বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হচ্ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ সহিংসতায় একাধিক লোকের প্রাণ গেছে। আহত হয়েছেন অনেকেই। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, বিশেষ করে ভোটের দিন বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ সহিংসতা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীদের অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বৈধ অস্ত্র থাকায় তাদের সুরক্ষা যত সহজ, সাংবাদিকের হাতে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, রেকর্ডার আর কলম ছাড়া কিছু থাকে না বলে তার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ততটাই কঠিন। বিশেষ করে যখন একাধিক পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায় এবং সেখানে বোমা ও ককটেল বিস্ফোরিত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ অনেক সময় কাঁদুনে গ্যাস, রাবার বুলেট এমনকি গুলিও ছোড়ে। এরকম পরিস্থিতিতে নিজের জীবন ও সরঞ্জাম সুরক্ষিত রেখে সঠিক সময়ে সঠিক সংবাদটি পাঠানোর মতো চ্যালেঞ্জিং কাজ যারা করবেন, তাদেরকে কিছু সুরক্ষা কৌশল অবশ্যই মেনে চলতে হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থাগুলো নির্বাচনকালীন সংবাদ সংগ্রহের সময় যেসব কৌশল ও নীতিমালা মেনে চলার পরামর্শ দেয়, সেগুলো আমাদের জানা থাকা প্রয়োজন।
সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্বাচনের সময়কে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। নির্বাচনপূর্ব, নির্বাচনকালীন (ভোটের দিন) এবং নির্বাচনপরবর্তী। অর্থাৎ, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা বা তার আগে থেকেই ভোটের নানাবিধ খবর সংবাদকর্মীরা সংগ্রহ করেন। এই পর্যায়ে শুরুর দিকে সংঘাত সহিংসতার ঘটনা তুলনামূলক কম ঘটে। কিন্তু নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অনেক স্থানে পরিস্থিতির অবনতি হয়। ভোটের দিনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কেন্দ্র দখল, দখল প্রতিহত করা, ভোটারদের প্রভাবিত করার ইস্যু নিয়ে বাগবিতণ্ডা থেকে সৃষ্ট সংঘর্ষ, একাধিক পক্ষের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশন, কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান ভোটের দিনের পরিচিত দৃশ্য।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। যেহেতু সাংবাদিকরা কোনো পক্ষভুক্ত নন, বরং তারা পাবলিক ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করেন, তাই তাদের ওপর আক্রমণ মানে জনগণের তথ্য জানার অধিকার ক্ষুণ্ন করা। সুতরাং নির্বাচনকালীন সংবাদ সংগ্রহের সময় কোনো সংবাদকর্মী যদি কোনো পক্ষের দ্বারা আক্রান্ত হন এবং বিপদের সম্মুখীন হন, তাকে সুরক্ষা দেওয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নৈতিক দায়িত্ব।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সাংবাদিকদের ওপর হামলাকে গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য হুমকি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে। সুতরাং রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখা তথা সংবাদমাধ্যম যে সত্যিই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, সেটি মাথায় রেখেই এর সুরক্ষার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে—এটিই প্রত্যাশিত। মনে রাখতে হবে, সংবাদমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উভয়ই একটি অবাধ-সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। সুতরাং আইনশৃঙ্খলা ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বাগযুদ্ধ বা ঝগড়াঝাটি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
