সারাদেশে প্রকাশিত ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে কক্সবাজারে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসির তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। জেলার তিনটি শিক্ষাবোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দাখিলে পাসের হার ৭৪ শতাংশ, ভোকেশনালে ৬৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং এসএসসিতে পাসের হার ৫৭ দশমিক ০৯ শতাংশ।
জেলা শিক্ষা অফিসের পাঠানো এসএসসি, দাখিল ও ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলাফল বিবরণী অনুযায়ী, তিন শিক্ষাবোর্ডে এবার মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ১০৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে এসএসসিতে ৮৯৯ জন, দাখিলে ১৬২ জন এবং ভোকেশনালে ৪৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, এবারে কক্সবাজার জেলায় এসএসসি, দাখিল ও ভোকেশনাল এই তিন পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষার্থীরা। এরপর রয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ভোকেশনাল শিক্ষার্থীরা। সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।
এসএসসি: পাসের হার ৫৭.০৯ শতাংশ:
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় কক্সবাজার জেলায় গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৭ দশমিক ০৯ শতাংশ। জেলার ১৪৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৮ হাজার ১২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১০ হাজার ৩৪৯ জন। এ বছর জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৯৯ জন শিক্ষার্থী।
জেলা পর্যায়ের ফলাফল অনুযায়ী, এবার কক্সবাজার থেকে মোট ১৮ হাজার ২২৩ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ছিলেন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১৮ হাজার ১২৮ জন।
বিভাগভিত্তিক এসএসসি ফলাফল
বিজ্ঞান বিভাগে সাফল্য সবচেয়ে বেশি:
এবার কক্সবাজারে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ বিভাগে পাসের হার ৮৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগ থেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৯৯ জনের মধ্যে ৮৩২ জন।
বিজ্ঞান বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ৮৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। মেয়েদের ক্ষেত্রে এ হার ৮৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলায় পাওয়া মোট জিপিএ-৫-এর প্রায় ৯৩ শতাংশই এসেছে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। ফলে জেলার সামগ্রিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪১.৫৮ শতাংশ:
অন্যদিকে এবারের এসএসসি ফলাফলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে মানবিক বিভাগের ফলাফল। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ মানবিক বিভাগের অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
মানবিক বিভাগ থেকে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ২২ জন শিক্ষার্থী।
তবে এ বিভাগেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ভালো ফল করেছে। মানবিক বিভাগে মেয়েদের পাসের হার ৪৩ দশমিক ০৭ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের পাসের হার ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৫৬.৬৭ শতাংশ:
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে কক্সবাজার জেলার পাসের হার ৫৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এ বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪৫ জন শিক্ষার্থী।
এ বিভাগেও মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। মেয়েদের পাসের হার ৬০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের পাসের হার ৫৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।
এসএসসিতে মেয়েরা সামান্য এগিয়ে:
লিঙ্গভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণেও কক্সবাজারে মেয়েদের সামান্য এগিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া গেছে।
এবার জেলায় মেয়েদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ১৯ শতাংশ। ছেলেদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েরা এগিয়ে। জেলায় জিপিএ-৫ পাওয়া ৮৯৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫১১ জন মেয়ে এবং ৩৮৮ জন ছেলে।
সামগ্রিকভাবে এসএসসির ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগের শক্তিশালী ফলাফল যেমন ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে, তেমনি মানবিক বিভাগের দুর্বল ফলাফল শিক্ষাক্ষেত্রে বিভাগভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।
বিশেষ করে মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪১ দশমিক ৫৮ শতাংশ হওয়ায় এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফলাফল নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছয়জনেরও বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে না পারার বিষয়টি জেলার শিক্ষার সামগ্রিক মান, বিভাগভিত্তিক বৈষম্য এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
দাখিল: পাসের হার ৭৪ শতাংশ:
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় কক্সবাজার জেলায় সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা। জেলায় দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৭৪ শতাংশ।
জেলা শিক্ষা অফিসের ফলাফল বিবরণী অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলার ১৪৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মোট ৬ হাজার ৯৯৩ জন শিক্ষার্থী এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৫ হাজার ১৭৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ১ হাজার ৮১৮ জন।
দাখিলে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬২ জন শিক্ষার্থী।
দাখিলে এসএসসির চেয়ে পাসের হার ১৬.৯১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি:
কক্সবাজারে এবারের এসএসসি ও দাখিলের ফলাফল তুলনা করলে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। এসএসসিতে পাসের হার যেখানে ৫৭ দশমিক ০৯ শতাংশ, সেখানে দাখিলে পাসের হার ৭৪ শতাংশ।
অর্থাৎ এসএসসির তুলনায় দাখিলে পাসের হার ১৬ দশমিক ৯১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
তিন শিক্ষাবোর্ডের ফলাফলের মধ্যে এটিই কক্সবাজার জেলার সর্বোচ্চ পাসের হার।
দাখিলে মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হওয়ায় জেলার সামগ্রিক ফলাফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সাফল্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
দাখিলে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬২ জন:
দাখিল পরীক্ষায় এবার কক্সবাজার থেকে ১৬২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে এসএসসির তুলনায় এটি কম হলেও মোট পরীক্ষার্থীর অনুপাতে দাখিলের পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফার ভাষ্য অনুযায়ী, তিন পরীক্ষার মধ্যে দাখিল পরীক্ষার্থীদের ফলাফল এবার সবচেয়ে ভালো হয়েছে।
ভোকেশনাল: পাসের হার ৬৫.৬৯ শতাংশ:
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের ভোকেশনাল পরীক্ষায়ও কক্সবাজারে এসএসসির তুলনায় ভালো ফলাফল হয়েছে। জেলায় ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাসের হার ৬৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের ২৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মোট ১ হাজার ৪৭২ জন শিক্ষার্থী ভোকেশনাল পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৯৬৭ জন। অকৃতকার্য হয়েছে ৫০৫ জন।
এবার ভোকেশনাল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৩ জন শিক্ষার্থী।
এসএসসির চেয়ে ভোকেশনালে পাসের হার ৮.৬০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি:
কক্সবাজারে ভোকেশনাল পরীক্ষার ফলাফলও এসএসসির তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। এসএসসিতে পাসের হার ৫৭ দশমিক ০৯ শতাংশ হলেও ভোকেশনালে পাসের হার ৬৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
অর্থাৎ এসএসসির তুলনায় ভোকেশনালে পাসের হার ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
তবে দাখিলের তুলনায় ভোকেশনালের পাসের হার ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ পয়েন্ট কম।
ভোকেশনালে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৩ জন
কারিগরি শিক্ষার এ ধারায় এবার ৪৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। মোট পরীক্ষার্থীর তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলেও পাসের হারে ভোকেশনাল শিক্ষার্থীরা এসএসসির শিক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে এবারের ফলাফলে কক্সবাজারে একদিকে দাখিল ও ভোকেশনালে তুলনামূলক ভালো পাসের হার যেমন স্বস্তি দিয়েছে, অন্যদিকে এসএসসির মানবিক বিভাগের দুর্বল ফলাফল এবং সামগ্রিক পাসের হার শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















