ঢাকা ১০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রামুতে মাইক্রোবাস–সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে চালক নিহত মৃতপ্রায় ৫২ খালে ফিরবে প্রাণ, কমবে জলাবদ্ধতা ভ্যানেটি ব্যাগে ১ হাজার ইয়াবা, নারী আটক কক্সবাজারে তাপমাত্রা কমেছে, বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার পূর্বাভাস মানবপাচার চক্রের আস্তানা থেকে ৫৮ রোহিঙ্গা উদ্ধার, গ্রেফতার ৩ সিটের নিচে ৩৪ হাজার ইয়াবা, পাচারকারী ও চালক আটক পেকুয়া উপজেলার দুই যুগ পূর্তি আজ,সালাহউদ্দিন আহমদের অবদানকে স্মরণ করছে স্থানীয়রা টেকনাফে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেট ও ইয়াবা জব্দ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে ছরওয়ার, জনমনে উদ্বেগ আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কক্সবাজারের ১৭৩ আইনজীবীর জাতিসংঘে আবেদন  মেয়েদের শিক্ষা হবে ‘ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি’, আসছে ‘এলপিজি কার্ড’: প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি রোধে কক্সবাজারে ৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি, পছন্দের পদে ফেরাতে তদবিরে সক্রিয় অসাধুরা নির্মাণ শ্রমিককে চাপা দিয়ে পালানো পিকআপ ৩০ কিমি পর জব্দ ‘অখণ্ড ভারতের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন এ কে ফজলুল হক’ গর্জনিয়া বাজারে রাজস্ব ‘গায়েব’ –

মৃতপ্রায় ৫২ খালে ফিরবে প্রাণ, কমবে জলাবদ্ধতা

বর্ষা এলেই কক্সবাজার শহর ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় একই চিত্র। জলাবদ্ধতা, নালা-খালে জমে থাকা পানি, সড়ক ডুবে গিয়ে জনভোগান্তি ও বন্যা। অথচ কয়েক দশক আগেও এই অঞ্চলের খালগুলোই ছিল স্বাভাবিক পানি প্রবাহের প্রধান মাধ্যম। সেই খালগুলোর অনেকই এখন দখল, ভরাট ও নাব্যতা হারিয়ে কার্যত মৃতপ্রায়।

এই বাস্তবতায় জেলার খালগুলোকে পুনর্জীবিত করতে উপজেলা ভিত্তিক বড় পরিসরের খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাক্কলন অনুযায়ী, কক্সবাজারের ৫২টি খাল পুনঃখননের তালিকায় রয়েছে। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২১৮.৯৮ কিলোমিটার। এ জন্য প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১ কোটি ৮৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার বেশি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু জলাবদ্ধতা নিরসন নয়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

শহরের খাল ঘিরে বড় প্রত্যাশা

কক্সবাজার সদর উপজেলায় নেওয়া হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সমন্বিত উদ্যোগ। শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পাঁচটি খাল- বারগোদা, বারিংগা, কাটাখালী, ঘাটিয়াখালী ও পাতিলা পুনঃখননের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতিলা খালকে ‘লাইফলাইন’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। বর্ষায় এই খাল সচল না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, খালটি পুরোপুরি খনন ও দখলমুক্ত করা গেলে জলাবদ্ধতার বড় অংশই কমে আসবে।

অন্যদিকে ছোট আকারের হলেও বারগোদা ও ঘাটিয়াখালী খাল অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সব মিলিয়ে সদর উপজেলায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার খাল পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

রামুতে পাহাড়ি ঢল নামানোর লড়াই

রামু উপজেলার সমস্যা ভিন্নধর্মী। পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে নিচু এলাকা তলিয়ে যায়। এই পানি দ্রুত নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম খালগুলোই দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে আছে।

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় মিঠাছড়ি ও লামার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খালগুলো সচল হলে পাহাড়ি ঢল দ্রুত নেমে যাবে এবং প্লাবনের সময়কাল কমে আসবে। ইতোমধ্যে মিঠাছড়ি খালের কিছু অংশে কাজ শেষ হওয়ায় স্থানীয়ভাবে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

