ঢাকা ০৩:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সরকারের ১০০ দিন: সাংবাদিকদের বিচার কোন পর্যায়ে চট্টগ্রাম পেরিয়ে চকরিয়ার দিকে বজ্রমেঘ, কক্সবাজারে হতে পারে বৃষ্টি মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালে এসির গ্যাস লিকেজে ৬ শিশুর মৃত্যু পরিচ্ছন্ন উপায়ে কোরবানি সম্পন্ন করার আহ্বান প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর ‎লাখ টাকার মিশনে নেমেও ঈদে বাড়ি ফেরা হলোনা শাহীন ডাকাতের:ফের আটক ডিবির হাতে জাতীয় দলে ফিরলেন চকরিয়ার জিকু শিল্পী রাজীব বড়ুয়া পরলোকে, শেষকৃত্য সম্পন্ন আদালত প্রাঙ্গণে গোলাগুলির ঘটনায় উদ্বেগ জেলা আইনজীবী সমিতির,পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জামিনে বেরিয়ে ফের আটক গর্জনিয়ার আলোচিত শাহীন ডাকাত টেকনাফে টাকা দিয়ে সাংবাদিক কার্ড সংগ্রহ, ইয়াবা পাচারে আটক ভুয়া সাংবাদিক সন্ত্রাসীদের কোনো অভয়ারণ্য থাকতে দেওয়া হবে না, নির্মূল করা হবে ঈদের আনন্দ কেড়ে নিল আগুন, খোলা আকাশের নিচে শত পরিবার চকরিয়ায় ডাম্পারের ধাক্কায় নছিমন চালক নিহত পেকুয়ায় বজ্রপাতে এক নারীর মৃত্যু ঈদকে সামনে রেখে পর্যটন শহরে নিরাপত্তা ও সেবায় বিশেষ উদ্যোগ

সরকারের ১০০ দিন: সাংবাদিকদের বিচার কোন পর্যায়ে

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনে সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে কোনও নতুন বিচারের মুখোমুখি করা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে আইন ও তথ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে এবং কোনও সাংবাদিককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আইনি হয়রানি করা হবে না। এদিকে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগের মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা হলেও এখন পর্যন্ত কোনও মামলায় সাংবাদিকদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেননি তদন্ত কর্মকর্তারা।

‘নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট’ থেকে প্রাপ্ত একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে সারা দেশে প্রায় ৫ শতাধিক গায়েবী মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রফতারও করা হয়েছে। ১৩ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। চাকরিচ্যুত করা হয়েছে প্রায় ১২শ সাংবাদিককে। এছাড়া ১৬৮ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রেসক্লাবের ৭ শতাধিক সাংবাদিকের সদস্যপদ স্থগিত ও বাতিল করা হয়েছে। অর্ধশতাধিক সাংবাদিকদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্ধশতাধিক সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব অবৈধভাবে বন্ধ রাখারও অভিযোগ রয়েছে।

তথ্য মতে, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন দায়িত্বপালন করা উল্লেখযোগ্য সাংবাদিকদের মধ্যে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আটক শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপা, ২০২৪ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর ধোবাউড়া সীমান্ত থেকে আটক মোজাম্মেল হক বাবু, একই দিনে ধোবাউড়া সীমান্ত থেকে আটক শ্যামল দত্ত, ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট গুলশান থেকে গ্রেফতার মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথীসহ প্রায় শতাধিক সাংবাদিক জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যা-চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগের মামলায় কারাগারে আছেন। বিশেষ আইনে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলায় সহ-আসামি এবং পৃথকভাবে ৩২ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। ফলে এখনও পর্যন্ত কোনও মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়নি। এদিকে উপযুক্ত কারণ বিবেচনায় অধস্তন কিংবা উচ্চ আদালতে তারা জামিন পেলেও আপিল আবেদন করে কারামুক্তি আটকে দিচ্ছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, মঞ্জুরুল আলম পান্না ও শেখ জামাল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারাভোগ করলেও পরবর্তীকালে তারা জামিনে মুক্তি লাভ করেন। এদিকে সাংবাদিক আনিস আলমগীর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারান্তরীণ হলেও কারামুক্তি মিলেছে বিএনপি সরকারের আমলে।

