ঢাকা ০৬:১৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ আসছেন কক্সবাজার : যাবেন টেকনাফ,কুতুবদিয়া ও পেকুয়ায় ৩ দিনের সফরে কক্সবাজার আসছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী ১ দিনের সফরে কক্সবাজার আসছেন পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ঈদগড় ইউপি নির্বাচনে সৌদি প্রবাসী মঈন উদ্দিনের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা ঘোষণা কক্সবাজারে পুলিশের বিশেষ অভিযান : গ্রেপ্তার ১০ মহেশখালীতে স্কুলছাত্রকে ডিশের ক্যাবল দিয়ে পিটিয়ে জখম করলো শিক্ষক, থানায় অভিযোগ হঠাৎ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিস্থিতি দেখতে ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক, যা বললেন রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কা, ঘটনাস্থলেই শিশুর মৃত্যু ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে মানসিক চাপ, সৌদি আরবে লোহাগাড়ার যুবকের মরদেহ উদ্ধার লোহাগাড়ায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় চার যুবক গ্রেপ্তার, আদালতে সোপর্দ চাকরি দেয়ার নামে কিশোর অপহরণ : উখিয়ায় মানবপাচার চক্রের ২ সদস্য গ্রেপ্তার পুলিশ সুপারের বক্তব্যের নিন্দা কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির : জেলা জজকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, কক্সবাজারে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত হত্যা মামলার আসামি মুহুরি পাড়ার ছৈয়দ আলম গ্রেপ্তার কক্সবাজারে সাইবার মামলায় ৬ বিদেশির ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর

সালাহ উদ্দিন আহমদ উপকূল, সংগ্রাম ও প্রত্যাবর্তনের কাব্য

বাংলাদেশের রাজনীতি কেবল দল, নির্বাচন কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি ভূগোল, জনপদ, রাষ্ট্রচিন্তা এবং মানুষের দীর্ঘ সামাজিক অভিজ্ঞতারও ইতিহাস। সেই ইতিহাসের ভেতরেই সালাহ উদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক যাত্রাকে পাঠ করা যায়। তাঁর জীবনকে কেবল একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত কাহিনি হিসেবে নয়, বরং উপকূলীয় জনপদ থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তরণের একটি অভিজ্ঞতা হিসেবেও দেখা সম্ভব।

বঙ্গোপসাগরের বাতাস মানুষকে দুটি শিক্ষা দেয়। প্রথমটি—ঝড় অনিবার্য। দ্বিতীয়টি—কোনো ঝড়ই চিরস্থায়ী নয়। উপকূলের মানুষের কাছে এটি কেবল প্রকৃতির ভাষা নয়; এটি সামাজিক স্থিতি, অভিযোজন এবং পুনর্গঠনেরও এক দর্শন। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের পেকুয়ার সিকদারপাড়ায় সালাহ উদ্দিন আহমদের জন্ম সেই ভূগোলে, যেখানে প্রতিকূলতার সঙ্গে সহাবস্থানই জীবনযাপনের নিয়ম।
শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষা তাঁর চিন্তার দুটি ভিন্ন ভিত্তি নির্মাণ করে। একটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বোঝার ভিত্তি। অন্যটি সমাজের বাস্তবতাকে বোঝার অভিজ্ঞতা। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে তিনি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দেখেন। পরে প্রশাসনিক জীবন ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন। এই রূপান্তর কেবল পেশাগত নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনঅংশগ্রহণের দুটি ভিন্ন পরিসরের মধ্যকার একটি স্থানান্তরও বটে।
১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জাতীয় রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কক্সবাজার অঞ্চলের যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং পেকুয়াকে স্বতন্ত্র উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা বিভিন্ন গবেষণা ও জনআলোচনায় উল্লেখিত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো স্থানীয় উন্নয়ন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক প্রশাসন নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও অংশ।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন সরলরৈখিক ছিল না। আন্দোলন, নির্বাচন, প্রশাসনিক দায়িত্ব, কারাবাস এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া—প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক পথচলাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের বন্দিজীবন এবং ২০১৫ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর শিলংয়ে তাঁর অবস্থান বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এসব ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র, আইন, নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক সংকটের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় এগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক Max Weber ক্ষমতাকে বৈধতা, প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের সম্পর্কের মধ্যে বিশ্লেষণ করেছিলেন। অন্যদিকে Hannah Arendt দেখিয়েছেন, রাজনীতির কেন্দ্রে থাকে জনপরিসর, বিতর্ক এবং অংশগ্রহণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে কেবল পদ বা নির্বাচনী ফলাফল দিয়ে নয়, বরং তার প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, সংকট মোকাবিলা এবং জনপরিসরে উপস্থিতির মধ্য দিয়েও পড়া যায়।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে একমাত্রিকভাবে বিচার করে না। ইতিহাস একই সঙ্গে অর্জন, সীমাবদ্ধতা, বিতর্ক, সিদ্ধান্ত এবং সময়ের সাক্ষ্য সংরক্ষণ করে। সেই অর্থে সালাহ উদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক যাত্রাও বাংলাদেশের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়। তাঁর জীবন নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন সময়ের হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইতিহাস, তার নিজস্ব গতিতে, সেই মূল্যায়নের সাক্ষ্য বহন করবে।
আজ ৩০ জুন , এই কিংবদন্তী রাজনীতিকের জন্মদিন। জীবনের নতুন বছরে তাঁর সুস্বাস্থ্য কামনা করি। দেশের জন্য তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা ইতিবাচক অবদান রাখুক—এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক: চলচ্চিত্রকার, এক্টিভিস্ট

