ঢাকা ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Scars Still Fresh, Yet Flood Victims in Chakaria Strive to Rebuild Their Lives এখনো মুছেনি ক্ষত, তবুও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্ঠায় চকরিয়ার বন্যা দুর্গতরা রোহিঙ্গা সংকটে নতুন উদ্বেগ: মালয়েশিয়ার নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ বিবৃতি কেরানীগঞ্জে ইয়াবা তৈরির ‘কারখানা’, ঢাকাসহ আশপাশে চলত সরবরাহ লোহাগাড়ায় মন্দির সংলগ্ন পুকুর থেকে তবলা বাদক অরুণ জলদাশের মরদেহ উদ্ধার টেকনাফে রাখাইন থেকে আসা রোহিঙ্গাবাহী নৌকাডুবি, উদ্ধার ১৮ নতুন দায়িত্বে ৩ মন্ত্রী ‘You have your home! We miss our home!’: মার্কিন বিশেষ দূতের সামনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আকুতি নতুন বাহারছড়ার মোস্তাক আহম্মদ আর নেই : জানাজা বাদ আছর ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ৫ আগস্ট রাজধানীতে মহাসমাবেশ করবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের নতুন মহাপরিচালক ড. কামরুজ্জামান সিনহা হত্যা মামলা: ছয় বছর পরও আপিল বিভাগে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ আটক যুবক কচ্ছপিয়া ইউপি চেয়ারম্যান নোমানের গাড়িচালক দাবি স্থানীয়দের হলদিয়াপালং যুবদলের কমিটি বিতর্ক: সাত সদস্যের কমিটিতে মাদক মামলার আসামি!

রোহিঙ্গা সংকটে নতুন উদ্বেগ: মালয়েশিয়ার নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ বিবৃতি

মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর সম্ভাব্য উদ্যোগ এবং দেশটিতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক ও নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিকত্ব অধিকার, রাষ্ট্রহীনতা এবং শরণার্থী সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা। সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী হতে পারে এবং তাদের জীবন ও নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

৩১ জুলাই প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে Nationality for All, Institute on Statelessness and Inclusion, Global Movement Against Statelessness, Asia Pacific Refugee Rights Network এবং Statelessness and Dignified Citizenship Coalition Asia Pacific মালয়েশিয়া সরকার, ইউএনএইচসিআর, আসিয়ান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মালয়েশিয়া সরকার ইউএনএইচসিআরের নতুন রোহিঙ্গা নিবন্ধন কার্যক্রম স্থগিত করেছে, জোরপূর্বক উচ্ছেদের পর ১১০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করেছে এবং দেশটিতে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি মালয়েশিয়া সরকার মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার এবং বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এই ঘোষণার পরই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও শরণার্থী অধিকার সংগঠনগুলো তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারে এখনো রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল হয়নি, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা বা প্রত্যাবর্তনের পর সুরক্ষার কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগকে তারা ‘অকাল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মনে করছে।

‘গণহত্যার ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি’

সংস্থাগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ এখনো বহাল রয়েছে। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করেছে এবং তাদের রাষ্ট্রহীন করে তুলেছে।

নাগরিকত্বহীনতার ফলে রোহিঙ্গারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আইনি সুরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক কাঠামোই পরবর্তীতে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির পথ তৈরি করেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

সংস্থাগুলোর মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এখনো বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আইনি কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো তাদের গণহত্যা, নিপীড়ন, নির্বিচার আটক, নির্যাতন এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন

যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আইনের নন-রিফাউলমেন্ট (non-refoulement) নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নীতির অধীনে কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

যদিও মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য নয়, তবুও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দেশটির কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে সংস্থাগুলো উল্লেখ করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন বিচারাধীন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক জান্তার সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৈরী পরিবেশ

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অনলাইন ঘৃণাচারণ, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার, হয়রানি এবং বৈষম্য উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১০০ জন রোহিঙ্গা পরিবার বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, একাধিক বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক রোহিঙ্গা গ্রেপ্তার ও দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন আটককেন্দ্রে পাঠানোর আশঙ্কায় রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বৈরী পরিবেশের কারণে অনেক রোহিঙ্গা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ, সুরক্ষা চাওয়া, নির্যাতনের অভিযোগ করা বা জনসমক্ষে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। দৃশ্যমান হওয়াটাই অনেকের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

মালয়েশিয়ার নতুন Dokumen Pendaftaran Pelarian (DPP) নিবন্ধন ব্যবস্থা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সংস্থাগুলোর মতে, এই ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি, যোগ্যতার মানদণ্ড, আপিল প্রক্রিয়া, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং তথ্য সুরক্ষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এই ব্যবস্থা যদি কেবল রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করে কিন্তু কোনো আইনি মর্যাদা, কাজের সুযোগ, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত না করে, তবে তা রাষ্ট্রহীনতার সংকটকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা দেশ। কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের আলোচনা এবং বাংলাদেশ থেকে বৃহৎ পরিসরে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের ইঙ্গিত রোহিঙ্গা সংকটকে নতুন করে আঞ্চলিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। কিন্তু মিয়ানমারে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের নিশ্চয়তা ছাড়া বড় পরিসরে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ বাস্তবসম্মত নয়।

আসিয়ানের ভূমিকা

যৌথ বিবৃতিতে আসিয়ানের প্রতিও গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানানো হয়েছে। সংস্থাগুলোর মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো আঞ্চলিক সম্পৃক্ততায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং তাদের প্রতিনিধিদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সামরিক জান্তাকে বৈধতা দেয় বা প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ আছে বলে ধারণা তৈরি করে এমন কোনো আঞ্চলিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কী দাবি জানিয়েছে সংস্থাগুলো