সরকার গঠনের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানির মামলাগুলোর বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৭ মে সচিবালয়ে তার সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের এক বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করার পর প্রধানমন্ত্রী এই আশ্বাস দেন।

সেদিন সম্পাদক পরিষদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে ২৮২ জন সাংবাদিকের একটি তালিকা হস্তান্তর করেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের মধ্যে ৯৪ জন হত্যা মামলায় অভিযুক্ত।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নয়, বরং সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতে চায়।’’

সাংবাদিকদের বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটি নতুন সরকারের জন্য ১০০ দিন বেশি সময় নয়। তবে ড. ইউনূসের সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের যে পরিমাণে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হয়েছিল, তা এখনও (বর্তমান সরকারের আমলে) দেখতে পাইনি, এটাই বাস্তবতা। তবে যেসব সাংবাদিক এখনও আটক আছেন, তাদের জামিন না হওয়া নিয়ে জনমনে বিস্ময় রয়েছে, অনেকে বলছেন— এরা (বর্তমান সরকার) কি ড. ইউনূসের সরকারের ‘এক্সটেনশন’? কেননা, ড. ইউনূসের সময়ে প্রায় ১৮ মাস ধরে যারা কারাগারে আছেন, তাদের সবার অধিকার আছে জামিন লাভ করার। সেটি এই সরকারের আমলে এখনও প্রতিফলন হতে দেখিনি। মাসের পর মাস প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকরা আটক থাকবেন, এটা কি কোনও সভ্য দেশে ঘটতে পারে? কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেটি চলছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, ফারজানা রুপা, মোজাম্মেল বাবু, মাই টিভির চেয়ারম্যানসহ অনেকেই কারাগারে আছেন। তাদের জামিন হচ্ছে না। উল্টো আমরা দেখলাম— ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে শাপলা চত্ত্বরের হত্যা মামলায় জড়ানো হলো। বলা হলো, তারা উসকানি দিয়েছেন। কিন্তু সাংবাদিকরা আদৌ উসকানি দিতে পারেন?’’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দীর্ঘদিন কারাবরণ করা সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না নিজের মতামত তুলে ধরে বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত অপরাধ থাকতে পারে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকার যে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিল— সেক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কোনও হস্তক্ষেপ ছিল না। অথচ এই সরকারের আমলেও শাপলা চত্বরের হত্যা মামলায় সাংবাদিকদের জড়ানো হলো। ফলে এই সরকারকে আমরা তো আলাদাভাবে দেখবো বা কিছু বলবো কিনা, সেটিও ভাববার সুযোগ থাকছে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে হুমকি বা মব ছিল, সেটি এই সরকারের আমলে নেই, তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে সব রয়ে গেছে।’’

‘‘শেখ হাসিনার সরকারের সময় সাংবাদিকদের এক ধরনের নগ্ন দালালি ছিল বলে আমি মনে করি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা বেড়ে প্রায় ১০ গুণ হয়েছিল। সেটি এখনও (বর্তমান সরকারের আমলে) অব্যাহত আছে। গণমাধ্যমকর্মীরা কেউ কাজ করতে পারছেন না। সবাই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন।’’

