ছেলেকে হারিয়ে সেই স্বপ্নের নৌযানে আর ঘরে ফেরা হলো না পরিবারের। প্রায় দেড় মাস কক্সবাজারে অবস্থানের পর আজ শুক্রবার (১০ অক্টোবর) নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন জন এডওয়ার্ড, বেলা ও রালফ। তবে সমুদ্রপথে নয়, ফিরছেন আকাশপথে।
সমুদ্রযাত্রার স্বপ্ন থামল যেভাবে
জন এডওয়ার্ডের পরিবারের কক্সবাজারে আসার গল্পটা অন্য রকম। ২০২৪ সালে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রপথে পৃথিবী ঘুরে দেখার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বেছে নেন কক্সবাজারকে। স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় শহরের এসএমপাড়া এলাকায় তৈরি হতে থাকে ‘আইল্যান্ড গার্ল’।
নাজিরারটেকের বাসিন্দা দিসরুল ইসলাম রুবেলের ভাষ্য, প্রায় দুই বছর ধরে চলে নৌযানটির নির্মাণকাজ। এতে অন্তত এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি তার।
দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল নৌযানটি। এতে ছিল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘরসহ নানা সুবিধা। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রপথে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজন করেছিলেন জন এডওয়ার্ড।
কিন্তু স্বপ্নের সেই নৌযানই একসময় হয়ে ওঠে বিপদের কারণ। এর আগেও বৈরী আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’। সোনাদিয়ায় আশ্রয় নেওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা ও মালামাল লুটের ঘটনাও ঘটেছিল। এরপর নৌযান মেরামত করে আবার সমুদ্রে নামেন তারা। শেষ পর্যন্ত ২৫ আগস্টের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হয় আলবার্টকে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় পরিবারটি। নাজিরারটেক থেকে কিছু দূরে মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে নৌযানটি। একপর্যায়ে চারজনই সাগরে পড়ে যান।
২৪ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি নিখোঁজ নিউজিল্যান্ডের কিশোরের
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে কক্সবাজারের একটি শ্মশানে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও পরিবারের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।
দেড় মাসের আশ্রয়, এবার দেশে ফেরা
নৌকাডুবির সময় পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কিছু নথি হারিয়ে যায়। ফলে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করাও সহজ ছিল না। তাসনীম জাহান জানান, বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের সঙ্গে অনলাইন ও ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নৌকাডুবির পর উদ্ধার করা পরিবারের সদস্যদের প্রথমে কোস্ট গার্ডের কক্সবাজার স্টেশনে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁদের দেখভালের দায়িত্ব নেয় জেলা প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানটি এখনো কোস্ট গার্ডের হেফাজতে রয়েছে। নৌযান থেকে উদ্ধার করা কিছু জিনিসপত্র পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আগেও বিপদে পড়েছিল পরিবারটি
১০ এপ্রিল কোস্টগার্ড পরিবারটিকে উদ্ধার করে। অভিযান চালিয়ে অধিকাংশ মালামালও উদ্ধার করা হয়। পরে নৌযানটি ডকইয়ার্ডে নিয়ে মেরামত করা হয়েছিল।
বাঁকখালীতে পড়ে আছে ‘আইল্যান্ড গার্ল’
একসময় ৪ জনকে নিয়ে পৃথিবী ঘুরে দেখার যে স্বপ্ন শুরু হয়েছিল কক্সবাজারে, তার শেষ স্মৃতি হয়ে রইল বাঁকখালী নদীতে পড়ে থাকা ‘আইল্যান্ড গার্ল’।
বিশেষ প্রতিবেদক: 





