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ আসছেন কক্সবাজার : যাবেন টেকনাফ,কুতুবদিয়া ও পেকুয়ায়

সালাহ উদ্দিন আহমদ উপকূল, সংগ্রাম ও প্রত্যাবর্তনের কাব্য

আপডেট সময় : ০৩:৫৮:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতি কেবল দল, নির্বাচন কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি ভূগোল, জনপদ, রাষ্ট্রচিন্তা এবং মানুষের দীর্ঘ সামাজিক অভিজ্ঞতারও ইতিহাস। সেই ইতিহাসের ভেতরেই সালাহ উদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক যাত্রাকে পাঠ করা যায়। তাঁর জীবনকে কেবল একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিগত কাহিনি হিসেবে নয়, বরং উপকূলীয় জনপদ থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তরণের একটি অভিজ্ঞতা হিসেবেও দেখা সম্ভব।

বঙ্গোপসাগরের বাতাস মানুষকে দুটি শিক্ষা দেয়। প্রথমটি—ঝড় অনিবার্য। দ্বিতীয়টি—কোনো ঝড়ই চিরস্থায়ী নয়। উপকূলের মানুষের কাছে এটি কেবল প্রকৃতির ভাষা নয়; এটি সামাজিক স্থিতি, অভিযোজন এবং পুনর্গঠনেরও এক দর্শন। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের পেকুয়ার সিকদারপাড়ায় সালাহ উদ্দিন আহমদের জন্ম সেই ভূগোলে, যেখানে প্রতিকূলতার সঙ্গে সহাবস্থানই জীবনযাপনের নিয়ম।
শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষা তাঁর চিন্তার দুটি ভিন্ন ভিত্তি নির্মাণ করে। একটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বোঝার ভিত্তি। অন্যটি সমাজের বাস্তবতাকে বোঝার অভিজ্ঞতা। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে তিনি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দেখেন। পরে প্রশাসনিক জীবন ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন। এই রূপান্তর কেবল পেশাগত নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনঅংশগ্রহণের দুটি ভিন্ন পরিসরের মধ্যকার একটি স্থানান্তরও বটে।
১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জাতীয় রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। কক্সবাজার অঞ্চলের যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং পেকুয়াকে স্বতন্ত্র উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা বিভিন্ন গবেষণা ও জনআলোচনায় উল্লেখিত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো স্থানীয় উন্নয়ন, বিকেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক প্রশাসন নিয়ে বৃহত্তর আলোচনারও অংশ।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন সরলরৈখিক ছিল না। আন্দোলন, নির্বাচন, প্রশাসনিক দায়িত্ব, কারাবাস এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া—প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক পথচলাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের বন্দিজীবন এবং ২০১৫ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর শিলংয়ে তাঁর অবস্থান বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এসব ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র, আইন, নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক সংকটের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় এগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক Max Weber ক্ষমতাকে বৈধতা, প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের সম্পর্কের মধ্যে বিশ্লেষণ করেছিলেন। অন্যদিকে Hannah Arendt দেখিয়েছেন, রাজনীতির কেন্দ্রে থাকে জনপরিসর, বিতর্ক এবং অংশগ্রহণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে কেবল পদ বা নির্বাচনী ফলাফল দিয়ে নয়, বরং তার প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, সংকট মোকাবিলা এবং জনপরিসরে উপস্থিতির মধ্য দিয়েও পড়া যায়।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে একমাত্রিকভাবে বিচার করে না। ইতিহাস একই সঙ্গে অর্জন, সীমাবদ্ধতা, বিতর্ক, সিদ্ধান্ত এবং সময়ের সাক্ষ্য সংরক্ষণ করে। সেই অর্থে সালাহ উদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক যাত্রাও বাংলাদেশের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়। তাঁর জীবন নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন সময়ের হাতে ন্যস্ত থাকবে। ইতিহাস, তার নিজস্ব গতিতে, সেই মূল্যায়নের সাক্ষ্য বহন করবে।
আজ ৩০ জুন , এই কিংবদন্তী রাজনীতিকের জন্মদিন। জীবনের নতুন বছরে তাঁর সুস্বাস্থ্য কামনা করি। দেশের জন্য তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা ইতিবাচক অবদান রাখুক—এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক: চলচ্চিত্রকার, এক্টিভিস্ট