প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেন, ‘‘আমরা প্রত্যাশা করি, ফ্রিডম অব স্পিচের জায়গায় গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করুক। ড. ইউনূস বলেছিলেন, সাংবাদিকদের ফ্রিডমের কথা, তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদের আমলে সাংবাদিকরা সবচেয়ে স্বাধীন সময় পার করছেন। আবার এই সরকারও তাই বলছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী সিনিয়র সাংবাদিকদের ডেকে কথা বলেছেন। আমি এটিকে সাধুবাদ জানাই। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সত্যিই পুরো বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করলে তাকে স্যালুট জানাই। কিন্তু এটি শুধু লোক দেখানোর বিষয় হলে তা অবশ্যই হিতে-বিপরীত হবে। তাই বাস্তবিক ক্ষেত্রে আমি শক্তভাবে বলতে পারছি না— এখনও আমরা ‘ফ্রিডম অব স্পিচ’ পেয়ে গেছি। পৃথিবীর কোনও রাষ্ট্রে এমন দৃষ্টান্ত নেই, গণমাধ্যমকে চেপে ধরা। তাই আমরা বিশ্বাস করি, সরকার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে।’’

নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের সদস্য সচিব শেখ জামাল  বলেন, ‘‘ড. ইউনূস সরকার ক্ষমতা দখলের পর প্রবলভাবে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন-পীড়ন শুরু করে। সে আমলে সাংবাদিকদের কোনও স্বাধীনতা ছিল না। ড. ইউনূসের প্রেস সেক্রেটারিরা অফিসে অফিসে ফোন করে নিউজ কীভাবে যাবে, তা নির্ধারণ করে দিতো। এর বাইরে নিউজ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আমিসহ প্রায় ৫ জন সাংবাদিক জামিন পেয়েছেন। বাকিদের বিষয়ে বিএনপি সরকার এখনও নীরব। সম্পাদক পরিষদ এ বিষয়ে আলোচনা করলেও তাদের আলাপে ফাঁকফোকর আছে। তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলে এই সরকারকে সহযোগিতা করে চলেছে।’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিক হত্যা নিয়ে শেখ জামাল বলেন, তারা (সম্পাদক পরিষদ) কথা বলেনি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া হত্যা মামলা নিয়েও সরাসরি কোনও কথা বলেনি। ফলে দৃশ্যমান কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রায় ১২০০ সাংবাদিকের চাকরিতে পুনর্বহালে কোনও উদ্যোগ নেই। সাংবাদিকদের নিয়ে এমন আরও যত জটিলতা তৈরি হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, সে বিষয়েও কোনও উদ্যোগ দেখছি না। তার মানে, ইউনূস সরকারের কর্মকাণ্ডকে এই সরকারও চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপিপন্থি সাংবাদিকদের তারা ঠিকই সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু ‍মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির সাংবাদিকদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে। এর থেকে এটাই বলতে পারি, সাংবাদিকদের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে পথে হেঁটেছে, বিএনপিও সেই পথে হাঁটছে। গণমাধ্যমের বাক্ স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায়, সেটিও বিএনপি দিচ্ছে না। বরং বিভিন্ন গণমাধ্যম তার দখল করে চলেছে।’’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

ট্যাগ :
জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারের ১০০ দিন: সাংবাদিকদের বিচার কোন পর্যায়ে

সরকারের ১০০ দিন: সাংবাদিকদের বিচার কোন পর্যায়ে

আপডেট সময় : ০২:৪৫:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১০০ দিনে সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে কোনও নতুন বিচারের মুখোমুখি করা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে আইন ও তথ্য মন্ত্রণালয়। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে এবং কোনও সাংবাদিককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আইনি হয়রানি করা হবে না। এদিকে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগের মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা হলেও এখন পর্যন্ত কোনও মামলায় সাংবাদিকদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেননি তদন্ত কর্মকর্তারা।

‘নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্ট’ থেকে প্রাপ্ত একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে সারা দেশে প্রায় ৫ শতাধিক গায়েবী মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রফতারও করা হয়েছে। ১৩ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। চাকরিচ্যুত করা হয়েছে প্রায় ১২শ সাংবাদিককে। এছাড়া ১৬৮ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবসহ দেশের বিভিন্ন প্রেসক্লাবের ৭ শতাধিক সাংবাদিকের সদস্যপদ স্থগিত ও বাতিল করা হয়েছে। অর্ধশতাধিক সাংবাদিকদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্ধশতাধিক সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব অবৈধভাবে বন্ধ রাখারও অভিযোগ রয়েছে।

