ঢাকা ১০:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পিকআপভর্তি চোলাই মদ জব্দ, আটক ৫ ৩৬ বছরে পদার্পণ করলো দৈনিক কক্সবাজার মহেশখালী উপজেলা প্রেসক্লাবের নির্বাচন সম্পন্ন: সভাপতি ফারুক, সা: সম্পাদক- আজিজ বড় বাজারে হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা,ফেনসিডিলসহ কয়েক প্রকার মাদক:নেপথ্যে “কিং”! কক্সবাজারে হারানো আইফোনসহ উদ্ধার করা ৫০ টি মোবাইল মালিকের কাছে হস্তান্তর বিজিবি-আরএসও গোলাগুলি, অস্ত্র-ইয়াবা উদ্ধার শুক্রবার কক্সবাজারে আসছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যাবেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কক্সবাজারে সামাজিক সম্প্রীতি ও দায়িত্বশীল তথ্য ব্যবহার বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত কক্সবাজারে নির্মাণাধীন কালভার্টে মাটি ধসে নিহত ২ শ্রমিক দূষিত খাবারে বিশ্বজুড়ে বছরে প্রাণহানি ১৫ লাখ, সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা পেকুয়ায় বন্দুক, গুলি-কার্তুজসহ অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার ঈদুল আজহার ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮১ জন ২য় বিশ্বযুদ্ধে নিহত জাপানি সৈন্যদের স্মৃতির খোঁজে কক্সবাজারে জাপানি প্রতিনিধি দল কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন আইভী কক্সবাজার রেল স্টেশনের সিকিউরিটি রাব্বানীর বিরুদ্ধে টিকেট কালোবাজারির অভিযোগ

সাগর ট্রলার জেলে সবই আছে, নেই শুধু তেল

জ্বালানি সংকটে এক অদৃশ্য স্থবিরতা বিরাজ করছে কক্সবাজার উপকূলজুড়ে। যে সাগর প্রতিদিন হাজারো জেলের জীবিকা জুগিয়ে এসেছে, সেই সাগরই আজ তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন।

মৎস্যশিকারীরা দুঃখ প্রকাশ করেন, সাগর আছে, ট্রলার আছে, মানুষ আছে। শুধু নেই তেল।

জেলা জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ১২ লাখ লিটার জ্বালানির। কিন্তু কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার ৩২টি পেট্রোল পাম্প ও ২১টি ভাসমান পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪ লাখ লিটার। এই বিশাল ঘাটতির সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে মৎস্য খাতে।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানালেন, ‘জেলায় নিবন্ধিত প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ সাগরে যেতে পারছে। বাকি ৭০ শতাংশ ট্রলার কার্যত অচল।’

শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘যারা আগে কিছু তেল মজুত করতে পেরেছিল, তাদের কয়েকটা ট্রলার এখনও চলছে। কিন্তু নতুন করে তেল না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ ট্রলার। বর্তমানে সক্রিয় ট্রলারের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ২০০টিতে। অনেক মালিক এখন সাগরে পাঠাতে চাইছেন না ট্রলার।’

সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে কক্সবাজার ফিশারিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ইঞ্জিন বন্ধ করা ট্রলার নোঙর করে আছে বাঁকখালী নদীতে। কোনো কোনো ট্রলারে ধুলো জমেছে, কোথাও জাল শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে জেলেরা এসে বসে থাকেন, ফিরে যান আবার।

জেলেদের উদ্বেগ, ‘তেল না থাকলে সাগরে যাব কীভাবে ?’