মহেশখালীতে খাল মানেই অর্থনীতি

উপকূলীয় উপজেলা মহেশখালীতে খালগুলো শুধু পানি চলাচলের পথ নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও ভিত্তি। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লবণচাষ, মাছচাষ ও নৌপথ নির্ভর জীবনযাত্রা গড়ে উঠেছে সেখানে।

বরোদিয়া, ঘটিভাঙ্গা ও হামিদখালী খাল পুনঃখননের মাধ্যমে প্রায় ৮ কিলোমিটার জলপথ পুনরুদ্ধার হবে। এতে লবণচাষের জমিতে পানির সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত হবে এবং মাছচাষেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

চকরিয়ায় কৃষি রক্ষার লড়াই

চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা কৃষিনির্ভর। কিন্তু বর্ষা এলেই খালগুলোর নাব্যতা না থাকায় জমিতে পানি জমে থাকে, ফলে ফসলের ক্ষতি হয়।

এই সমস্যা সমাধানে মগ খালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মগ খালটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এটি সচল হলে বড় এলাকা জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

টেকনাফে ছোট খালের বড় ভূমিকা

টেকনাফে খালগুলো আকারে ছোট হলেও গুরুত্ব কম নয়। বর্ষায় এসব খালই পানি নিষ্কাশনের একমাত্র ভরসা।

ছুড়ি ও আলীখালী খাল পুনঃখননের মাধ্যমে স্থানীয় বসতবাড়ি ও কৃষিজমি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে। সীমান্তবর্তী এই এলাকায় খাল সচল থাকলে জীবিকা ও চলাচল- দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা বাড়বে।

উখিয়ায় ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় ড্রেনেজ চ্যালেঞ্জ

উখিয়া উপজেলায় খাল পুনঃখননের একটি বড় অংশ রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় কেন্দ্রীভূত। জনসংখ্যার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপও বেড়েছে।

পালংখালী ছড়া, মাছকারিয়া ও বালুখালী ছড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই এলাকায় পানি নিষ্কাশন ও পয়ঃব্যবস্থার উন্নতি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বর্ষাকালে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমবে।

পেকুয়ায় কৃষির সুরক্ষা

পেকুয়া উপজেলায় খালগুলো সরাসরি কৃষির সঙ্গে জড়িত। জমিতে পানি ধরে রাখা ও বের করে দেওয়ার ভারসাম্য এই খালগুলোর ওপর নির্ভর করে।

নন্দিরপাড়া, বাইম্যাখালী, বিলাছড়া, মোরারপাড়া ও ফাঁসিয়াখালী খাল পুনঃখননের মাধ্যমে প্রায় ১৬ কিলোমিটার জলপথ পুনরুদ্ধার হবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং জমিতে পানি জমে থাকার সমস্যা কমবে।

কুতুবদিয়ায় উপকূল রক্ষার কৌশল

সমুদ্রঘেঁষা কুতুবদিয়ায় খালগুলো জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করে। এগুলো অকার্যকর হয়ে পড়লে পানি জমে থাকা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

পিলটকাটা, কুমিরাছড়া, গাইনকাটা, সতরুদ্দিন ও ফয়জানি পাড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সামনে আরও বড় পরিকল্পনা

বর্তমান তালিকার বাইরে আরও ১৮টি খাল পুনঃখননের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রায় ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব খাল বাস্তবায়িত হলে জেলার পানি ব্যবস্থাপনায় আরও বড় পরিবর্তন আসবে।

এদিকে ইতোমধ্যে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও উল্টাখালী রশিদ খালসহ কয়েকটি খালের কাজ শেষ হয়েছে, যেখানে পানি নিষ্কাশনে উন্নতির প্রমাণ মিলছে।

সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল পুনঃখনন উদ্যোগটি সময়োপযোগী হলেও বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উলাহ বলেন, “এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ফিরে আসবে। কিন্তু খাল দখল ও দূষণ বন্ধ না হলে সুফল টেকসই হবে না।”

সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’-এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম বলেন, “খননের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো কয়েক বছরের মধ্যেই খালগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।”