তথ্য মতে, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন দায়িত্বপালন করা উল্লেখযোগ্য সাংবাদিকদের মধ্যে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে আটক শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপা, ২০২৪ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর ধোবাউড়া সীমান্ত থেকে আটক মোজাম্মেল হক বাবু, একই দিনে ধোবাউড়া সীমান্ত থেকে আটক শ্যামল দত্ত, ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট গুলশান থেকে গ্রেফতার মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথীসহ প্রায় শতাধিক সাংবাদিক জুলাই আন্দোলনের সময় হত্যা-চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগের মামলায় কারাগারে আছেন। বিশেষ আইনে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলায় সহ-আসামি এবং পৃথকভাবে ৩২ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। ফলে এখনও পর্যন্ত কোনও মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়নি। এদিকে উপযুক্ত কারণ বিবেচনায় অধস্তন কিংবা উচ্চ আদালতে তারা জামিন পেলেও আপিল আবেদন করে কারামুক্তি আটকে দিচ্ছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, মঞ্জুরুল আলম পান্না ও শেখ জামাল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারাভোগ করলেও পরবর্তীকালে তারা জামিনে মুক্তি লাভ করেন। এদিকে সাংবাদিক আনিস আলমগীর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারান্তরীণ হলেও কারামুক্তি মিলেছে বিএনপি সরকারের আমলে।

সরকার গঠনের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানির মামলাগুলোর বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৭ মে সচিবালয়ে তার সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের এক বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করার পর প্রধানমন্ত্রী এই আশ্বাস দেন।

সেদিন সম্পাদক পরিষদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে ২৮২ জন সাংবাদিকের একটি তালিকা হস্তান্তর করেছে, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের মধ্যে ৯৪ জন হত্যা মামলায় অভিযুক্ত।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নয়, বরং সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতে চায়।’’

সাংবাদিকদের বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘একটি নতুন সরকারের জন্য ১০০ দিন বেশি সময় নয়। তবে ড. ইউনূসের সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের যে পরিমাণে নির্যাতন-নিপীড়ন করা হয়েছিল, তা এখনও (বর্তমান সরকারের আমলে) দেখতে পাইনি, এটাই বাস্তবতা। তবে যেসব সাংবাদিক এখনও আটক আছেন, তাদের জামিন না হওয়া নিয়ে জনমনে বিস্ময় রয়েছে, অনেকে বলছেন— এরা (বর্তমান সরকার) কি ড. ইউনূসের সরকারের ‘এক্সটেনশন’? কেননা, ড. ইউনূসের সময়ে প্রায় ১৮ মাস ধরে যারা কারাগারে আছেন, তাদের সবার অধিকার আছে জামিন লাভ করার। সেটি এই সরকারের আমলে এখনও প্রতিফলন হতে দেখিনি। মাসের পর মাস প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিকরা আটক থাকবেন, এটা কি কোনও সভ্য দেশে ঘটতে পারে? কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেটি চলছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, ফারজানা রুপা, মোজাম্মেল বাবু, মাই টিভির চেয়ারম্যানসহ অনেকেই কারাগারে আছেন। তাদের জামিন হচ্ছে না। উল্টো আমরা দেখলাম— ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে শাপলা চত্ত্বরের হত্যা মামলায় জড়ানো হলো। বলা হলো, তারা উসকানি দিয়েছেন। কিন্তু সাংবাদিকরা আদৌ উসকানি দিতে পারেন?’’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দীর্ঘদিন কারাবরণ করা সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না নিজের মতামত তুলে ধরে বলেন, ‘‘সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত অপরাধ থাকতে পারে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকার যে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিল— সেক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কোনও হস্তক্ষেপ ছিল না। অথচ এই সরকারের আমলেও শাপলা চত্বরের হত্যা মামলায় সাংবাদিকদের জড়ানো হলো। ফলে এই সরকারকে আমরা তো আলাদাভাবে দেখবো বা কিছু বলবো কিনা, সেটিও ভাববার সুযোগ থাকছে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে হুমকি বা মব ছিল, সেটি এই সরকারের আমলে নেই, তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে সব রয়ে গেছে।’’

