ঢাকা ০৪:১২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না, দরকার স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান’ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন চারজন, রাতে শপথ পুলিশের অভিযানে পেকুয়ায় ইয়াবাসহ নারী কারবারি আটক বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির শপথ, আজ বন্ধ থাকবে যেসব সড়ক ​টেকনাফের সাবরাংয়ে অবৈধ মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান: ড্রেজার ও ৩টি ড্রাম ট্রাক জব্দ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বান্দরবান জেলা পরিষদ পুনর্গঠন, চেয়ারম্যান মাম্যাচিং লামায় জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃতিত্ব অর্জনকারী ৪৫ ক্রীড়াবিদকে সংবর্ধনা টেকনাফে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে জড়ো করা ১০ ভিকটিম উদ্ধার, গ্রেফতার ১ লোহাগাড়ায় মাদক সেবন করতে গিয়ে ধরা, সাবেক পুলিশ কনস্টেবলসহ দুজনের কারাদণ্ড দুদকের মামলায় টেকনাফ ইউপির সাবেক মেম্বার আব্দুল্লাহ ও তার বাবা আবুল বশরের কারাদন্ড সুখী-সমৃদ্ধ কল্যাণমুখী নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে: মির্জা ফখরুল সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে না: নাহিদ ইসলাম নতুন রাষ্ট্রপতিকে কে শপথ পড়াবেন, মতামত দিল আইন মন্ত্রণালয়
নয় বছর পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেই সুস্পষ্ট রোডম্যাপ

‘শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না, দরকার স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান’

মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা শরণার্থী সংকটের প্রেক্ষাপটে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কতদূর?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বে ইনসাইট ও এমবোলডেন বাংলাদেশ যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে। এতে মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন। এছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সংস্থা, সিভিল সোসাইটি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন হলেও শুধু ঘোষণা বা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা, মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা।

ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রত্যাবাসন হওয়া বা না হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধাপ ও কাজ রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন করতে একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না। ২০১৮ সাল থেকে শুনছি প্রত্যাবাসন আজ হবে, কাল হবে। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখছি না।”

সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই এখন কাজ করতে হবে। জাতীয় নীতিতে কী চলছে, বৈশ্বিক নীতিতে কী পরিবর্তন হচ্ছে এবং মিয়ানমারের নীতি কোন দিকে যাচ্ছে—এসব বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটি প্রথমত মিয়ানমারের, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের এবং তৃতীয়ত অন্য দেশগুলোরও সমস্যা।

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করার মিয়ানমারের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টিকে ব্যবহার করে মিয়ানমার আন্তর্জাতিকভাবে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশের মানুষ।

সৈয়দ উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক কোনো ‘গেমের’ অংশ হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। “আমরা বাংলাদেশের ওপর কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি করছি না। আমরা শুধুমাত্র শান্তি চাইছি,” বলেন তিনি।

রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সংকট নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক সমস্যা।

তিনি বলেন, রাখাইন বা আরাকানের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

মুজিবুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে চীন ও ভারতের মতো প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও পদক্ষেপ নিতে হবে।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের অবমাননাকরভাবে উপস্থাপনেরও সমালোচনা করেন তিনি।

“আমরা তো ভিখারি নই। আমরা আমাদের বাপ-দাদা, চৌদ্দগুষ্টির জন্মভূমি আরাকানের মানুষ,” বলেন মুজিবুর রহমান।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির অবস্থান নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশেও যেন রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, প্রত্যাবাসনই সবচেয়ে ভালো সমাধান। তবে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না করে মানুষকে ফেরত পাঠানো যাবে না।

তাঁর মতে, রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জমি-বাড়ির অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, “মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য এখানে এসেছি, আবার কি মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেব?”—এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যকর করা সম্ভব নয়।

ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো নেই।

মিয়ানমারে চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়াকে প্রত্যাবাসনের প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্ব বা মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এসব শর্ত তৈরি করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী বিষয়ে প্রশাসন, গবেষক, রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বিত আলোচনা প্রয়োজন।

এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট সুপারিশ তৈরি করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

উন্নয়নকর্মী ফারিহা হোসাইন বলেন, নয় বছর ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু জরুরি মানবিক সহায়তার দৃষ্টিতে দেখলে হবে না।

রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা প্রয়োজন।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যেমন জরুরি, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের প্রভাব বহন করা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর বিষয় নয়; তাদের মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ব্র্যাকের উপদেষ্টা সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, শরণার্থী সংকটের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমাধানের মধ্যে প্রত্যাবাসন, স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়া এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন রয়েছে।

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়ার বাস্তব সুযোগ না থাকায় প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ সীমিত পরিসরে হলেও চালু রাখার পক্ষে মত দেন তিনি।

তাঁর মতে, সংখ্যায় সীমিত হলেও তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী পাশাপাশি বসবাস করলেও বিভিন্ন কারণে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপ ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যকার বিভাজন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতও তাদের সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি এবং প্রত্যাবাসনসহ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাদের নিজস্ব বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না।

দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে বসবাসরত একটি প্রজন্মকে কেবল ত্রাণনির্ভর করে রাখলে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার কথাও বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

গোলটেবিলের আলোচনায় বক্তারা মোটাদাগে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন—

* প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত রোডম্যাপ তৈরি;
* মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ;
* চীন, ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সম্পৃক্ততা;
* প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমি-বাড়ির অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা;
* রোহিঙ্গাদের নিজেদের মতামত ও অংশগ্রহণকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া;
* প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানো;
* স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
* প্রয়োজন অনুযায়ী তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ অব্যাহত রাখা;
* বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো প্রণয়ন।

