ঢাকা ০৮:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তামাক ছেড়ে বাদাম চাষে ঝুঁকছে চকরিয়ার কৃষকেরা: হচ্ছে লাভবান ৫৮ দিন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ: নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সভা সংসদে এমপি কাজলের প্রশ্নের উত্তরে ধর্মমন্ত্রী- হজ ফ্লাইট ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে কোনো সংশোধনী ছাড়াই সংসদে ৮ বিল পাস পেশায় রাজমিস্ত্রি তিনি, এএসপি পরিচয়ে করেন প্রেম ১৫ এপ্রিল থেকে ৫৮ দিন সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ভেঙে দেওয়া হলো বুলবুলের পরিচালনা পর্ষদ, এডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবাল সাগর ট্রলার জেলে সবই আছে, নেই শুধু তেল চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ১ স্বাস্থ্য খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির কারণে হামে শিশুদের মৃত্যু: রিজভী লালবাগ থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো শিরীন শারমিনকে ডিবি কার্যালয়ে শিরীন শারমিন, দুপুরে তোলা হবে আদালতে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হঠাৎ কক্সবাজারে কালবৈশাখীর ঝাপটা, হালকা বৃষ্টি আর তীব্র বাতাস টেকনাফে একসঙ্গে ধরা পড়ল ১০১ মণ ইলিশ, বিক্রি ৩৩ লাখে

সাগর ট্রলার জেলে সবই আছে, নেই শুধু তেল

জ্বালানি সংকটে এক অদৃশ্য স্থবিরতা বিরাজ করছে কক্সবাজার উপকূলজুড়ে। যে সাগর প্রতিদিন হাজারো জেলের জীবিকা জুগিয়ে এসেছে, সেই সাগরই আজ তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন।

মৎস্যশিকারীরা দুঃখ প্রকাশ করেন, সাগর আছে, ট্রলার আছে, মানুষ আছে। শুধু নেই তেল।

জেলা জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ১২ লাখ লিটার জ্বালানির। কিন্তু কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার ৩২টি পেট্রোল পাম্প ও ২১টি ভাসমান পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪ লাখ লিটার। এই বিশাল ঘাটতির সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে মৎস্য খাতে।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানালেন, ‘জেলায় নিবন্ধিত প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ সাগরে যেতে পারছে। বাকি ৭০ শতাংশ ট্রলার কার্যত অচল।’

শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘যারা আগে কিছু তেল মজুত করতে পেরেছিল, তাদের কয়েকটা ট্রলার এখনও চলছে। কিন্তু নতুন করে তেল না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ ট্রলার। বর্তমানে সক্রিয় ট্রলারের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ২০০টিতে। অনেক মালিক এখন সাগরে পাঠাতে চাইছেন না ট্রলার।’

সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে কক্সবাজার ফিশারিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ইঞ্জিন বন্ধ করা ট্রলার নোঙর করে আছে বাঁকখালী নদীতে। কোনো কোনো ট্রলারে ধুলো জমেছে, কোথাও জাল শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে জেলেরা এসে বসে থাকেন, ফিরে যান আবার।

জেলেদের উদ্বেগ, ‘তেল না থাকলে সাগরে যাব কীভাবে ?’

মৎস অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮১৮ জন। এর বাইরে অগণিত অনিবন্ধিত জেলেও এই পেশার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে অন্তত সাগরে যেতে পারছেন না ৫০ হাজার জেলে।

কক্সবাজারের নাজিরারটেক এলাকার জেলে মোহাম্মদ আইয়ুব হতাশা নিয়ে বললেন, ‘আগে মাসে দুই-তিনবার সাগরে যেতাম। এখন তেল নাই, বন্ধ ট্রলার। ঘরে বসে থাকি। কাজ নাই, আয়ও নাই।’

ফিশারী ঘাটে অপেক্ষমান জেলে নবী আহমদের দাবি, ‘সাগরে গেলেও এখন ভয়। ডাকাতের উপদ্রব বেড়েছে, মাছও মিলছে কম। খরচ ওঠে না। তাই অনেকে যাচ্ছে না।’