যৌথ বিবৃতিতে মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা স্থগিত, ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধন কার্যক্রম পুনরায় চালু, নির্বিচার আটক ও জোরপূর্বক উচ্ছেদ বন্ধ, ঘৃণাচারণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে ইউএনএইচসিআরের প্রতি সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার এবং আসিয়ানের প্রতি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অধিকার পুনর্বহালকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান কেবল প্রত্যাবাসনের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, স্বাধীন চলাচল, আইনি সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। মিয়ানমারে সেই মৌলিক শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর যেকোনো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হবে।

ট্যাগ :

Scars Still Fresh, Yet Flood Victims in Chakaria Strive to Rebuild Their Lives

রোহিঙ্গা সংকটে নতুন উদ্বেগ: মালয়েশিয়ার নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ বিবৃতি

আপডেট সময় : ০১:৪২:১১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর সম্ভাব্য উদ্যোগ এবং দেশটিতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক প্রশাসনিক ও নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিকত্ব অধিকার, রাষ্ট্রহীনতা এবং শরণার্থী সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা। সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির পরিপন্থী হতে পারে এবং তাদের জীবন ও নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

৩১ জুলাই প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে Nationality for All, Institute on Statelessness and Inclusion, Global Movement Against Statelessness, Asia Pacific Refugee Rights Network এবং Statelessness and Dignified Citizenship Coalition Asia Pacific মালয়েশিয়া সরকার, ইউএনএইচসিআর, আসিয়ান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মালয়েশিয়া সরকার ইউএনএইচসিআরের নতুন রোহিঙ্গা নিবন্ধন কার্যক্রম স্থগিত করেছে, জোরপূর্বক উচ্ছেদের পর ১১০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করেছে এবং দেশটিতে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি মালয়েশিয়া সরকার মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার এবং বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এই ঘোষণার পরই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও শরণার্থী অধিকার সংগঠনগুলো তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারে এখনো রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল হয়নি, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা বা প্রত্যাবর্তনের পর সুরক্ষার কোনো বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগকে তারা ‘অকাল ও ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মনে করছে।

‘গণহত্যার ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি’

সংস্থাগুলো বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ এখনো বহাল রয়েছে। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করেছে এবং তাদের রাষ্ট্রহীন করে তুলেছে।

নাগরিকত্বহীনতার ফলে রোহিঙ্গারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আইনি সুরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক কাঠামোই পরবর্তীতে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির পথ তৈরি করেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

সংস্থাগুলোর মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এখনো বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আইনি কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো তাদের গণহত্যা, নিপীড়ন, নির্বিচার আটক, নির্যাতন এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন

যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আইনের নন-রিফাউলমেন্ট (non-refoulement) নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নীতির অধীনে কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

যদিও মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের সদস্য নয়, তবুও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দেশটির কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে সংস্থাগুলো উল্লেখ করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন বিচারাধীন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সামরিক জান্তার সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৈরী পরিবেশ

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অনলাইন ঘৃণাচারণ, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার, হয়রানি এবং বৈষম্য উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১০০ জন রোহিঙ্গা পরিবার বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, একাধিক বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক রোহিঙ্গা গ্রেপ্তার ও দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন আটককেন্দ্রে পাঠানোর আশঙ্কায় রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বৈরী পরিবেশের কারণে অনেক রোহিঙ্গা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ, সুরক্ষা চাওয়া, নির্যাতনের অভিযোগ করা বা জনসমক্ষে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। দৃশ্যমান হওয়াটাই অনেকের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন

মালয়েশিয়ার নতুন Dokumen Pendaftaran Pelarian (DPP) নিবন্ধন ব্যবস্থা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সংস্থাগুলোর মতে, এই ব্যবস্থার আইনি ভিত্তি, যোগ্যতার মানদণ্ড, আপিল প্রক্রিয়া, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং তথ্য সুরক্ষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এই ব্যবস্থা যদি কেবল রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি নথিভুক্ত করে কিন্তু কোনো আইনি মর্যাদা, কাজের সুযোগ, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত না করে, তবে তা রাষ্ট্রহীনতার সংকটকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা দেশ। কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের আলোচনা এবং বাংলাদেশ থেকে বৃহৎ পরিসরে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের ইঙ্গিত রোহিঙ্গা সংকটকে নতুন করে আঞ্চলিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। কিন্তু মিয়ানমারে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের নিশ্চয়তা ছাড়া বড় পরিসরে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ বাস্তবসম্মত নয়।

আসিয়ানের ভূমিকা

যৌথ বিবৃতিতে আসিয়ানের প্রতিও গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানানো হয়েছে। সংস্থাগুলোর মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো আঞ্চলিক সম্পৃক্ততায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং তাদের প্রতিনিধিদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে সামরিক জান্তাকে বৈধতা দেয় বা প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ আছে বলে ধারণা তৈরি করে এমন কোনো আঞ্চলিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কী দাবি জানিয়েছে সংস্থাগুলো

যৌথ বিবৃতিতে মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা স্থগিত, ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধন কার্যক্রম পুনরায় চালু, নির্বিচার আটক ও জোরপূর্বক উচ্ছেদ বন্ধ, ঘৃণাচারণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে ইউএনএইচসিআরের প্রতি সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার এবং আসিয়ানের প্রতি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অধিকার পুনর্বহালকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান কেবল প্রত্যাবাসনের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, স্বাধীন চলাচল, আইনি সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। মিয়ানমারে সেই মৌলিক শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর যেকোনো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হবে।