আলোচনার সারকথা ছিল—রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন। তবে নয় বছর পর এসে শুধু ‘প্রত্যাবাসন হবে’—এমন ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবতা বিবেচনায় একটি সুস্পষ্ট কৌশল, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, সাংবাদিক, গবেষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রোহিঙ্গা সমাজের প্রতিনিধিরা।

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

‘শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না, দরকার স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান’

নয় বছর পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নেই সুস্পষ্ট রোডম্যাপ

‘শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না, দরকার স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান’

আপডেট সময় : ০২:৫৭:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা, রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা শরণার্থী সংকটের প্রেক্ষাপটে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কতদূর?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বে ইনসাইট ও এমবোলডেন বাংলাদেশ যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে। এতে মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন। এছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সংস্থা, সিভিল সোসাইটি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন হলেও শুধু ঘোষণা বা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা, মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা।

ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রত্যাবাসন হওয়া বা না হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধাপ ও কাজ রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন করতে একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “শুধু মুখে বললে প্রত্যাবাসন হয় না। ২০১৮ সাল থেকে শুনছি প্রত্যাবাসন আজ হবে, কাল হবে। কিন্তু এসব কথার কোনো প্রতিফলন দেখছি না।”

সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই এখন কাজ করতে হবে। জাতীয় নীতিতে কী চলছে, বৈশ্বিক নীতিতে কী পরিবর্তন হচ্ছে এবং মিয়ানমারের নীতি কোন দিকে যাচ্ছে—এসব বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এটি প্রথমত মিয়ানমারের, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের এবং তৃতীয়ত অন্য দেশগুলোরও সমস্যা।

রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করার মিয়ানমারের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টিকে ব্যবহার করে মিয়ানমার আন্তর্জাতিকভাবে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশের মানুষ।

সৈয়দ উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক কোনো ‘গেমের’ অংশ হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। “আমরা বাংলাদেশের ওপর কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি করছি না। আমরা শুধুমাত্র শান্তি চাইছি,” বলেন তিনি।

রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার সংকট নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক সমস্যা।

তিনি বলেন, রাখাইন বা আরাকানের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

মুজিবুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে চীন ও ভারতের মতো প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও পদক্ষেপ নিতে হবে।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রোহিঙ্গাদের অবমাননাকরভাবে উপস্থাপনেরও সমালোচনা করেন তিনি।

“আমরা তো ভিখারি নই। আমরা আমাদের বাপ-দাদা, চৌদ্দগুষ্টির জন্মভূমি আরাকানের মানুষ,” বলেন মুজিবুর রহমান।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির অবস্থান নিয়ে তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশেও যেন রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, প্রত্যাবাসনই সবচেয়ে ভালো সমাধান। তবে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না করে মানুষকে ফেরত পাঠানো যাবে না।

তাঁর মতে, রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা করতে হবে।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জমি-বাড়ির অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, “মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য এখানে এসেছি, আবার কি মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেব?”—এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যকর করা সম্ভব নয়।

ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু কীভাবে সেই প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন হবে তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো নেই।

মিয়ানমারে চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়াকে প্রত্যাবাসনের প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্ব বা মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, এসব শর্ত তৈরি করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী বিষয়ে প্রশাসন, গবেষক, রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বিত আলোচনা প্রয়োজন।

এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে সুস্পষ্ট সুপারিশ তৈরি করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

উন্নয়নকর্মী ফারিহা হোসাইন বলেন, নয় বছর ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু জরুরি মানবিক সহায়তার দৃষ্টিতে দেখলে হবে না।

রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করা প্রয়োজন।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যেমন জরুরি, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের প্রভাব বহন করা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থও বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর বিষয় নয়; তাদের মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ধরে রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ব্র্যাকের উপদেষ্টা সুব্রত চক্রবর্তী বলেন, শরণার্থী সংকটের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সমাধানের মধ্যে প্রত্যাবাসন, স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়া এবং তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন রয়েছে।

বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে একীভূত হওয়ার বাস্তব সুযোগ না থাকায় প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ সীমিত পরিসরে হলেও চালু রাখার পক্ষে মত দেন তিনি।

তাঁর মতে, সংখ্যায় সীমিত হলেও তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী পাশাপাশি বসবাস করলেও বিভিন্ন কারণে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে চাপ ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যকার বিভাজন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতও তাদের সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি এবং প্রত্যাবাসনসহ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তাদের নিজস্ব বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না।

দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে বসবাসরত একটি প্রজন্মকে কেবল ত্রাণনির্ভর করে রাখলে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার কথাও বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

গোলটেবিলের আলোচনায় বক্তারা মোটাদাগে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন—

* প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত রোডম্যাপ তৈরি;
* মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ;
* চীন, ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সম্পৃক্ততা;
* প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমি-বাড়ির অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা;
* রোহিঙ্গাদের নিজেদের মতামত ও অংশগ্রহণকে নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া;
* প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানো;
* স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
* প্রয়োজন অনুযায়ী তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের সুযোগ অব্যাহত রাখা;
* বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো প্রণয়ন।

আলোচনার সারকথা ছিল—রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন। তবে নয় বছর পর এসে শুধু ‘প্রত্যাবাসন হবে’—এমন ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবতা বিবেচনায় একটি সুস্পষ্ট কৌশল, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, সাংবাদিক, গবেষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রোহিঙ্গা সমাজের প্রতিনিধিরা।