কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে বর্তমানে ভয়াবহ সংক্রমণ ঝুঁকিতে রয়েছে ভর্তি সকল শিশু। অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম নিয়ন্ত্রণে ‘ডেডিকেটেড হাম ওয়ার্ড’ চালু করা হলেও সীমিত আসন এবং অব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য মাত্র ৮টি সিট নিয়ে একটি অস্থায়ী ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি যে, একটি সিটে গড়ে তিনজন শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। জায়গা সংকটের কারণে সাধারণ রোগে আক্রান্ত শিশুদের সাথেই হাম আক্রান্ত শিশুদের রাখা হচ্ছে, যা সংক্রমণ ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এছাড়া হাম ওয়ার্ডে প্রবেশে কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় যে কেউ অবাধে আসা-যাওয়া করছে। একেকজন রোগীর সাথে তিন থেকে চারজন করে স্বজন ও অন্য শিশুরাও হাসপাতালে প্রবেশ করছে, যা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইতোমধ্যে এই হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে আরও বহু শিশু ভর্তি রয়েছে।
খুটাখলীর স্কুল শিক্ষক মো. রুস্তম জানান, তার ৯ মাস বয়সী সন্তান রাফসান আল আরিশ প্রথমে সাধারণ শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। পরে শরীরে রেশ ওঠার পর তাকে দ্রুত হাম ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। তিনি বলেন, “হাম খুবই সংক্রামক রোগ। এখানে কে হামে আক্রান্ত আর কে অন্য রোগে আক্রান্ত, তা বোঝা কঠিন। সবাই একসাথে মিশে যাচ্ছে, যা খুবই বিপজ্জনক।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নার্স জানান, অনেক শিশু অন্য রোগ নিয়ে ভর্তি হয়ে পরে হাম আক্রান্ত হয়েছে। তারা বলেন, “কয়েকজন শিশু অন্য রোগ নিয়ে এসে হামে আক্রান্ত হয়েছে। সাধারণ শিশু রোগীদের সাথেও হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে। এছাড়া একজন শিশুর সাথে অভিভাবক হিসেবে নানা-নানি, দাদা-দাদি, খালা, ফুফু সহ পরিবারের সকলেই চলে আসেন। তারা সুস্থ অনেক শিশুও নিয়ে আসেন। এভাবে সবখানে ছড়িয়ে যাচ্ছে হাম।”
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম বলেন, “প্রাথমিকভাবে কয়েকজন রোগী আসার পরই আমরা ৮টি সিট নিয়ে হাম ওয়ার্ড চালু করি। পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খুব দ্রুতই একটি পূর্ণাঙ্গ আইসোলেটেড হাম ওয়ার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।”
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, পৃথিবীর যে কয়টি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ রয়েছে তার মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপটাই হলো হাম রোগ। এই সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, কোন একটা এলাকায়, পাহাড়ে বা জনবসতিতে যদি একটি হাম রোগী দেওয়া হয় সই একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ওই এলাকায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে।
কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছে। খুব শিগগিরই পূর্বের করোনা ওয়ার্ডে একটি আইসোলেটেড হাম ইউনিট চালু করা হবে।”
এদিকে এ ঘটনার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী খোকা। তিনি বলেন, “এত বড় ঝুঁকির জন্য হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দায় এড়াতে পারেন না। আগাম প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল। দ্রুত একটি ডেডিকেটেড ওয়ার্ড চালু করতে হবে এবং প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সাথেও সমন্বয় করতে হবে।”
তবে এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মং টিং ঞো’র সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান জানান, তিনি নিজে ওয়ার্ডটি পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা আলাদা একটি আইসোলেটেড ওয়ার্ড চালুর চেষ্টা করছি। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের সাথে যোগাযোগ চলছে। তবে একটি পূর্ণাঙ্গ আইসোলেশন সেন্টার চালু করতে কিছু অবকাঠামোগত প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের হাতে প্রস্তুত কোনো ব্যবস্থা নেই, তবে আমরা দ্রুত সমাধানের জন্য কাজ করছি।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিশুদের মধ্যে হাম সংক্রমণ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবদু রশিদ মানিক: 






















