে পালিয়েছিলাম। কে কারে সাহায্য করবে, সবাই প্রাণ বাঁচানোর জন্য দৌড়াচ্ছিল। আজও সেই রাত মনে পড়লে ঘুম ভেঙে যায়।”

তার সঙ্গে বসা আরেকজন স্থানীয় এক নারী বলেন, “আমাদের প্রজন্ম মন্দিরের পাশে বড় হয়েছে। সেই মন্দিরগুলোকে এক রাতেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো। অথচ এতদিনেও এর বিচার আমরা চোখে দেখতে পারলাম না।”

মামলা অনেক, বিচার নেই

হামলার পর রামু, উখিয়া ও টেকনাফে মোট ১৯টি মামলা হয়। এজাহারে নাম ছিল ৩৭৫ জনের; আর তদন্তে আসামি করা হয় আরও ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে।

কিন্তু তদন্ত শেষে মাত্র ১৮টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা পড়ে ৯৪৫ জনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যেও আদালতে সাক্ষ্য দিতে অনীহা দেখা গেছে অনেক সাক্ষীর। অনেকে বলছেন ভয়, হুমকি আর প্রভাবশালীদের চাপ তাদের পিছিয়ে দিয়েছে।

কক্সবাজার জেলা জজ আদালতে মামলাগুলো এখনও বিচারাধীন। সরকারি কৌঁসুলি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু, আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এত বছর পরও যদি বিচার না হয়, তাহলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে স্থায়ী ভয় থেকে যাবে। তারা ভাববে, তাদের নিরাপত্তা বা অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের দায় নেই। বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে মামলার গতি হারিয়ে যাবে।”

স্থানীয়দের কণ্ঠে হতাশা

রামুর এক চায়ের দোকানে বসা প্রবীণ কৃষক ধনঞ্জয় বড়ুয়া বললেন, “আমাদের চোখের সামনে শত বছরের মন্দির পুড়ে গেল। এত মামলা হলো, কিন্তু আসামিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে দিব্যি। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু শুনে যাচ্ছি, ‘বিচার চলছে’। কিন্তু শেষটা কবে হবে কেউ জানে না।”

উৎস বড়ুয়া, যিনি তখন স্কুল পড়ুয়া ছিলেন, এখন চাকরি করেন। তিনি বলেন, “বিচার যদি না হয়, তাহলে আমরা কী শিখব? ছোটবেলায় দেখেছি কিভাবে মন্দির পুড়েছে। এখন বড় হয়ে দেখছি বিচার হচ্ছে না। এটা সমাজে ভুল বার্তা দেয়।”

তদন্ত প্রতিবেদন ফাঁস, সাক্ষীদের ভয়

সরকারি পর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটির একটি প্রতিবেদন ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর থেকে সাক্ষীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। অনেকেই ভয়ে আদালতে যেতে চাননি। স্থানীয় বৌদ্ধ নেতাদের অভিযোগ, এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করেছে।

স্থানীয় এক বয়স্ক বাসিন্দা অমৃত বড়ুয়া বলেন, “আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম আদালতে গিয়ে সত্য বলব। কিন্তু যখন শুনলাম কারা কারা আসামি হয়েছে, তখন ভয় পেলাম। এদের অনেকে প্রভাবশালী, মুখ খুলি তো কালকেই বাড়িঘর আবার জ্বালিয়ে দেবে।”

একজন যুবক সাক্ষী, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বললেন, “তদন্তের রিপোর্ট ফাঁস হওয়ার পর থেকে আমরা হুমকি পাচ্ছি। রাতে অপরিচিত লোক এসে ভয় দেখায়। এমন পরিস্থিতিতে কে আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দেবে?”

আরেকজন নারী সাক্ষী ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, “আমাদের চোখের সামনে মন্দির জ্বালিয়ে দিল, ঘর ভেঙে দিল। অথচ ভয় আর হুমকির কারণে আমরা আদালতে গিয়ে কথাই বলতে পারি না। এটা কেমন বিচার?”

সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী অর্পণ বড়ুয়া মনে করেন, এই ভীতি ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি মামলার অগ্রগতি ব্যাহত করছে এবং ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাকে ক্রমেই ক্ষীণ করে দিচ্ছে।

রামুর ক্ষত আজও তাজা

১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষত শুকায়নি। নতুন করে মন্দির নির্মাণ হয়েছে, ঘরবাড়িও আবার উঠেছে। কিন্তু মানুষের মনে ভয় আর অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে।

স্থানীয় জয়া বড়ুয়া আক্ষেপ করে বললেন,“ঘরবাড়ি বানানো যায়, মন্দিরও বানানো যায়, কিন্তু মনে যে দাগ কেটেছে, তা মুছবে কিভাবে?”

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ আসছেন কক্সবাজার : যাবেন টেকনাফ,কুতুবদিয়া ও পেকুয়ায়

রামু সহিংসতার ১৩ বছর

“মনে যে দাগ কেটেছে, তা মুছবে কিভাবে?”

আপডেট সময় : ০৫:১৯:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫

১৩ বছর আগে কক্সবাজারের রামুর আজকের রাতটা ছিল আগুন আর আতঙ্কে মোড়া। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, হঠাৎই ফেসবুকে ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগ ঘিরে জ্বলে ওঠে সহিংসতা। মুহূর্তেই শত বছরের পুরোনো বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভস্মীভূত হয় ১২টি মন্দির, পুড়ে যায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর।

১৩ বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু রামুর বৌদ্ধ পল্লীর মানুষদের মুখে প্রশ্ন, “বিচার হবে তো?”