মৎস অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮১৮ জন। এর বাইরে অগণিত অনিবন্ধিত জেলেও এই পেশার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে অন্তত সাগরে যেতে পারছেন না ৫০ হাজার জেলে।

কক্সবাজারের নাজিরারটেক এলাকার জেলে মোহাম্মদ আইয়ুব হতাশা নিয়ে বললেন, ‘আগে মাসে দুই-তিনবার সাগরে যেতাম। এখন তেল নাই, বন্ধ ট্রলার। ঘরে বসে থাকি। কাজ নাই, আয়ও নাই।’

ফিশারী ঘাটে অপেক্ষমান জেলে নবী আহমদের দাবি, ‘সাগরে গেলেও এখন ভয়। ডাকাতের উপদ্রব বেড়েছে, মাছও মিলছে কম। খরচ ওঠে না। তাই অনেকে যাচ্ছে না।’

জেলে নুরুল আলম মন্তব্য করেন, ‘টানা ১০-১৫ দিন সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে যায়। এখন অনেকেই চলছে ধার-দেনা করে।’

ট্রলার মালিকেরা জানান, তেলের সংকট সবচেয়ে প্রকট উপকূলীয় উপজেলা টেকনাফে। নাফ ভিউ ফিলিং স্টেশনে দৈনিক ৪ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৫০০ লিটার ডিজেল। এই সামান্য জ্বালানি দিয়ে দূর সমুদ্রে যাওয়ার কথা ভাবাও যায় না।

জেলেরা জানান, আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে মাছের প্রজনন মৌসুমে সাগরে বন্ধ থাকবে মাছ ধরা। ফলে এখন যে অল্পসংখ্যক ট্রলার সাগরে যাচ্ছে, বন্ধ হয়ে যাবে সেগুলোও।

কুতুবদিয়ার জেলে শফি উল্লাহ হতাশা প্রকাশ করেন, ‘এই অবস্থায় যদি সাগরে যেতে না পারি, আর সামনে নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে পরিবার নিয়ে চলবো কীভাবে বুঝতেছি না।’

মৎস্যজীবি বজল আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘সরকার যদি তেলের ব্যবস্থা না করে বা কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে অনেকেই এই পেশা ছাড়তে বাধ্য হবে।’

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসীর’ সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীনের মতে, ‘কক্সবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষ। জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রূপ নেবে বড় ধরনের মানবিক সংকটে। ইতিমধ্যে উপকূলের অনেক পরিবার খরচ চালাচ্ছে সঞ্চয় ভেঙে। কেউ ধার করছেন, কেউ পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। কিন্তু বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় সামনে অনিশ্চয়তাই বড় হয়ে উঠছে।’

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বললেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা, জেলেদের জন্য ভর্তুকি বা বিশেষ সহায়তা দেওয়া এবং সংকটকালে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা না করলে আরও জটিল হয়ে উঠবে পরিস্থিতি। কারণ, এই জনপদের মানুষের কাছে সাগরে যাওয়া মানেই জীবন। আর সেই জীবনযাত্রার পথ এখন কার্যত বন্ধ।’

তবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান দবি করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে সারাদেশের মতো জ্বালানি সংকট চলছে কক্সবাজারে। তেল যা পাওয়া যাচ্ছে, তা যথাযথভাবে সরবরাহে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে জ্বালানি পাচার রোধে।’

##

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

পিকআপভর্তি চোলাই মদ জব্দ, আটক ৫

সাগর ট্রলার জেলে সবই আছে, নেই শুধু তেল

আপডেট সময় : ০৪:২৮:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকটে এক অদৃশ্য স্থবিরতা বিরাজ করছে কক্সবাজার উপকূলজুড়ে। যে সাগর প্রতিদিন হাজারো জেলের জীবিকা জুগিয়ে এসেছে, সেই সাগরই আজ তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন।

মৎস্যশিকারীরা দুঃখ প্রকাশ করেন, সাগর আছে, ট্রলার আছে, মানুষ আছে। শুধু নেই তেল।

জেলা জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ১২ লাখ লিটার জ্বালানির। কিন্তু কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার ৩২টি পেট্রোল পাম্প ও ২১টি ভাসমান পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪ লাখ লিটার। এই বিশাল ঘাটতির সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে মৎস্য খাতে।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানালেন, ‘জেলায় নিবন্ধিত প্রায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশ সাগরে যেতে পারছে। বাকি ৭০ শতাংশ ট্রলার কার্যত অচল।’

শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘যারা আগে কিছু তেল মজুত করতে পেরেছিল, তাদের কয়েকটা ট্রলার এখনও চলছে। কিন্তু নতুন করে তেল না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ ট্রলার। বর্তমানে সক্রিয় ট্রলারের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ২০০টিতে। অনেক মালিক এখন সাগরে পাঠাতে চাইছেন না ট্রলার।’

সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে কক্সবাজার ফিশারিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ইঞ্জিন বন্ধ করা ট্রলার নোঙর করে আছে বাঁকখালী নদীতে। কোনো কোনো ট্রলারে ধুলো জমেছে, কোথাও জাল শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে জেলেরা এসে বসে থাকেন, ফিরে যান আবার।

জেলেদের উদ্বেগ, ‘তেল না থাকলে সাগরে যাব কীভাবে ?’

মৎস অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৮১৮ জন। এর বাইরে অগণিত অনিবন্ধিত জেলেও এই পেশার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে অন্তত সাগরে যেতে পারছেন না ৫০ হাজার জেলে।

কক্সবাজারের নাজিরারটেক এলাকার জেলে মোহাম্মদ আইয়ুব হতাশা নিয়ে বললেন, ‘আগে মাসে দুই-তিনবার সাগরে যেতাম। এখন তেল নাই, বন্ধ ট্রলার। ঘরে বসে থাকি। কাজ নাই, আয়ও নাই।’

ফিশারী ঘাটে অপেক্ষমান জেলে নবী আহমদের দাবি, ‘সাগরে গেলেও এখন ভয়। ডাকাতের উপদ্রব বেড়েছে, মাছও মিলছে কম। খরচ ওঠে না। তাই অনেকে যাচ্ছে না।’

জেলে নুরুল আলম মন্তব্য করেন, ‘টানা ১০-১৫ দিন সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে যায়। এখন অনেকেই চলছে ধার-দেনা করে।’

ট্রলার মালিকেরা জানান, তেলের সংকট সবচেয়ে প্রকট উপকূলীয় উপজেলা টেকনাফে। নাফ ভিউ ফিলিং স্টেশনে দৈনিক ৪ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৫০০ লিটার ডিজেল। এই সামান্য জ্বালানি দিয়ে দূর সমুদ্রে যাওয়ার কথা ভাবাও যায় না।

জেলেরা জানান, আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে মাছের প্রজনন মৌসুমে সাগরে বন্ধ থাকবে মাছ ধরা। ফলে এখন যে অল্পসংখ্যক ট্রলার সাগরে যাচ্ছে, বন্ধ হয়ে যাবে সেগুলোও।

কুতুবদিয়ার জেলে শফি উল্লাহ হতাশা প্রকাশ করেন, ‘এই অবস্থায় যদি সাগরে যেতে না পারি, আর সামনে নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে পরিবার নিয়ে চলবো কীভাবে বুঝতেছি না।’

মৎস্যজীবি বজল আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘সরকার যদি তেলের ব্যবস্থা না করে বা কোনো সহায়তা না দেয়, তাহলে অনেকেই এই পেশা ছাড়তে বাধ্য হবে।’

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসীর’ সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীনের মতে, ‘কক্সবাজারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষ। জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রূপ নেবে বড় ধরনের মানবিক সংকটে। ইতিমধ্যে উপকূলের অনেক পরিবার খরচ চালাচ্ছে সঞ্চয় ভেঙে। কেউ ধার করছেন, কেউ পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। কিন্তু বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় সামনে অনিশ্চয়তাই বড় হয়ে উঠছে।’

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বললেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা, জেলেদের জন্য ভর্তুকি বা বিশেষ সহায়তা দেওয়া এবং সংকটকালে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা না করলে আরও জটিল হয়ে উঠবে পরিস্থিতি। কারণ, এই জনপদের মানুষের কাছে সাগরে যাওয়া মানেই জীবন। আর সেই জীবনযাত্রার পথ এখন কার্যত বন্ধ।’

তবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান দবি করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতির কারণে সারাদেশের মতো জ্বালানি সংকট চলছে কক্সবাজারে। তেল যা পাওয়া যাচ্ছে, তা যথাযথভাবে সরবরাহে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে জ্বালানি পাচার রোধে।’

##