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলামের ভাষ্য, “প্রায় ২১৯ কিলোমিটার জলপথ পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ কক্সবাজারের জন্য এক বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা এবং দখলমুক্তকরণ নিশ্চিত না হলে এই উদ্যোগও অতীতের অনেক প্রকল্পের মতো প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে।”

তার প্রত্যাশা, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে যদি খালগুলোকে সত্যিকার অর্থে পুনর্জীবিত করা যায়, তবে বহুদিনের অবহেলায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়া এই জলপথগুলো আবারও কক্সবাজারের জনজীবনের প্রাণপ্রবাহ হয়ে উঠতে পারে।

প্রশাসনের আশাবাদ

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

তার ভাষায়, “এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে দৃশ্যমান উন্নতি হবে।”

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

রামুতে মাইক্রোবাস–সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে চালক নিহত

মৃতপ্রায় ৫২ খালে ফিরবে প্রাণ, কমবে জলাবদ্ধতা

আপডেট সময় : ০৮:৪২:৩৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

বর্ষা এলেই কক্সবাজার শহর ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় একই চিত্র। জলাবদ্ধতা, নালা-খালে জমে থাকা পানি, সড়ক ডুবে গিয়ে জনভোগান্তি ও বন্যা। অথচ কয়েক দশক আগেও এই অঞ্চলের খালগুলোই ছিল স্বাভাবিক পানি প্রবাহের প্রধান মাধ্যম। সেই খালগুলোর অনেকই এখন দখল, ভরাট ও নাব্যতা হারিয়ে কার্যত মৃতপ্রায়।

এই বাস্তবতায় জেলার খালগুলোকে পুনর্জীবিত করতে উপজেলা ভিত্তিক বড় পরিসরের খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাক্কলন অনুযায়ী, কক্সবাজারের ৫২টি খাল পুনঃখননের তালিকায় রয়েছে। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২১৮.৯৮ কিলোমিটার। এ জন্য প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১ কোটি ৮৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার বেশি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু জলাবদ্ধতা নিরসন নয়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

শহরের খাল ঘিরে বড় প্রত্যাশা

কক্সবাজার সদর উপজেলায় নেওয়া হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সমন্বিত উদ্যোগ। শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পাঁচটি খাল- বারগোদা, বারিংগা, কাটাখালী, ঘাটিয়াখালী ও পাতিলা পুনঃখননের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতিলা খালকে ‘লাইফলাইন’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। বর্ষায় এই খাল সচল না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, খালটি পুরোপুরি খনন ও দখলমুক্ত করা গেলে জলাবদ্ধতার বড় অংশই কমে আসবে।

অন্যদিকে ছোট আকারের হলেও বারগোদা ও ঘাটিয়াখালী খাল অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সব মিলিয়ে সদর উপজেলায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার খাল পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

রামুতে পাহাড়ি ঢল নামানোর লড়াই

রামু উপজেলার সমস্যা ভিন্নধর্মী। পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে নিচু এলাকা তলিয়ে যায়। এই পানি দ্রুত নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম খালগুলোই দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে আছে।

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় মিঠাছড়ি ও লামার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খালগুলো সচল হলে পাহাড়ি ঢল দ্রুত নেমে যাবে এবং প্লাবনের সময়কাল কমে আসবে। ইতোমধ্যে মিঠাছড়ি খালের কিছু অংশে কাজ শেষ হওয়ায় স্থানীয়ভাবে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

মহেশখালীতে খাল মানেই অর্থনীতি

উপকূলীয় উপজেলা মহেশখালীতে খালগুলো শুধু পানি চলাচলের পথ নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও ভিত্তি। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লবণচাষ, মাছচাষ ও নৌপথ নির্ভর জীবনযাত্রা গড়ে উঠেছে সেখানে।

বরোদিয়া, ঘটিভাঙ্গা ও হামিদখালী খাল পুনঃখননের মাধ্যমে প্রায় ৮ কিলোমিটার জলপথ পুনরুদ্ধার হবে। এতে লবণচাষের জমিতে পানির সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত হবে এবং মাছচাষেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

চকরিয়ায় কৃষি রক্ষার লড়াই

চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা কৃষিনির্ভর। কিন্তু বর্ষা এলেই খালগুলোর নাব্যতা না থাকায় জমিতে পানি জমে থাকে, ফলে ফসলের ক্ষতি হয়।

এই সমস্যা সমাধানে মগ খালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মগ খালটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এটি সচল হলে বড় এলাকা জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

টেকনাফে ছোট খালের বড় ভূমিকা

টেকনাফে খালগুলো আকারে ছোট হলেও গুরুত্ব কম নয়। বর্ষায় এসব খালই পানি নিষ্কাশনের একমাত্র ভরসা।

ছুড়ি ও আলীখালী খাল পুনঃখননের মাধ্যমে স্থানীয় বসতবাড়ি ও কৃষিজমি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে। সীমান্তবর্তী এই এলাকায় খাল সচল থাকলে জীবিকা ও চলাচল- দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা বাড়বে।

উখিয়ায় ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় ড্রেনেজ চ্যালেঞ্জ

উখিয়া উপজেলায় খাল পুনঃখননের একটি বড় অংশ রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় কেন্দ্রীভূত। জনসংখ্যার চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপও বেড়েছে।

পালংখালী ছড়া, মাছকারিয়া ও বালুখালী ছড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই এলাকায় পানি নিষ্কাশন ও পয়ঃব্যবস্থার উন্নতি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বর্ষাকালে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমবে।

পেকুয়ায় কৃষির সুরক্ষা

পেকুয়া উপজেলায় খালগুলো সরাসরি কৃষির সঙ্গে জড়িত। জমিতে পানি ধরে রাখা ও বের করে দেওয়ার ভারসাম্য এই খালগুলোর ওপর নির্ভর করে।

নন্দিরপাড়া, বাইম্যাখালী, বিলাছড়া, মোরারপাড়া ও ফাঁসিয়াখালী খাল পুনঃখননের মাধ্যমে প্রায় ১৬ কিলোমিটার জলপথ পুনরুদ্ধার হবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং জমিতে পানি জমে থাকার সমস্যা কমবে।

কুতুবদিয়ায় উপকূল রক্ষার কৌশল

সমুদ্রঘেঁষা কুতুবদিয়ায় খালগুলো জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করে। এগুলো অকার্যকর হয়ে পড়লে পানি জমে থাকা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

পিলটকাটা, কুমিরাছড়া, গাইনকাটা, সতরুদ্দিন ও ফয়জানি পাড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

সামনে আরও বড় পরিকল্পনা

বর্তমান তালিকার বাইরে আরও ১৮টি খাল পুনঃখননের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রায় ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব খাল বাস্তবায়িত হলে জেলার পানি ব্যবস্থাপনায় আরও বড় পরিবর্তন আসবে।

এদিকে ইতোমধ্যে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও উল্টাখালী রশিদ খালসহ কয়েকটি খালের কাজ শেষ হয়েছে, যেখানে পানি নিষ্কাশনে উন্নতির প্রমাণ মিলছে।

সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল পুনঃখনন উদ্যোগটি সময়োপযোগী হলেও বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উলাহ বলেন, “এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ফিরে আসবে। কিন্তু খাল দখল ও দূষণ বন্ধ না হলে সুফল টেকসই হবে না।”

সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’-এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম বলেন, “খননের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো কয়েক বছরের মধ্যেই খালগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।”

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলামের ভাষ্য, “প্রায় ২১৯ কিলোমিটার জলপথ পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ কক্সবাজারের জন্য এক বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে বাস্তবায়নের গতি, স্বচ্ছতা এবং দখলমুক্তকরণ নিশ্চিত না হলে এই উদ্যোগও অতীতের অনেক প্রকল্পের মতো প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে।”

তার প্রত্যাশা, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে যদি খালগুলোকে সত্যিকার অর্থে পুনর্জীবিত করা যায়, তবে বহুদিনের অবহেলায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়া এই জলপথগুলো আবারও কক্সবাজারের জনজীবনের প্রাণপ্রবাহ হয়ে উঠতে পারে।

প্রশাসনের আশাবাদ

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

তার ভাষায়, “এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে দৃশ্যমান উন্নতি হবে।”