“আজও সেই রাত মনে পড়লে ঘুম ভেঙে যায়”

রামুর বৌদ্ধপল্লীর বাসিন্দা দীপক বড়ুয়া, সেদিনের বিভীষিকা বর্ণনা করতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।
তিনি বলেন, “মন্দিরে আগুন লাগার পর আমরা শিশুদের নিয়ে পালিয়েছিলাম। কে কারে সাহায্য করবে, সবাই প্রাণ বাঁচানোর জন্য দৌড়াচ্ছিল। আজও সেই রাত মনে পড়লে ঘুম ভেঙে যায়।”

তার সঙ্গে বসা আরেকজন স্থানীয় এক নারী বলেন, “আমাদের প্রজন্ম মন্দিরের পাশে বড় হয়েছে। সেই মন্দিরগুলোকে এক রাতেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো। অথচ এতদিনেও এর বিচার আমরা চোখে দেখতে পারলাম না।”

মামলা অনেক, বিচার নেই

হামলার পর রামু, উখিয়া ও টেকনাফে মোট ১৯টি মামলা হয়। এজাহারে নাম ছিল ৩৭৫ জনের; আর তদন্তে আসামি করা হয় আরও ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে।

কিন্তু তদন্ত শেষে মাত্র ১৮টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা পড়ে ৯৪৫ জনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যেও আদালতে সাক্ষ্য দিতে অনীহা দেখা গেছে অনেক সাক্ষীর। অনেকে বলছেন ভয়, হুমকি আর প্রভাবশালীদের চাপ তাদের পিছিয়ে দিয়েছে।

কক্সবাজার জেলা জজ আদালতে মামলাগুলো এখনও বিচারাধীন। সরকারি কৌঁসুলি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু, আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এত বছর পরও যদি বিচার না হয়, তাহলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে স্থায়ী ভয় থেকে যাবে। তারা ভাববে, তাদের নিরাপত্তা বা অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের দায় নেই। বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে মামলার গতি হারিয়ে যাবে।”

স্থানীয়দের কণ্ঠে হতাশা

রামুর এক চায়ের দোকানে বসা প্রবীণ কৃষক ধনঞ্জয় বড়ুয়া বললেন, “আমাদের চোখের সামনে শত বছরের মন্দির পুড়ে গেল। এত মামলা হলো, কিন্তু আসামিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে দিব্যি। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু শুনে যাচ্ছি, ‘বিচার চলছে’। কিন্তু শেষটা কবে হবে কেউ জানে না।”

উৎস বড়ুয়া, যিনি তখন স্কুল পড়ুয়া ছিলেন, এখন চাকরি করেন। তিনি বলেন, “বিচার যদি না হয়, তাহলে আমরা কী শিখব? ছোটবেলায় দেখেছি কিভাবে মন্দির পুড়েছে। এখন বড় হয়ে দেখছি বিচার হচ্ছে না। এটা সমাজে ভুল বার্তা দেয়।”

তদন্ত প্রতিবেদন ফাঁস, সাক্ষীদের ভয়

সরকারি পর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটির একটি প্রতিবেদন ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর থেকে সাক্ষীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। অনেকেই ভয়ে আদালতে যেতে চাননি। স্থানীয় বৌদ্ধ নেতাদের অভিযোগ, এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করেছে।

স্থানীয় এক বয়স্ক বাসিন্দা অমৃত বড়ুয়া বলেন, “আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম আদালতে গিয়ে সত্য বলব। কিন্তু যখন শুনলাম কারা কারা আসামি হয়েছে, তখন ভয় পেলাম। এদের অনেকে প্রভাবশালী, মুখ খুলি তো কালকেই বাড়িঘর আবার জ্বালিয়ে দেবে।”

একজন যুবক সাক্ষী, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বললেন, “তদন্তের রিপোর্ট ফাঁস হওয়ার পর থেকে আমরা হুমকি পাচ্ছি। রাতে অপরিচিত লোক এসে ভয় দেখায়। এমন পরিস্থিতিতে কে আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দেবে?”

আরেকজন নারী সাক্ষী ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, “আমাদের চোখের সামনে মন্দির জ্বালিয়ে দিল, ঘর ভেঙে দিল। অথচ ভয় আর হুমকির কারণে আমরা আদালতে গিয়ে কথাই বলতে পারি না। এটা কেমন বিচার?”

সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী অর্পণ বড়ুয়া মনে করেন, এই ভীতি ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি মামলার অগ্রগতি ব্যাহত করছে এবং ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাকে ক্রমেই ক্ষীণ করে দিচ্ছে।

রামুর ক্ষত আজও তাজা

১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষত শুকায়নি। নতুন করে মন্দির নির্মাণ হয়েছে, ঘরবাড়িও আবার উঠেছে। কিন্তু মানুষের মনে ভয় আর অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে।

স্থানীয় জয়া বড়ুয়া আক্ষেপ করে বললেন,“ঘরবাড়ি বানানো যায়, মন্দিরও বানানো যায়, কিন্তু মনে যে দাগ কেটেছে, তা মুছবে কিভাবে?”