আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা নতুন সরকারের ঘোষিত তিন অগ্রাধিকারের একটি। তবে অবৈধ অস্ত্র, জামিনে বের হওয়া পেশাদার সন্ত্রাসীদের তৎপরতা, চাঁদাবাজি, মাদক ও উগ্রবাদী তৎপরতার শঙ্কা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ঈদ সামনে রেখে ছিনতাই ও মহাসড়কে ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ এবং সড়ক নিরাপদ রাখাকেও আশু চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ শুধু অপরাধ দমনের বিষয় নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জনআস্থার প্রশ্ন। দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত অগ্রগতি দেখানো জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তারা এখনো মাঠে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে ধাপে ধাপে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পুরোপুরি পুলিশের ওপর পড়বে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এই বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতে রদবদলসহ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলমান। পুলিশ এখনো পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব তৈরি করে সহিংসতা আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা ছিল। পুলিশ সদস্যরাও বিভিন্ন স্থানে মবের শিকার হয়েছিলেন।
অবশ্য বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। এর একটা ইতিবাচক প্রভাব মাঠপর্যায়ে পড়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশের সদ্য বিদায়ী মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখার ক্ষেত্রে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তবে সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে তাঁরা চেষ্টা করেছেন। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মহাসড়কে ডাকাতি ও মাদকের বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশের প্রতি তাঁদের নির্দেশনা ছিল। সামনেও এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে।
পেশাদার সন্ত্রাসী ও অস্ত্র নিয়ে শঙ্কা
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৪৩ জন পেশাদার সন্ত্রাসী জামিনে মুক্ত হয়েছেন। এরপর একাধিক খুনের ঘটনায় এই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকের নাম এসেছে। তবে সুব্রত বাইন ছাড়া প্রায় সব আলোচিত পেশাদার সন্ত্রাস ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। তাঁদের কেউ কেউ মুক্তি পেয়ে দেশ ত্যাগ করেন এবং বিদেশে বসে দেশের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও জানা গেছে। ফলে এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাঁদের অনুসারীরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য একধরনের হুমকি হিসেবে রয়েছেন।
জামিনে মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কারাগার থেকে দুই হাজারের মতো বন্দীর পালানোর ঘটনা ঘটে। পালানো বন্দীদের মধ্যে বিভিন্ন উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ৯৮ জন ছিলেন। এর মধ্যে ৭০ জনই ছিলেন সাজাপ্রাপ্ত। তাঁদের অনেকে পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তার হলেও একটা অংশ এখনো পলাতক। তাঁদের কেউ নতুন করে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন কি না, সে বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে তল্লাশিচৌকিতে পুলিশকে ছুরিকাঘাত এবং দুর্বৃত্তদের ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে অনেকগুলো বোমা (আইইডি) উদ্ধারসহ কিছু ঘটনায় উগ্রবাদী তৎপরতার আলামতও দেখা যাচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ ধরনের দুর্বৃত্তরাও সামনে বড় ঝুঁকির জায়গা তৈরি করতে পারে।
এসবের পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩ শতাধিক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে। এ অস্ত্রগুলো ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসতে পারে। নির্বাচনের আগে সীমান্ত হয়ে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের খবরও এসেছিল। নির্বাচনের আগে-পরে বেশ কিছু ঘটনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দেখাও গেছে। এর বাইরে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিন বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতা–কর্মীদের অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নামার ঘটনাও তখন আলোচিত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অস্ত্রধারী কিছু আসামি গ্রেপ্তার হলেও ওই অস্ত্রের বেশির ভাগ উদ্ধার হয়নি।
আলোচিত বিষয় চাঁদাবাজি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণায় চাঁদাবাজি একটি আলোচিত বিষয় ছিল। বিএনপি সরকার গঠনের পরও এ বিষয় আলোচনায় আসছে। যদিও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও স্থানীয়ভাবে অনেক সংসদ সদস্য চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিচ্ছেন। দলের পক্ষ থেকেও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনা আছে। নির্বাচনের পর লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানের নির্দেশে এমন এক মামলায় বিএনপির দুই কর্মী গ্রেপ্তারও হয়েছেন।
তবে এসব পদক্ষেপের পরও চাঁদাবাজির বিভিন্ন খবর সামনে আসছে। চাঁদা না পেয়ে হামলা ও গুলির ঘটনাও ঘটছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আদাবরে চাঁদা না পেয়ে একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় দুর্বৃত্তরা হামলা করেছে। এ ঘটনায় সেই রাতেই মালিক-শ্রমিকেরা আদাবর থানা ঘেরাও করেছিলেন। পরে অবশ্য পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনার পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় চাঁদার দাবিতে এক ফল ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে।
চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর কাছে কোটি টাকার চাঁদা দাবি করেছিল চিহ্নিত পেশাদার সন্ত্রাসী। টাকা না পেয়ে তারা ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই ব্যবসায়ীর বাসা লক্ষ্য করে সাবমেশিনগান ও চায়নিজ রাইফেলের মতো অস্ত্র দিয়ে গুলি করেছে।
বিএনপির এক নেতার আমদানি করা কমলাভর্তি দুটি ট্রাক আটক করে ৭০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় দল–মত না দেখে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের সব ইউনিটপ্রধান, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গে এক ভার্চ্যুয়াল সভায় এমন নির্দেশনা দিয়েছেন আইজিপি।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং যেসব অপরাধে তারা সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়—সেসব বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পেশাদার সন্ত্রাসীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান এবং মাদকের বিরুদ্ধে কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থা তৈরি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
আস্থার সংকট দূর করতে হবে
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মূল কাজটি করে পুলিশ। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বাহিনীর সদস্যদের মনোবল–সংকট পুরোপুরি কাটেনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় আলোচিত কিংবা সরাসরি সম্পৃক্ত অনেক কর্মকর্তা পলাতক বা আত্মগোপনে আছেন। আবার অনেককে এমন মামলায় আসামি করা হয়েছে, যাঁরা ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্ব পালন করেননি।
হয়রানিমূলক আসামি করার ঘটনাগুলোর পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কা আছে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের মধ্যে। এ ধরনের আসামি হওয়ায় পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলেও জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, পুলিশের অনেকেই এখন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে চান না। কারণ, অতীতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোয় ক্ষুব্ধ আসামিরাও গণ-অভ্যুত্থানের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মামলায় ঢুকিয়েছেন, যা পুলিশের মনোবলে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এ ধরনের ভুক্তভোগীরা ভেতরে-ভেতরে ক্ষুব্ধ।
এর বাইরে নতুন সরকার রদবদলের ক্ষেত্রে দক্ষতা, নাকি দলীয় পরিচয় প্রাধান্য দেয়—সে শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন কেউ কেউ। আবার পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যেতে একে অপরের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, এমন ঘটনাও আছে। এটাও অনেকের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
এমতাবস্থায় আস্থার সংকট দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি মনে করছেন পেশাদার কর্মকর্তারা।
নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা জরুরি
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারের তিনটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার থাকা উচিত। সেগুলো হলো পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠন, সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান এবং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানো।
অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত বুধবার জানিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রস্তুত করে শিগগিরই অভিযান শুরু হবে। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক তৌহিদুল হকের মতে, রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে কেউ যাতে অপরাধে জড়াতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। নিজের দল ক্ষমতায় এলে অনেকে এটাকে চাঁদাবাজি, দখল–বাণিজ্য ও অবৈধ আয়ের সুযোগ হিসেবে দেখে। এটি বন্ধ করতে হবে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো মূল্যে মব সন্ত্রাস বন্ধ করতেই হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র:প্রথম আলো
টিটিএন ডেস্ক: 
