‘‘শেখ হাসিনার সরকারের সময় সাংবাদিকদের এক ধরনের নগ্ন দালালি ছিল বলে আমি মনে করি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা বেড়ে প্রায় ১০ গুণ হয়েছিল। সেটি এখনও (বর্তমান সরকারের আমলে) অব্যাহত আছে। গণমাধ্যমকর্মীরা কেউ কাজ করতে পারছেন না। সবাই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন।’’

প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেন, ‘‘আমরা প্রত্যাশা করি, ফ্রিডম অব স্পিচের জায়গায় গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করুক। ড. ইউনূস বলেছিলেন, সাংবাদিকদের ফ্রিডমের কথা, তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদের আমলে সাংবাদিকরা সবচেয়ে স্বাধীন সময় পার করছেন। আবার এই সরকারও তাই বলছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী সিনিয়র সাংবাদিকদের ডেকে কথা বলেছেন। আমি এটিকে সাধুবাদ জানাই। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সত্যিই পুরো বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করলে তাকে স্যালুট জানাই। কিন্তু এটি শুধু লোক দেখানোর বিষয় হলে তা অবশ্যই হিতে-বিপরীত হবে। তাই বাস্তবিক ক্ষেত্রে আমি শক্তভাবে বলতে পারছি না— এখনও আমরা ‘ফ্রিডম অব স্পিচ’ পেয়ে গেছি। পৃথিবীর কোনও রাষ্ট্রে এমন দৃষ্টান্ত নেই, গণমাধ্যমকে চেপে ধরা। তাই আমরা বিশ্বাস করি, সরকার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে।’’

নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের সদস্য সচিব শেখ জামাল  বলেন, ‘‘ড. ইউনূস সরকার ক্ষমতা দখলের পর প্রবলভাবে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন-পীড়ন শুরু করে। সে আমলে সাংবাদিকদের কোনও স্বাধীনতা ছিল না। ড. ইউনূসের প্রেস সেক্রেটারিরা অফিসে অফিসে ফোন করে নিউজ কীভাবে যাবে, তা নির্ধারণ করে দিতো। এর বাইরে নিউজ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ৪৭ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আমিসহ প্রায় ৫ জন সাংবাদিক জামিন পেয়েছেন। বাকিদের বিষয়ে বিএনপি সরকার এখনও নীরব। সম্পাদক পরিষদ এ বিষয়ে আলোচনা করলেও তাদের আলাপে ফাঁকফোকর আছে। তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলে এই সরকারকে সহযোগিতা করে চলেছে।’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিক হত্যা নিয়ে শেখ জামাল বলেন, তারা (সম্পাদক পরিষদ) কথা বলেনি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া হত্যা মামলা নিয়েও সরাসরি কোনও কথা বলেনি। ফলে দৃশ্যমান কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রায় ১২০০ সাংবাদিকের চাকরিতে পুনর্বহালে কোনও উদ্যোগ নেই। সাংবাদিকদের নিয়ে এমন আরও যত জটিলতা তৈরি হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, সে বিষয়েও কোনও উদ্যোগ দেখছি না। তার মানে, ইউনূস সরকারের কর্মকাণ্ডকে এই সরকারও চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপিপন্থি সাংবাদিকদের তারা ঠিকই সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু ‍মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির সাংবাদিকদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে। এর থেকে এটাই বলতে পারি, সাংবাদিকদের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে পথে হেঁটেছে, বিএনপিও সেই পথে হাঁটছে। গণমাধ্যমের বাক্ স্বাধীনতা বলতে যা বুঝায়, সেটিও বিএনপি দিচ্ছে না। বরং বিভিন্ন গণমাধ্যম তার দখল করে চলেছে।’’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন