বাংলাদেশ আজ বিদ্যুৎ খাতে এক দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সরকার বলছে, দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন, উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার চেয়েও বেশি; অন্যদিকে সাধারণ মানুষ এখনো নিয়মিত লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক, সমস্যা কোথায়?
প্রথমেই বুঝতে হবে, “উৎপাদন ক্ষমতা” এবং “বাস্তব উৎপাদন” এক জিনিস নয়। কাগজে-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বাস্তবে উৎপাদন অনেক সময় ১২ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ, কেন্দ্র আছে, কিন্তু সবগুলো চালু নেই।
এর মূল কারণ জ্বালানি নির্ভরতা। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত বড় অংশেই আমদানিকৃত জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। তেল আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে, এলএনজি আসে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও কাতার থেকে, আর কয়লা আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে। সরবরাহের পথ সচল থাকলেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক সক্ষমতায়, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায়।
ডলার সংকটের কারণে সময় মতো এলসি খোলা সম্ভব হয় না, জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হয়, ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকে। অর্থাৎ, কয়লা বা এলএনজি “আসছে” কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী “যথেষ্ট আসছে না”। এই ঘাটতিই সরাসরি লোডশেডিংয়ে প্রতিফলিত হয়।
এখানেই শেষ নয়। বিদ্যুৎ খাতে আরেকটি বড় চাপ হচ্ছে “ক্যাপাসিটি চার্জ” যেখানে অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করলেও সরকারকে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় বাড়ে, কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ে না। ফলাফল, অর্থনৈতিক চাপ ও সেবার মধ্যে অসামঞ্জস্য।
অন্যদিকে, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ। উৎপাদিত বিদ্যুৎ পুরোপুরি গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারে না। কোথাও সিস্টেম লস, কোথাও অব্যবস্থাপনা, সব মিলিয়ে বাস্তব সরবরাহ কমে যায়।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও অনেক বিভ্রান্তি রয়েছে। বাস্তবে এখনো দেশের প্রধান জ্বালানি উৎস গ্যাস; কয়লার ব্যবহার বাড়লেও তা প্রাধান্য পায়নি। ফলে শুধুমাত্র কয়লা আমদানি থাকলেই বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এ ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
নেপালে বিদ্যুৎ রপ্তানির যে আলোচনা শোনা যায়, সেটিও মূলত সম্ভাবনা মাত্র বা সীমিত পরিসরের পরিকল্পনা। যখন দেশের ভেতরেই চাহিদা পূরণে ঘাটতি রয়েছে, তখন রপ্তানি বাস্তবতার চেয়ে বেশি একটি নীতিগত বক্তব্য হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।
সবকিছু মিলিয়ে স্পষ্ট, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট প্রযুক্তিগত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাগত। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোই শেষ কথা নয়; সেই ক্ষমতাকে কার্যকর করতে প্রয়োজন জ্বালানি নিরাপত্তা, স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ পরিচালনা।
লোডশেডিং মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নয়, বরং সমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়ন যোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, এবং সর্বোপরি সুশাসন নিশ্চিত করা ছাড়া এই অন্ধকার কাটবে না।
শেখ জাহাঙ্গীর হাছান মানিক 






