জেলে নুরুল আলম মন্তব্য করেন, ‘টানা ১০-১৫ দিন সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে যায়। এখন অনেকেই চলছে ধার-দেনা করে।’

ট্রলার মালিকেরা জানান, তেলের সংকট সবচেয়ে প্রকট উপকূলীয় উপজেলা টেকনাফে। নাফ ভিউ ফিলিং স্টেশনে দৈনিক ৪ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৫০০ লিটার ডিজেল। এই সামান্য জ্বালানি দিয়ে দূর সমুদ্রে যাওয়ার কথা ভাবাও যায় না।

জেলেরা জানান, আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে মাছের প্রজনন মৌসুমে সাগরে বন্ধ থাকবে মাছ ধরা। ফলে এখন যে অল্পসংখ্যক ট্রলার সাগরে যাচ্ছে, বন্ধ হয়ে যাবে সেগুলোও।

কুতুবদিয়ার জেলে শফি উল্লাহ হতাশা প্রকাশ করেন, ‘এই অবস্থায় যদি সাগরে যেতে না পারি, আর সামনে নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে পরিবার নিয়ে চলবো কীভাবে বুঝতেছি না।’

মৎস্যজীবি বজল আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘সরকার যদি তেলের ব্যবস্থা না করে বা কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে অনেকেই এই পেশা ছাড়তে বাধ্য হবে।’

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসীর’ সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীনের মতে, ‘কক্সবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষ। জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রূপ নেবে বড় ধরনের মানবিক সংকটে। ইতিমধ্যে উপকূলের অনেক পরিবার খরচ চালাচ্ছে সঞ্চয় ভেঙে। কেউ ধার করছেন, কেউ পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। কিন্তু বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় সামনে অনিশ্চয়তাই বড় হয়ে উঠছে।’

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বললেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা, জেলেদের জন্য ভর্তুকি বা বিশেষ সহায়তা দেওয়া এবং সংকটকালে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা না করলে আরও জটিল হয়ে উঠবে পরিস্থিতি। কারণ, এই জনপদের মানুষের কাছে সাগরে যাওয়া মানেই জীবন। আর সেই জীবনযাত্রার পথ এখন কার্যত বন্ধ।’

তবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান দবি করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে সারাদেশের মতো জ্বালানি সংকট চলছে কক্সবাজারে। তেল যা পাওয়া যাচ্ছে, তা যথাযথভাবে সরবরাহে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে জ্বালানি পাচার রোধে।’

##

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

তামাক ছেড়ে বাদাম চাষে ঝুঁকছে চকরিয়ার কৃষকেরা: হচ্ছে লাভবান

সাগর ট্রলার জেলে সবই আছে, নেই শুধু তেল

আপডেট সময় : ০৪:২৮:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকটে এক অদৃশ্য স্থবিরতা বিরাজ করছে কক্সবাজার উপকূলজুড়ে। যে সাগর প্রতিদিন হাজারো জেলের জীবিকা জুগিয়ে এসেছে, সেই সাগরই আজ তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন।

মৎস্যশিকারীরা দুঃখ প্রকাশ করেন, সাগর আছে, ট্রলার আছে, মানুষ আছে। শুধু নেই তেল।

জেলা জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ১২ লাখ লিটার জ্বালানির। কিন্তু কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার ৩২টি পেট্রোল পাম্প ও ২১টি ভাসমান পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪ লাখ লিটার। এই বিশাল ঘাটতির সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে মৎস্য খাতে।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানালেন, ‘জেলায় নিবন্ধিত প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ সাগরে যেতে পারছে। বাকি ৭০ শতাংশ ট্রলার কার্যত অচল।’

শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘যারা আগে কিছু তেল মজুত করতে পেরেছিল, তাদের কয়েকটা ট্রলার এখনও চলছে। কিন্তু নতুন করে তেল না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ ট্রলার। বর্তমানে সক্রিয় ট্রলারের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ২০০টিতে। অনেক মালিক এখন সাগরে পাঠাতে চাইছেন না ট্রলার।’

সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে কক্সবাজার ফিশারিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ইঞ্জিন বন্ধ করা ট্রলার নোঙর করে আছে বাঁকখালী নদীতে। কোনো কোনো ট্রলারে ধুলো জমেছে, কোথাও জাল শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে জেলেরা এসে বসে থাকেন, ফিরে যান আবার।

জেলেদের উদ্বেগ, ‘তেল না থাকলে সাগরে যাব কীভাবে ?’

মৎস অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮১৮ জন। এর বাইরে অগণিত অনিবন্ধিত জেলেও এই পেশার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে অন্তত সাগরে যেতে পারছেন না ৫০ হাজার জেলে।

কক্সবাজারের নাজিরারটেক এলাকার জেলে মোহাম্মদ আইয়ুব হতাশা নিয়ে বললেন, ‘আগে মাসে দুই-তিনবার সাগরে যেতাম। এখন তেল নাই, বন্ধ ট্রলার। ঘরে বসে থাকি। কাজ নাই, আয়ও নাই।’

ফিশারী ঘাটে অপেক্ষমান জেলে নবী আহমদের দাবি, ‘সাগরে গেলেও এখন ভয়। ডাকাতের উপদ্রব বেড়েছে, মাছও মিলছে কম। খরচ ওঠে না। তাই অনেকে যাচ্ছে না।’

জেলে নুরুল আলম মন্তব্য করেন, ‘টানা ১০-১৫ দিন সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে যায়। এখন অনেকেই চলছে ধার-দেনা করে।’

ট্রলার মালিকেরা জানান, তেলের সংকট সবচেয়ে প্রকট উপকূলীয় উপজেলা টেকনাফে। নাফ ভিউ ফিলিং স্টেশনে দৈনিক ৪ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৫০০ লিটার ডিজেল। এই সামান্য জ্বালানি দিয়ে দূর সমুদ্রে যাওয়ার কথা ভাবাও যায় না।

জেলেরা জানান, আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে মাছের প্রজনন মৌসুমে সাগরে বন্ধ থাকবে মাছ ধরা। ফলে এখন যে অল্পসংখ্যক ট্রলার সাগরে যাচ্ছে, বন্ধ হয়ে যাবে সেগুলোও।

কুতুবদিয়ার জেলে শফি উল্লাহ হতাশা প্রকাশ করেন, ‘এই অবস্থায় যদি সাগরে যেতে না পারি, আর সামনে নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে পরিবার নিয়ে চলবো কীভাবে বুঝতেছি না।’

মৎস্যজীবি বজল আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘সরকার যদি তেলের ব্যবস্থা না করে বা কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে অনেকেই এই পেশা ছাড়তে বাধ্য হবে।’

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসীর’ সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীনের মতে, ‘কক্সবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষ। জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রূপ নেবে বড় ধরনের মানবিক সংকটে। ইতিমধ্যে উপকূলের অনেক পরিবার খরচ চালাচ্ছে সঞ্চয় ভেঙে। কেউ ধার করছেন, কেউ পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। কিন্তু বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় সামনে অনিশ্চয়তাই বড় হয়ে উঠছে।’

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বললেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা, জেলেদের জন্য ভর্তুকি বা বিশেষ সহায়তা দেওয়া এবং সংকটকালে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা না করলে আরও জটিল হয়ে উঠবে পরিস্থিতি। কারণ, এই জনপদের মানুষের কাছে সাগরে যাওয়া মানেই জীবন। আর সেই জীবনযাত্রার পথ এখন কার্যত বন্ধ।’

তবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান দবি করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে সারাদেশের মতো জ্বালানি সংকট চলছে কক্সবাজারে। তেল যা পাওয়া যাচ্ছে, তা যথাযথভাবে সরবরাহে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে জ্বালানি পাচার রোধে।’

##