ঢাকা ০৫:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মুজিববর্ষ উদযাপনে খরচ ৯৮৩ কোটি টাকা : সংসদে অর্থমন্ত্রী সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক  ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ ১৭ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা জুলাইয়ের আগে যা দেখেছিলাম জুলাইয়ের পরেও তা দেখি: সারজিস বৃষ্টি কমবে কবে, জানাল আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে আজ থেকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক টেকনাফে ২০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে পড়ে আহত বন্য মা হাতিটির মৃত্যু সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই টেকনাফে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩৮০ পরিবারকে জরুরি সহায়তা দিচ্ছে যুব সংগঠন কক্সবাজারের বন্যার্তদের মাঝে জেলা ছাত্রদলের শুকনো খাবার ও সুপেয় পানি বিতরণ পাহাড়ধস : রান্না ঘরে প্রাণ গেলো কলাতলীর গৃহবধূ রোজিনার চকরিয়া-মাতামুহুরীতে খাবার আর বিশুদ্ধ পানির সংকট পেকুয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু ইয়াবা লুট চক্রের রবিউল ইসলাম বাবুর নতুন কৌশল! তথ্য উদ্ধারকারী জিল্লুর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের চেষ্টা : স্বীকার করলেন ওসি চকরিয়ার কৈয়ারবিলে বন্যার পানিতে কিশোর নিখোঁজ

অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাতের ডাক দেওয়ার ঘোষণা: গণতন্ত্রের সঙ্গে কতটা সাংঘর্ষিক?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রকাশ্যে “অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাত” করার ঘোষণা। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের বক্তব্য কি শুধুই রাজনৈতিক আবেগ, নাকি এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে?

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের ভোটাধিকার, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তর। বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্ট ভাবে নির্ধারণ করে যে, রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তন হবে নির্বাচনের মাধ্যমে, আইনের শাসনের ভিতরে থেকে। এই কাঠামোর বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগ বা অভ্যুত্থানের আহ্বান গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই সাংঘর্ষিক।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, গণ-অভ্যুত্থান সাধারণত তখনই ঘটে, যখন দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, অবিচার এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা একটি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আরব বসন্ত, বা রাশিয়া বিপ্লব এসব ঘটনা ছিল আকস্মিক কোনো ঘোষণা নয়; বরং দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের ফলাফল। সুতরাং, অভ্যুত্থান কখনোই কেবল “ঘোষণা দিয়ে” ঘটানো যায় না, এটি বাস্তবতার কঠিন প্রেক্ষাপটে জন্ম নেয়।

এখানেই আসে আইনের প্রশ্ন। একটি নির্বাচিত সরকারকে সহিংস বা অসাংবিধানিক উপায়ে উৎখাত করার আহ্বান আইনগতভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পেনাল কোড ১৮৬০ এর ১২৪এ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা বিদ্রোহ উস্কে দেওয়া রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি স্পেশাল পাওয়ার অ্যক্ট ১৯৭৪ এ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে দণ্ডনীয়।

তবে গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা, পরিবর্তনের দাবি বা আন্দোলন, এসব সম্পূর্ণ বৈধ। পার্থক্যটি এখানেই: একটি হচ্ছে সাংবিধানিক অধিকারের চর্চা, অন্যটি হচ্ছে সেই কাঠামো ভেঙে ফেলার আহ্বান।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়, “অভ্যুত্থানের ঘোষণা” কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামাজিক শান্তির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বারবার অভ্যুত্থানের হুমকি একটি জাতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করে।

অতএব, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে, এটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পথ যদি অসাংবিধানিক ও সহিংসতার দিকে মোড় নেয়, তবে তা কেবল সরকারের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শেষ কথা হলো, গণতন্ত্রে ক্ষমতা আসে ব্যালটের মাধ্যমে, ব্যারিকেডের মাধ্যমে নয়। এই মৌলিক সত্যকে অস্বীকার করলে, ইতিহাসের ভুল গুলোই পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

মুজিববর্ষ উদযাপনে খরচ ৯৮৩ কোটি টাকা : সংসদে অর্থমন্ত্রী

অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাতের ডাক দেওয়ার ঘোষণা: গণতন্ত্রের সঙ্গে কতটা সাংঘর্ষিক?

আপডেট সময় : ১১:৪২:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, প্রকাশ্যে “অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার উৎখাত” করার ঘোষণা। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের বক্তব্য কি শুধুই রাজনৈতিক আবেগ, নাকি এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে?

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের ভোটাধিকার, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার হস্তান্তর। বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্ট ভাবে নির্ধারণ করে যে, রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তন হবে নির্বাচনের মাধ্যমে, আইনের শাসনের ভিতরে থেকে। এই কাঠামোর বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগ বা অভ্যুত্থানের আহ্বান গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই সাংঘর্ষিক।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, গণ-অভ্যুত্থান সাধারণত তখনই ঘটে, যখন দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন, অবিচার এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা একটি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আরব বসন্ত, বা রাশিয়া বিপ্লব এসব ঘটনা ছিল আকস্মিক কোনো ঘোষণা নয়; বরং দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের ফলাফল। সুতরাং, অভ্যুত্থান কখনোই কেবল “ঘোষণা দিয়ে” ঘটানো যায় না, এটি বাস্তবতার কঠিন প্রেক্ষাপটে জন্ম নেয়।

এখানেই আসে আইনের প্রশ্ন। একটি নির্বাচিত সরকারকে সহিংস বা অসাংবিধানিক উপায়ে উৎখাত করার আহ্বান আইনগতভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। পেনাল কোড ১৮৬০ এর ১২৪এ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা বিদ্রোহ উস্কে দেওয়া রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি স্পেশাল পাওয়ার অ্যক্ট ১৯৭৪ এ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে দণ্ডনীয়।

তবে গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা, পরিবর্তনের দাবি বা আন্দোলন, এসব সম্পূর্ণ বৈধ। পার্থক্যটি এখানেই: একটি হচ্ছে সাংবিধানিক অধিকারের চর্চা, অন্যটি হচ্ছে সেই কাঠামো ভেঙে ফেলার আহ্বান।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়, “অভ্যুত্থানের ঘোষণা” কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামাজিক শান্তির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বারবার অভ্যুত্থানের হুমকি একটি জাতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করে।

অতএব, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে, এটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পথ যদি অসাংবিধানিক ও সহিংসতার দিকে মোড় নেয়, তবে তা কেবল সরকারের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শেষ কথা হলো, গণতন্ত্রে ক্ষমতা আসে ব্যালটের মাধ্যমে, ব্যারিকেডের মাধ্যমে নয়। এই মৌলিক সত্যকে অস্বীকার করলে, ইতিহাসের ভুল গুলোই পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।