ভোটের ফলাফল ঘোষণা থেকে শুরু করে এর পরবর্তী আরও কিছুদিন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা এই সময়ে পরাজিত প্রার্থী ও তার সমর্থকদের ওপর এমনকি তাদের বাড়িঘরে হামলার মতো ঘটনাও ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি ঘটনা বহুবছর ধরে চলে আসছে, সেটি সংখ্যালঘু ভোটারের ওপর সহিংসতা। এরকম সব ধরনের ঘটনাই সাংবাদিকদের নির্মোহ ও পক্ষপাতহীনভাবে সংগ্রহ করতে হয়। নির্ভুল সংবাদটি অন্যের আগে নিজ প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বগুলো যারা পালন করবেন, সেটি হোক পত্রিকা, টেলিভিশন বা অনলাইন পোর্টালের ঢাকা অফিসের রিপোর্টার কিংবা ঢাকার বাইরে কর্মরত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি—প্রত্যেকেরই কিছু মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি।
১. সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও কভারেজ এলাকার ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। কে মাঠ পর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাবেন, কে সহায়তা দেবেন এবং কার কী দায়িত্ব—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা জরুরি। নির্বাচনি এলাকার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সেই অনুযায়ী রিপোর্টার ও ক্যামেরাপারসন অ্যাসাইন করতে হবে।
২. সংঘর্ষের শঙ্কা আছে, এমন এলাকায় শারীরিকভাবে দুর্বল, যিনি সরঞ্জাম নিয়ে দৌড়াতে অভ্যস্ত নন, এমন লোকদের না পাঠানোই উত্তম। বিশেষ করে হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা আছে, এমন কর্মীদের নির্বাচনের দায়িত্ব এড়িয়ে চলা উচিত। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাদের না পাঠানোই উত্তম। যেখানে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট এমনকি গুলি চালাতে পারে বলে আশঙ্কা আছে, সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে যথাসম্ভব দূর থেকে। যেখানে বাতাস চলাচল কম, সেখানে টিয়ার গ্যাসের ঘনত্ব মারাত্মক হতে পারে—যা খুব দ্রুত একজন মানুষকে অসুস্থ করে দেবে।
৩. ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দলগতভাবে কাজ করাই নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে একা একা কোথাও না গিয়ে একসঙ্গে বেশ কয়েকজন কাজ করলে তাদের ওপর আক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে।
৪. নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের সময় অবশ্যই সংবাদকর্মীদের হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট সঙ্গে রাখতে হবে।
৫. নির্বাচন সংগ্রহকারী সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ থাকা আবশ্যক। সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী অন্তত একদিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল সম্পর্কে অবহিত করতে পারে। কিছু ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। বিবিসি তার কর্মীদের HEFAT (Hostile Environment and Fast Aid Training) নামে একটি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে, যেখানে প্রতিকূল পরিবেশে সাংবাদিকতার কৌশলগুলো শেখানো হয়। নির্বাচনের আগে সংবাদমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে পারে। বিশেষ করে যারা নির্বাচনের সংবাদ কাভার করার জন্য মাঠে যাবেন, তাদের জন্য।
৬. নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের জন্য যে কোনো এলাকায় যাওয়ার আগে সেখানকার সম্ভাব্য ঝুঁকি, বিক্ষোভকারীদের শত্রুভাবাপন্নতা, পূর্বের আগ্রাসী বক্তব্য, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা ও তৎপরতা সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
৭. দ্রুত চলাফেরা করা যায়—এমন পোশাক ও জুতা পরতে হবে। ঢিলা কাপড়, গলায় ঝোলানো জিনিস যেমন মাফলার, চাদর, টাই ইত্যাদি এড়াতে হবে—যাতে কেউ সেগুলো টেনে ধরতে না পারে। নাইলনের মতো দাহ্য কাপড় ব্যবহার না করাই ভালো। কোনো রাজনৈতিক দলের রং বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রং পরিধান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৮. ভিড়ের মধ্যে কাজ করলে আগেই কৌশল ঠিক করতে হবে। ভিড়ের প্রান্তে থাকা নিরাপদ। মাঝখানে ঢুকে পড়লে বের হওয়া কঠিন।
৯. ফটোসাংবাদিক ও ক্যামেরাপারসনরা সাধারণত ঘটনার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকেন এবং বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাদের আশপাশ পর্যবেক্ষণ করার জন্য সম্ভব হলে কাউকে রাখতে হবে। এখানেও দলবদ্ধভাবে কাজ করার বিষয়টা মাথায় রাখা জরুরি। একসঙ্গে যখন বেশ কয়েকজন কোনো বড় ঘটনার ছবি সংগ্রহ করবেন, তখন সম্ভব হলে তাদের মধ্যে কোনো একজন আশপাশে নজর রাখবেন।
১০. ডিভাইস সুরক্ষার কৌশল জানা থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে প্রতিবাদকারী বা নিরাপত্তা বাহিনী যদি তথ্য জব্দ করতে চায়, তাহলে কীভাবে তথ্য গোপন করা যায়—সে প্রস্তুতি রাখতে হবে। সব ডিভাইসে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, এনক্রিপশন ও ফায়ারওয়াল ব্যবহার করতে হবে। ফায়ারওয়াল (Firewall) হচ্ছে ডিভাইস ও ইন্টারনেটের মাঝখানে থাকা এক ধরনের ডিজিটাল প্রহরী—যে ঠিক করে দেয় কোন ডেটা ঢুকবে, কোনটা ঢুকবে না। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য ফায়ারওয়াল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১১. এবারের নির্বাচনে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সুতরাং নির্বাচনের সময় গুজব, ভুয়া ভিডিও, ভুয়া ফলাফল দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া তথ্য পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
১২. পরিস্থিতি নিয়ে ভক্সপপ বা সাধারণ মানুষের মতামত সরাসরি প্রচারের ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে তারা প্রতিপক্ষের সম্পর্কে এমন কিছু বলছেন কি না যা সংঘাত উসকে দিতে পারে। এরকম বক্তব্য দিলে সঙ্গে সঙ্গে প্রচার বন্ধ করে দিতে হবে বা মাঠ পর্যায়ে যে সংবাদকর্মী সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, তিনি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করবেন। কোনোভাবেই গালাগাল ও বিষোদ্ঘার প্রচার করা যাবে না। একপক্ষ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় আরেক পক্ষ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এরকম পরিস্থিতি হলে বিবদমান সব পক্ষের সাক্ষাৎকার নিতে হবে এবং বুঝাতে হবে যে আপনি কোনো পক্ষের নন। অর্থাৎ নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
১৩. ভোট দেওয়ার মুহূর্তে কাউকে ছবি বা ভিডিও করতে বাধ্য করা যাবে না। ভোটারকে ভয় দেখানো বা প্রভাবিত করার মতো কভারেজ এড়িয়ে চলতে হবে।
১৪. নারী, সংখ্যালঘু ও প্রতিবন্ধী ভোটারদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সংবেদনশীল থাকতে হবে। যিনি নিজের চেহারা দেখাতে চান না, তার মুখের দিকে ক্যামেরার লেন্স ধরা যাবে না।
১৫. অপরাধ ও অপরাধীদের ছবি বা ভিডিও প্রকাশের সময় সব ধরনের নিরাপত্তা সতর্কতা মানতে হবে। যেমন ভুক্তভোগীদের মুখ ঝাপসা করা বা তদন্ত ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এমন তথ্য প্রকাশ না করা।
১৬. সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও মতাদর্শকে সমান সুযোগ দিতে হবে। সংবাদের ভাষা যেন কোনো পক্ষের প্রচার বা বিরোধিতার হাতিয়ার না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
১৭. মতামত (opinion) ও সংবাদ (news) আলাদা রাখতে হবে।
১৮. প্রেসকার্ড বা সংবাদমাধ্যমপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র এমনভাবে গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সহজেই তার পরিচয় বুঝতে পারেন।
১৯. নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের সময় ওয়ালেটে ন্যূনতম ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রাখতে হবে। যেমন অল্প টাকা এবং সীমিত খরচের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড। অনেকে একাধিক ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড ব্যবহার করেন। কিন্তু নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের সময় এগুলো সঙ্গে না রাখাই ভালো।
২০. সংবাদমাধ্যমকর্মীদের জন্য নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।
সূএ: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
টিটিএন ডেস্ক: 






















